আমি কাঁদতে কাঁদতেই টুনুর প্রশ্নের জবাব দিলাম।
একটু পরেই শুনতে পেলাম রাকেশের গলা, ওরা ট্রেনিংয়ে কোনও ভুল রাখেনি। রাকেশ ব্যানার্জির যাবতীয় তথ্য গুঁজে দিয়েছে এর পজিট্রনিক ব্রেনে।
দাসানি এক হ্যাঁচকায় আমাকে টেনে দাঁড় করিয়ে দিলেন। ধাক্কা মেরে বসিয়ে দিলেন চেয়ারে। দেখলাম, দেওয়ালটা আবার আগের মতো ছবিহীন সাদা হয়ে গেছে।
রাকেশ অধৈর্য হয়ে বলল, দাসানি, ছুরি দিয়ে ওর হাত-পা চিরে দেখুন রক্ত পড়ে কি না।
নরেন্দ্র দাসানি আমার মুখের ওপর ঝুঁকে পড়লেন। ইশারায় শান্ত হতে বললেন রাকেশকে। তারপর আমাকে বললেন, ইন্দ্রজিৎ, এখানে আসাটা আপনার সবচেয়ে বড় ভুল হয়েছে। যাই হোক, আপনার মুখে চাঁদের গল্পটা একবার শোনা যাক। যদিও রেডিও মেসেজ আমরা ঠিকমতোই পেয়েছি।
রাকেশ এগিয়ে এসে জেনারেটর গানটা ঠেকিয়ে ধরল আমার কপালে। এটা থেকে তিনরকম লেভেলে ফায়ার করা যায়, লো-লেভেল, হাই-লেভেল আর আলট্রা-হাই-লেভেল। দেখলাম সিলেক্টর সুইচটা এখন আলট্রা-হাই-লেভেলে।
দাসানি কিছু করে ওঠার আগেই রাকেশ বাঁ-হাতে কোথা থেকে একটা ছুরি বের করে ক্ষিপ্রগতিতে বাতাস কেটে চালিয়ে দিল আমার গালে। পাকা হাত। গাল চিরে গেল শুধু। দাসানি চিৎকার করে উঠলেন, ব্যানার্জি কী হচ্ছে! আপনি কি পাগল হয়ে গেলেন?
আমিও যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠেছিলাম। ডানগাল বেয়ে দরদর করে রক্ত পড়ছে। সত্যিকারের রক্ত। পকেট থেকে রুমাল বের করে চেপে ধরলাম গালে। রাকেশ রক্ত দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। বোধহয় বুঝল আমি রোবট নই, মানুষ। ওর চোখে আবার আমার বন্ধু রাকেশের দৃষ্টি ফিরে আসছিল। কিন্তু দাসানির কথায় আমার রক্ত ঠান্ডা হয়ে গেল। রাকেশের দৃষ্টিও হয়ে গেল উদভ্রান্ত পাগলের মতো।
নরেন্দ্র দাসানি বললেন, কী তখন থেকে ছেলেমানুষি করছেন, ব্যানার্জি! আপনাকে তো সেই গোড়া থেকেই বলছি, এটা অ্যান্ড্রয়েড–রোবট নয়। অ্যান্ড্রয়েডদের রক্ত-মাংস থাকে মানুষেরই মতো। শুধু ব্রেন আর হার্ট, ওই দুটোই যন্ত্র–চলে ব্যাটারিতে। কিন্তু এক্স-রে কিংবা মেটাল ডিটেক্টরে ধর পড়ে না। আপনি যান তো, চেয়ারে গিয়ে চুপ করে বসুন।
কিন্তু রাকেশ চেয়ারে গিয়ে বসল না। ছুরি ফেলে দিয়ে একহাতে আমার জামা খামচে ধরে ঝাঁকাতে লাগল আর বলতে লাগল, বল, ইন্দ্রজিৎকে তুই খুন করে কোথায় পুঁতে রেখেছিস– বল…।
দাসানি এবার জোর করেই সরিয়ে দিলেন রাকেশকে। ঠেলে দিলেন একটা চেয়ারের দিকে। রাকেশ বসে পড়ল। মাথা ঝুঁকিয়ে বড়-বড় শ্বাস নিয়ে হাঁফাতে লাগল।
আমার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল। পৃথিবী এখন আর আমার ঘর-বাড়ি নয়, কিচ্ছু নয়। এখানে আমার আপনজন বলতে আর কেউ নেই।
দাসানি আবার ফিরে এলেন আমার কাছে। কাঁধে হাত রেখে বললেন, ইন্দ্রজিৎ, এবারে চাঁদের গল্পটা আপনি বলতে পারেন।
আমি ধীরে-ধীরে সব বললাম।
তিন বছর আগে আন্তর্জাতিক খনন সংস্থা উঁদের টেরা অঞ্চলে একটা আধুনিক খনন কেন্দ্র গঠনের উদ্যোগ নেয়। সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় এই কেন্দ্র তৈরি করা হয় দু-বছরের চেষ্টায়। এবং কাজ হল চাঁদের মাটি ও পাথর থেকে দুষ্প্রাপ্য খনিজ নিষ্কাশন করা। লুনার হাইল্যান্ডস-এ অবস্থিত এই কেন্দ্রটি চাঁদের ওপিঠে। অর্থাৎ, চাঁদের যে-দিকটা সবসময় পৃথিবীর কাছ থেকে আড়ালে থাকে, সেই দিকে। নিউক্লীয় শক্তিচালিত এই কেন্দ্রের তদারকির জন্যে পালা করে বিশেষজ্ঞ পাঠানো হয়। কিন্তু সমস্যা বাধে টাইটান উপগ্রহের বিদ্রোহী সভ্যতাকে নিয়ে।
প্রায় চারশো বছর আগে যন্ত্রসভ্যতায় বিশ্বাসী কয়েক হাজার পৃথিবীবাসী শনির টাইটান উপগ্রহে গিয়ে উপনিবেশ গড়ে তোলে। টাইটানের নাইট্রোজেন আর মিথেন ঘেরা আবহাওয়ায় আশ্চর্য দক্ষতায় তারা তৈরি করে নিরাপদ আবরণে ঢাকা শহর। তারপর বছরের পর বছর ধরে তারা প্রযুক্তিকে উন্নত করেছে। আর একইসঙ্গে পৃথিবীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছে। শোনা যায়, ওদের বহু গুপ্তচর ছড়িয়ে আছে পৃথিবীতে। চাদে আমাদের নতুন পরিকল্পনার কথা যথাসম্ভব গোপন রাখা হয়েছিল, কিন্তু তা সত্ত্বেও ওরা বোধহয় খবর পেয়ে যায়। তারপর ওদের গুপ্তচরের অন্তর্ঘাতমূলক ষড়যন্ত্রে অন্তত আমার তাই অনুমান চাঁদের খনন কেন্দ্রটি সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। আমি কোনওরকমে প্রাণে বেঁচে ফিরে আসি।
এখন বুঝতে পারছি, টাইটানের অ্যান্ড্রয়েড গুপ্তচর সন্দেহ করে সিকিওরিটি ডিভিশনের গার্ড পাঠানো হয় আমাকে উপযুক্ত অভ্যর্থনা করার জন্য। আর এখন আমার দেশপ্রেমের পুরস্কার দেওয়ার জন্যে অপারেশন ডিভিশন উন্মুখ। একেই বলে অদৃষ্ট!
নরেন্দ্র দাসানি ধৈর্য ধরে সব শুনলেন। মাঝে-মাঝে ওঁর কপালে ভাঁজ পড়ছিল। ওঁকে আমি আগে কখনও এখানে দেখিনি। একটা বিশাল বাড়িকে দুভাগে ভাগ করে তৈরি হয়েছে দুটো ডিভিশন ও সেন্ট্রাল সিকিওরিটি ডিভিশন ও সেন্ট্রাল অপারেশন ডিভিশন। দাসানি কোনটায় চাকরি করেন কে জানে!
একটা বাতাস-চেয়ার টেনে নিয়ে দাসানি বসলেন আমার মুখোমুখি। তারপর একটার পর একটা প্রশ্ন করতে শুরু করলেন।
স্কটল্যান্ডের ফোর্থ ব্রিজের ওপরে আমাকে একটা সনেট লিখে দিন তো..।
ও আমার দ্বারা হবে না। কবিতা আমি একদম লিখতে পারি না।
