৩৪৯৫৭-এর সঙ্গে ৭০৭৬৪ যোগ দিলে কত হয়?
তিরিশ সেকেন্ড মতো চুপ করে থেকে বললাম, ১০৫৬২১।
আপনি দাবা খেলেন?
আমি বললাম, হ্যাঁ।
ধরুন দাবা খেলায়।
রাকেশ জেনারেটর গান টেবিলে রেখে কম্পিউটার কি-বোর্ডের দিকে তাকিয়ে ঝিম মেরে বসে ছিল, হঠাৎই খেপে উঠে চিৎকার করে বলল, দাসানি, আপনারা কি টুরিং টেস্ট নিয়ে খেলা করছেন?
কোনও যন্ত্র ভাবতে পারে কি না, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে একটা বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্রে নকলনবিশি নামে একটা খেলার পরিকল্পনা করেছিলেন এক প্রাচীন বিজ্ঞানী। নাম অ্যালান ম্যাথিসন টুরিং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জনক। ওঁর সেই খেলাকে পরে অন্য বিজ্ঞানীরা টুরিং টেস্ট নাম দেন। এখন, টুরিং মারা যাওয়ার প্রায় ছশো বছর পরে, নরেন্দ্র দাসানি আমাকে টুরিং টেস্টের প্রশ্নগুলোই করছিলেন, আর আমিও হুবহু সেই উত্তরগুলো দিচ্ছিলাম। সেইজন্যে যোগ অঙ্কের উত্তরটাও ভুল দিয়েছি।
দাসানি থেমে গেলেন। ভুরু কুঁচকে রাকেশের দিকে তাকালেন। একটু ভেবে বললেন, দেখুন তো, পোস্টমর্টেম টিম চাঁদে রওনা হয়েছে কি না। আমার মনে হচ্ছে ওরা এই অ্যান্ড্রয়েডটার নকল ব্রেনে আসল ইন্দ্রজিতের সমস্ত স্মৃতির হুবহু ছাপ তুলে দিয়েছে…পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মেমোরি ম্যাপ। টুরিং টেস্ট দিয়ে একে ধরা যাবে না।
দাসানি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। উঠে দাঁড়ালেন চেয়ার ছেড়ে। পরনের মেটাল-ফাইবারের পোশাকের কোনও একটা পকেটে হাত ঢুকিয়ে ছোট্ট চেহারার একটা ডিজিটাল যন্ত্র বের করলেন। বললেন, এই স্ক্যানারটা এক্স-রে আর আলট্রাসনিক স্ক্যান দুটোই করতে পারে।
রাকেশ কম্পিউটারের কি-বোর্ডে বোতাম টিপছিল। দাসানির দিকে চোখ তুলে বলল, ফ্যালকন-১ তল্লাশির কাজ শেষ করে পোস্টমর্টেম টিম লুনার হাইল্যান্ডস-এ পৌঁছে গেছে। ফ্যালকন ১-এ কিছু পাওয়া যায়নি। ওদের রেডিও মেসেজ আসছে কন্ট্রোল রুমে। আপনি জলদি একে স্ক্যান করে দেখুন, কোনও অস্বাভাবিক মেটাল পার্টসের ছবি পাওয়া যায় কি না।
দাসানি বোধহয় ধৈর্যের শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়েছিলেন। কলার ধরে এক ঝটকায় দাঁড় করিয়ে দিলেন আমাকে। ওঁর শক্তি আমাকে অবাক করে দিল। দাঁতে দাঁত চেপে বললেন, ধরা তোমাকে দিতেই হবে। শুধু উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষা। প্রতিদিন আমি হাফডজন অ্যান্ড্রয়েড দিয়ে ব্রেকফাস্ট খাই।
তারপর ডিজিটাল স্ক্যানার দিয়ে স্ক্যানিংয়ের কাজ শুরু করলেন।
যন্ত্রে কিছুই ধরা পড়ল না। আমি জানতাম পড়বে না। কিন্তু সন্দেহের বিষ ওদের পাগল করে দিয়েছে। সুমিতা, রুনু, টুনু–ওরাও বাদ যায়নি। বিশ্বাসের ভিত এত সহজে টলে যায় জানতাম না।
শীতাতপনিয়ন্ত্রণ থাকা সত্ত্বেও দাসানির কপালে ঘামের ফোঁটা দেখা দিল। যন্ত্রটা পকেটে রেখে আপনমনেই বিড়বিড় করে তিনি বললেন, যে করে থোক আমাকে প্রমাণ করতেই হবে। এর আগে ডেল্টা থ্রি-র দুর্ঘটনায় কথা আমরা কেউ ভুলে যাইনি। টাইটান থেকে এক অ্যান্ড্রয়েড স্পাই এসেছিল আমাদের ডেল্টা থ্রি নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্টে। ওর শরীরের ভেতরে লুকনো ছিল একটা এইচ বোমা। বিশেষ একটা কোড ওয়ার্ড যদি অ্যান্ড্রয়েডটা উচ্চারণ করে তাহলে সঙ্গে সঙ্গে বোমাটা এক্সপ্লোড করবে। এসব তথ্য আমরা জানতে পেরেছিলাম টাইটানের আর-এক মানুষ গুপ্তচরকে সাইকোপ্রোব করে। তারপর অতিকষ্টে আমরা অ্যান্ড্রয়েডটাকে ধ্বংস করেছিলাম। পাওয়ার প্ল্যান্টটা অল্পের জন্যে বেঁচে গিয়েছিল… হঠাৎই গলার স্বর চড়িয়ে আমাকে লক্ষ করে দাসানি বললেন, আপনার কোড ওয়ার্ডটা কী, মিস্টার সান্যাল?
আমারও ধৈর্য ক্রমশ কমে আসছিল। তাই চেঁচিয়ে জবাব দিলাম, গণ্ডমূর্খ!
দাসানি বিরাশি সিক্কার এক থাপ্পড় কষিয়ে দিলেন আমার গালে। মাথা ঝিমঝিম করে উঠল। ঠোঁট কেটে গিয়ে রক্তের স্বাদ পেলাম জিভে।
রাকেশ বলল, একে ইন্দ্রজিতের বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান, দেখবেন ধরা পড়ে গেছে। সুমিতা বউদি, রুনু, কিংবা টুনু–কেউ না কেউ ঠিক ধরে ফেলবে একে। তারপর শুরু হবে আমাদের খেলা।
থাপ্পড় কষানোর পরমুহূর্ত থেকে দাসানি আমাকে খুঁটিয়ে লক্ষ করছিলেন। সম্ভবত প্রতিক্রিয়া দেখছিলেন। রোবট আর মানুষের প্রতিক্রিয়ায় নিশ্চয়ই তফাত থাকবে। ওঁর গুণী চোখ নিশ্চয়ই সেটা বুঝতেও পারবে। আমি আশা-ভরা চোখ নিয়ে ওঁর দিকে তাকিয়ে রইলাম। ডানগালটা অসহ্য জ্বালা করছিল।
দাসানি রাকেশকে লক্ষ করে বললেন, আপনি ঠিকই বলেছেন, ব্যানার্জি, ইন্দ্রজিতের বাড়িতেই নিয়ে যাই একে–।
সেই মুহূর্তে দাসানির গলা টিপে ধরতে ইচ্ছে করছিল আমার।
নরেন্দ্র দাসানি বিদ্রুপের স্বরে বলতে লাগলেন, আসলে এই যন্ত্রটার কোনও দোষ নেই। ইন্দ্রজিতের মেমোরি ম্যাপ করে দেওয়ায় ওর এখন বিশ্বাস যে, ও-ই আসল ইন্দ্রজিৎ সান্যাল। ফলে ওর অভিনয়ে কোনও ফাঁক থাকবে না। ও জানে যে, ও-ই আসল লোক। কিন্তু আমিও এত সহজে ছাড়ছি না।
দাসানি আমাকে ইশারা করলেন। আমি ওঁকে অনুসরণ করলাম। রাকেশকে একপলক দেখলাম। ও তখনও কম্পিউটার নিয়ে ব্যস্ত।
দাসানি রিমোট কন্ট্রোল ইউনিটটা বের করে বোতাম টিপলেন। প্লাস্টিকের দেওয়াল সরে গেল। আমরা বেরিয়ে এলাম ঘর ছেড়ে। সুমি, রুনু, টুনুকে সামনাসামনি দেখতে পাব ভেবে ততটা আর মনখারাপ হচ্ছিল না।
