রাকেশ কম্পিউটার টার্মিনালে বসে কি-বোর্ডের বোতাম টেপাটেপি করছিল। আমাকে ঘরে ঢুকতে দেখে অপরিচিতের চোখে তাকাল। কিছু বলল না।
আমাকে জেনারেটর গান বের করে দেওয়ার নির্দেশ, অথবা আদেশ, যিনি দিয়েছিলেন এবারে তাকে দেখলাম। শক্ত চোয়াল, কপালে ভাঁজ, ফ্রেঞ্চকাট কাঁচাপাকা দাড়ি, মুখটা লম্বা ধরনের, রোগাটে দীর্ঘকায় চেহারা, আর শুধু চোখের নজর দিয়েই বোধহয় মানুষ খুন করতে পারেন।
রাকেশ, আমি ফিরে এসেছি। আমি জেনারেটর গানটা টেবিলে রেখে রাকেশের দিকে হাত বাড়িয়ে এগিয়ে গেলাম, তোদের ভালোবাসার টানেই বোধহয় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসতে পেরেছি।
রাকেশ এক ঝটকায় কি-বোর্ড ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। মুখের রেখাগুলো বীভৎস হয়ে গেল। ওর হাতে কখন যেন একটা জেনারেটর গান গজিয়ে উঠেছে। ওর কথার প্রতিটি শব্দ যেন ভয়ংকর বজ্রপাতের মতো শোনাল, মিস্টার দাসানি, এই রোবটটাকে জিগ্যেস করুন ইন্দ্রজিৎ সান্যালের ডেডবডিটা ও চাঁদের কোথায় লুকিয়ে এসেছে!
আমি হতবাক হয়ে গেলাম। এসব কী শুনছি আমি? কোনওরকমে বললাম, রাকেশ, তুই কি পাগল হয়ে গেছিস? এই দ্যাখ, আমি, তোর ছোটবেলার বন্ধু ইন্দ্রজিৎ।
ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি আমার পিঠে টোকা মারলেন। বললেন, ব্যানার্জি ভুল বলেছে। রোবট নয়, অ্যান্ড্রয়েড–যাদের চেহারাটা হুবহু মানুষের মতো কিন্তু ব্যাটারি ছাড়া চলতে পারে না। হাসলেন দাসানিঃ যাই হোক, মাথাগরম করে লাভ নেই, ব্যানার্জি। আমি এখনও কাজ শুরু করিনি। আগে শুরু করি, তারপর দেখবেন ওসব শেখানো বুলি কোথায় যায়। তবে আপাতত এই মেশিনটাকে আমরা ইন্দ্রজিৎ সান্যাল বলেই ডাকব। তাতে জেরার সুবিধে হবে। আপনি বসুন, মিস্টার সান্যাল। আমার জেরা বহুক্ষণ ধরে চলে, অ্যান্ডয়েডদেরও পা ব্যথা হয়ে যায়।
দাসানির হাতে একটা খুদে রিমোট কন্ট্রোল ইউনিট ছিল। সেটার কী-একটা বোতাম টিপতেই ঘরের একমাত্র দরজায় নেমে এল স্বচ্ছ প্লাস্টিকের দেওয়াল। দরজা বন্ধ। ঘরে শুধু আমরা তিনজন।
রাকেশ চিবিয়ে-চিবিয়ে বলল, সান্যাল, তুমি বোধহয় জানো না, নরেন্দ্র দাসানি কাউন্টার এসপাইয়োনেজ ইউনিটের রোবোসাইকোলজিস্ট। শত্রুপক্ষের রোবটরা আজ পর্যন্ত ওঁকে ফাঁকি দিতে পারেনি।
আমি চেয়ারে বসে পড়েছিলাম। ক্লান্ত গলায় বললাম, আজ ছমাস পর আমি দেশে ফিরে এলাম…সুমিতা, রুনু-টুনু…কতদিন ওদের দেখিনি। একটু থেমে রাকেশকে লক্ষ করে অনুরোধ করলাম, বাড়িতে একটা ফোন করতে দিবি?
রাকেশ একবার দাসানির দিকে তাকাল। তারপর ঘরের সাদা দেওয়ালের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বিদ্রুপের হাসি হেসে আমার বাড়ির ভিডিওভেন নম্বরটা উচ্চারণ করল। রাকেশ নম্বরটা জানে। ও আমার বাড়িতে গেছে বহুবার। সুমিতাকে বউদি বলে ডাকে, আর রুনু-টুনুর কাছে কাকু।
রিমোট কন্ট্রোল ইউনিটটা পকেটে রেখে দিয়ে নরেন্দ্র দাসানি চুপচাপ আমাকে লক্ষ করছিলেন। তার নজরে সন্দেহ। আর ভাবখানা এই, কতক্ষণ তুমি আমার চোখে ধুলো দেবে, বাছাধন।
রাকেশ নম্বরটা উচ্চারণ করার সঙ্গে-সঙ্গে ঘরের একটা সাদা দেওয়াল জুড়ে ভেসে উঠল সুমিতার মুখ। রাকেশ বলল, বউদি, আমরা যা সন্দেহ করেছিলাম ঠিক তাই। ইন্দ্রজিতের বদলে এই রোবটটা ফিরে এসেছে চাঁদ থেকে। তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাইছে।
রাকেশ একপাশে সরে গিয়ে ইশারায় আমাকে দেওয়ালের কাছে ডাকল। আমি ঘুমিয়ে-চলা মানুষের মতো চেয়ার ছেড়ে উঠে এগিয়ে গেলাম সুমিতার কাছে। সুমিতা আমাকে দেখছে। ভুরু কুঁচকে গেছে, চোখ সন্দেহে কুটিল। ওর প্রশ্ন ছুটে এল বুলেটের মতো।
কোন তারিখে আমাদের বিয়ে হয়েছিল?
আমার কান্না পেয়ে গেল। রাকেশ আর দাসানি সফল হয়েছে। সুমিতার মনেও সন্দেহের বিষ ঢুকিয়ে দিতে পেরেছে ওরা। কিন্তু রুনু-টুনু?
সুমিতা কঠিন গলায় প্রশ্নটা আবার করল।
আমি মাথা নিচু করে উত্তর দিলাম। দেওয়ালের ছবির দিকে আর তাকাতে ইচ্ছে করছিল না।
সুমিতা আরও কয়েকটা প্রশ্ন করল। আমি জবাব দিলাম। রাকেশ ও দাসানি বাজপাখির নজরে খুঁটিয়ে দেখছে আমার প্রত্যেকটা প্রতিক্রিয়া। একবার মাথা তুলে দেখলাম, সুমিতার মুখের ভাব এতটুকু পালটায়নি।
এরপরই দেওয়ালে ফুটে উঠল রুনুর ছবি। আমার দশ বছরের মেয়ে রুনু। ফুটফুটে। সবাই বলে আমার মতো নাকি দেখতে।
রুনু, কেমন আছিস?
রুনু হাসিমুখে সবসময় যেমন ঠাট্টা করে ঠিক সেভাবেই বলল, বাপি, বলো তো আমার জন্মদিন কবে?
রুনু যন্ত্রণায় মোচড় খেয়ে শব্দটা আমার বুক ঠেলে বেরিয়ে এল। দু-হাতে মুখ ঢাকলাম আমি। গলার কাছটা ব্যথা করছে।
হঠাৎই শুনতে পেলাম কেউ আমাকে ডাকছে, বাপিসোনা!
আমি দেওয়ালের দিকে তাকালাম। টুনু। আমার পাঁচ বছরের ছেলে। একমাথা কেঁকড়া চুল। চোখ দুটো সবসময় কথা বলে। ও আমাকে নিশ্চয়ই ভুল বুঝবে না।
টুনু– আমি চিৎকার করে ডেকে উঠলাম।
বাপিসোনা, বলো তো, আমার ভালো নাম কী? ওটা ছাড়া আর-একটা কোন নামে তুমি আমাকে ডাকো?
আমি বসে পড়লাম মেঝেতে। আর পারলাম না। এতক্ষণের চেপে রাখা কান্না বুক ঠেলে বেরিয়ে এল। দুহাতে মুখ ঢেকে হাউহাউ করে কাঁদতে শুরু করলাম।
আর তখনই শক্ত কঠিন একটা স্পর্শ টের পেলাম ঘাড়ে। জেনারেটর গানের নল। আর একইসঙ্গে দাসানির আদেশ, জবাব দিন, ব্যানার্জি। যদি প্রমাণ করতে চান আপনি সত্যিই রাকেশ ব্যানার্জি-মানুষ!
