নাঃ, তার দরকার নেই, আমি দেখা করে নেব।
কিন্তু আপনার নাম বললে ভালো হত। বাবা ফিরলেই খবরটা দিতাম।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে কণ্ঠস্বর বলল, শুধু বোলো, শরেন দত্ত ফোন করেছিল। এটা বললেই তোমার বাবা সব বুঝতে পারবেন।
ফোনের লাইন কেটে গেল।
শোন্তার হাত কাঁপতে লাগল, পা কাঁপতে লাগল। লোকটা বলেছে, আমি দেখা করে নেব।
রিসিভার রেখে ও ডুকরে কেঁদে উঠল। তারপর চিৎকার করে মাকে ডাকতে লাগল।
মা ছুটে এলেন টিভি ছেড়ে। শোন্তা মাকে নিয়ে দৌড়ে গেল বারান্দায়। তাকাল রাস্তার মোড়ের দিকে। ওই পথ ধরেই গাড়ি নিয়ে ফিরবেন বাবা। ফিরবেন তো?
কয়েক মিনিট পরেই বিস্ফোরণের ভয়ংকর শব্দটা ওরা বারান্দা থেকেই শুনতে পেল। আগুন আর কালো ধোঁয়ার মেঘও দেখা গেল। ঝুলবারান্দা কেঁপে উঠল থরথর করে। আয়োনাইজড প্লাস্টিক শরেনকে আটকাতে পারেনি।
সন্দেহের এক কণা
স্পেসপোর্টে ফ্যালকন-১ নেমে পড়তেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল। ছমাস– মানে একশো আশি দিন পর আবার পৃথিবী। জন্মভূমি। আমার ঘর-বাড়ি। কেমন আছে রুনু আর টুনু? কেমন আছে সুমিতা?
মহাকাশযান থেকে নেমে ম্যাগনেটিক অটো ট্র্যাকে সবে পা রেখেছি, সঙ্গে-সঙ্গে ইউনিফর্ম পরা দশাসই চেহারার দুজন লোক কোথা থেকে এসে হাজির হয়ে গেল আমার দু-পাশে। ওদের পোশাকে সিকিওরিটি ডিভিশনের প্রতীক-চিহ্ন আঁকা। কোমরের কাছে উঁকি মারছে জেনারেটর গান। চোখে কালো চশমা। মাথায় মেটাল হেলমেট।
আমাদের জুতোর নীচে স্টিলের পাত লাগানো। ফলে চলমান ম্যাগনেটিক ট্র্যাকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লেই হল। দ্রুতগতির অটো ট্র্যাক আমাদের নিয়ে ছুটতে থাকে।
ওদের একজন জিগ্যেস করল, আপনি সান্যাল?
আমি বললাম, হ্যাঁ, চাঁদের এক সাঙ্ঘাতিক দুর্ঘটনা থেকে কোনওরকমে বেঁচে ফিরে এসেছি।
দ্বিতীয়জন আমার বাহু চেপে ধরল শক্ত হাতে ও সেটা অপারেশান ডিভিশন যাচাই করে দেখবে।
তার মানে? আমি বেঁচে ফিরেছি কি না সেটা যাচাই করে দেখবে অপারেশান ডিভিশন? আমি, ইন্দ্রজিৎ সান্যাল, গোটা মানুষটা জলজ্যান্ত বেঁচে ফিরে এলাম এটাই কি যথেষ্ট নয়? চাঁদের ওই সাঙ্ঘাতিক দুর্ঘটনায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে আমাদের ল্যাবরেটরি। শুধু ফ্যালকন-১ বেঁচে গিয়েছিল। ওটা আমি রেখেছিলাম ল্যাবরেটরি থেকে পনেরো কিলোমিটার দূরের একটা খাদের মধ্যে। সেখান থেকে পাথর বেয়ে উঠে হেঁটে পেরিয়েছি পনেরো কিলোমিটার পথ। চাঁদের বুকে এটুকু পথ কোনও ব্যাপারই নয়। কারণ মাধ্যাকর্ষণ পৃথিবীর ছভাগের একভাগ মতো হওয়ায় চলাফেরায় কষ্ট অনেক কম, তবে অভ্যেসের দরকার। আমি আগে আরও চারবার বিভিন্ন অভিযানে চাদে গিয়েছিলাম। চাঁদ আমার মোটামুটি সয়ে গেছে।
অদ্ভুত দক্ষতায় লোক দুটো অটো ট্র্যাকের পথ পালটাচ্ছিল। ট্র্যাকের অসংখ্য কাটাকুটির মধ্যেও সিকিওরিটি বিল্ডিংয়ের পথ চিনে নিতে বিন্দুমাত্রও অসুবিধে হচ্ছিল না ওদের। আমি একটু হকচকিয়ে গিয়েছিলাম। ইতস্তত করে বললাম, আগে বাড়িতে একবার দেখা করে গেলে হত না? আমার ছেলেমেয়ে, স্ত্রী, ছমাস ওদের দেখিনি।
লক্ষ করলাম, আমার এই কথায় একজন আর-একজনের দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে অভদ্রভাবে হাসল, তারপর বলল, ওসব পরে হবে, মিস্টার সান্যাল।
অন্য সময় হলে এই অভদ্র উত্তরের উপযুক্ত জবাব দিতাম। কিন্তু এখন সবকিছুই কেমন অস্বাভাবিক গোলমেলে লাগছে। তবে সিকিওরিটি ডিভিশনে আমার ছোটবেলার বন্ধু রাকেশ ব্যানার্জি রয়েছে। ওর সঙ্গে দেখা করলেই মনে হয় সব মিটে যাবে। ওদের বললাম, আমি রাকেশ, রাকেশ ব্যানার্জির সঙ্গে দেখা করতে চাই।
এবারে দ্বিতীয়জনের বিদ্রূপ-মাখানো হাসির পালা। বলল, ওঁর কাছেই আপনাকে নিয়ে যাচ্ছি। সেরকমই নির্দেশ আছে আমাদের ওপরে।
এবারে ভয় পেলাম। তা হলে কি সুমিতা বা রুনু-টুনুর কিছু হয়েছে! যে-ছমাস আমি ছিলাম না তার মধ্যে…ওঃ, ভগবান! আমি আর ভাবতে পারছি না।
চারপাশে অটো ট্র্যাকে অনেক লোকজন চলাফেরা করছে। কোনও শব্দ নেই। সকলেই স্থির হয়ে ট্রাকে দাঁড়িয়ে।
চারপাশের বাতাস বিশুদ্ধ! কারণ অক্সিজেন-নাইট্রোজেন সবই নিখুঁত শতকরা হিসেবে মিশিয়ে এই বাতাসকে আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের উপযোগী করে তোলা হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও মনে হল, আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। অটো ট্র্যাকের মানুষগুলো সব ঝাপসা হয়ে আসছে। আর আমার কানে চাঁদের বিস্ফোরণের শব্দ আঘাত করছে বারবার।
তারই মধ্যে টের পেলাম প্রথম লোকটিও আমার হাত চেপে ধরল। ওদের হাতে বন্দি হয়ে আমি এগিয়ে চলেছি। বন্দি ছাড়া আর কী-ই বা বলা যায় একে!
.
ঘরের ভেতরটা ঠান্ডা শীতাতপনিয়ন্ত্রিত। লুকোনো আলোয় আলোকিত। জানি, সাধারণ দৃশ্য আলো ছাড়াও এ-ঘরে অবলোহিত আলোর ব্যবস্থা রয়েছে। রয়েছে এক্স-রে ছবি তোলার আধুনিক আয়োজন। ঘরে আসবাবপত্র বলতে চারটে এয়ার কুশন, বাতাসে ভাসমান গদিওয়ালা চেয়ার। আর তার পাশে একটা পলিমারের সাতকোণা টেবিলে হোস্ট কম্পিউটারের টার্মিনাল।
জেনারেটর গানটা বের করে টেবিলে রাখুন, মিস্টার সান্যাল।
আমার জেনারেটর গানটা বাইরে থেকে দেখতে পাওয়ার কথা নয়। যে-দুজন গার্ড আমাকে এখানে পৌঁছে দিয়েছে ওরাও পায়নি। কিন্তু এখন আদেশ শুনে বুঝলাম, অপারেশন ডিভিশনের চোখকে ফাঁকি দিতে পারিনি। ফাঁকি দেওয়া শক্ত।
