প্রভাস ঠিকই বলেছিল, ওকে হুবহু আমারই মতো দেখতে। গায়ে কালো জামা আর কালো প্যান্ট। আধো-অন্ধকারে অন্তত তাই মনে হল। আর সবচেয়ে ভয় পাইয়ে দেয় ওর মুখ। সে-মুখে কোনও অভিব্যক্তি নেই। যেন পাথর কেটে তৈরি এক মরা মানুষের মুখ। বরফের মতো ঠান্ডা।
আমাকে দেখতে পেয়েই শরেনের ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল বলে মনে হল। ও পা বাড়িয়ে এগিয়ে আসতে শুরু করল আমার দিকে। লাইটপোস্টের আলোয় ওর হাসিটা ব্যঙ্গের অথবা তাচ্ছিল্যের হাসি বলে চিনতে পারলাম। আর তারপরই আমি প্রাণপণে ছুটতে শুরু করলাম। ছুটতে ছুটতেই পেছনে তাকিয়ে দেখি শরেনও এগিয়ে আসছে। কিন্তু ওর মুখের ভাবে কোনও পরিবর্তন হয়নি। এখনও পাথর আর বরফ। আমি ভাবছি…।
…শরেনকে আবার দেখলাম। রবিবার, সন্ধের মুখে। শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড়ের কাছে। নমিতা আর শোন্তাকে নিয়ে কিছু কেনাকাটা করতে বেরিয়েছিলাম। হঠাৎ দেখি ছুটে যাওয়া গাড়িঘোড়ার মধ্যে দিয়েই রাস্তা পার হয়ে শরেন আমার দিকে এগিয়ে আসতে চাইছে। সামান্য যেটুকু সময় ওর দিকে তাকিয়েছি তাতেই লক্ষ করেছি, প্রভাস মিথ্যে বলেনি। শরেনের শরীর খানিকটা স্বচ্ছ। কারণ, ওর ঠিক পিছনে দাঁড়ানো একটা লোককে আমি অস্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছিলাম। আমি চট করে নমিতা আর শোন্তাকে হাত ধরে টেনে নিয়ে ভিড়ের মধ্যে মিশে যেতে চাইলাম। ওরা অবাক হয়ে আমাকে অনেক কথা জিগ্যেস করছিল, কিন্তু আমি কোনও জবাব না দিয়ে সংক্ষেপে শুধু বলেছি, পরে বলব। তারপর তাড়াতাড়ি সরে পড়েছি সেখান থেকে। আমার বুকের ভেতরে হাপর টানার শব্দ হচ্ছিল।
.
শোন্তার স্পষ্ট মনে পড়ল ঘটনাটা। মাত্র দু-সপ্তাহ আগে, রবিবারেই হয়েছিল এই ব্যাপারটা। কেনাকাটা শেষ না করে আচমকা চলে আসার জন্য মা কম ঝগড়া করেননি বাবার সঙ্গে। আর শোন্তাও রাগ করে পুরো একটা দিন বাবার সঙ্গে কথা বলেনি। সোমবার রাতে বিছানায় শুয়ে বাবা বড় একটা শ্বাস ফেলে বলেছিলেন, একদিন তোরা সব বুঝতে পারবি।আজ সেই কারণটা জানতে পেরে শোন্তার কষ্ট হল। আর রাগ হল বাবার বন্ধুর ওপর।
ও খাপছাড়া লেখাগুলো আবার পড়তে শুরু করল।
.
..প্রভাসের কাছে আমি অনেকবার ছুটে গেছি মুক্তির আশায়, কিন্তু কোনও লাভ হয়নি। ও শুধু বলেছে, একবার যদি তুই শরেনের চোখে ধুলো দিতে পারিস, তা হলে ওর পুরোনো স্মৃতি সব মুছে যাবে। ও আবার নতুন করে একতিরিশ হাজার চারশো বর্গকিলোমিটার এলাকায় তোকে খুঁজতে শুরু করবে। তবে চিন্তা করিস না। আমি অ্যান্টিম্যাটার নিয়ে নতুন একটা এক্সপেরিমেন্ট শুরু করছি। ওটা সাকসেসফুল হলে বোধহয় তোর একটা ব্যবস্থা করতে পারব– আমার কেমন মনে হচ্ছিল, প্রভাস আমার কাছে সব সত্যি কথা খুলে বলছে না।
তারপর থেকে আর মিথ্যে আশা নিয়ে প্রভাসের কাছে ছুটে যাইনি। শরেনের দেখা পেলেই ওর চোখে ধুলো দিয়ে শুধু নিজের আয়ু বাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু এভাবে আর কতদিন! প্রভাস বলেছিল আয়োনাইজড প্লাস্টিকের কথা। সেটা জোগাড় করার জন্যেও কম চেষ্টা করিনি, কিন্তু কোনও খোঁজ পাইনি।
শোন্তাকে, শোন্তার মাকে, আমি এত ভালোবাসি যে, ওদের ছেড়ে যেতে আমার খুব কষ্ট হবে…।
.
শোন্তাকে ছোটবেলায় বাবা প্রায়ই জিগ্যেস করতেন, আমাকে তুই কতটা ভালোবাসিস রে?
উত্তরে শোন্তা ওর ছোট-ছোট দুটো হাত দুপাশে টান-টান করে বলত, এই এত্তখানি।এখন, এই মুহূর্তে ওর মনে হল, ওর হাত দুটো খুব ছোট। বাবাকে ও এত ভালোবাসে যে, ওই দুটো হাত টান-টান লম্বা করেও সেই ভালোবাসার এতটুকুও বোঝানো সম্ভব নয়। ওর হাত দুটো যদি ভগবানের হাতের মতো লম্বা হত!
.
অনেক কষ্টে আয়োনাইজড প্লাস্টিকের সন্ধান পেয়েছি। একজন মেকানিককে ধরেছি, সে প্লাস্টিক দিয়ে গাড়ির ভেতরটা মুড়ে দেবে। তারপর কোনও টেলারিং-এর দোকান থেকে ওই প্লাস্টিকের একটা জামা-প্যান্ট তৈরি করে নেব।
দেখি, পারলে কালই গাড়িটা নিয়ে যাব মেকানিকের কাছে…।
.
বাবার লেখা এখানেই শেষ। মানুষটার কষ্ট, মানুষটার বারবার পালটে যাওয়া সবকিছু এখন। বুঝতে পারছিল শোন্তা। কিন্তু কী করবে ও এখন? বলবে মাকে? নাকি…।
ক্রি রি রিং, ক্রি রি রিং…।
টেলিফোন বেজে উঠল ঘরের ভেতরে।
শোন্তা চমকে উঠল। তারপর তাড়াতাড়ি গিয়ে ড্রেসিং টেবিলের একপাশে রাখা টেলিফোনের রিসিভার তুলে নিল। মা ও-ঘরে টিভি দেখছেন। নিশ্চয়ই ফোনের বাজনা শুনতে পাননি।
হ্যালো—
কয়েক সেকেন্ড কোনও উত্তর নেই।
তারপর ও-প্রান্ত থেকে ভাঙা-ভাঙা গলায় কেউ জিগ্যেস করল, এটা নরেশ দত্তর বাড়ি?
শোন্তা চটপট জবাব দিল, হ্যাঁ, বলুন—
নরেশবাবু বাড়ি আছেন?
না, উনি একটু বেরিয়েছেন। আপনি কে কথা বলছেন? বাবা বাড়িতে থাকলে শোন্তা কখনও এ-প্রশ্ন করে না। সেটা অভদ্রতা।
তুমি কে বলছ? ও-প্রান্তের আড়ষ্ট গলা পালটা প্রশ্ন করল।
শোন্তার খুব রাগ হল। কিন্তু সেটা সামলে নিয়ে বলল, আমি ওনার মেয়ে। আপনি কে বলছেন?
আবার পালটা প্রশ্ন : তোমার বাবা কখন বাড়ি ফিরবেন?
শোন্তা কোনওরকমে বিরক্তি চেপে বলল, ঘণ্টাখানেক পরে ফিরতে পারেন।
ও-প্রান্তের কণ্ঠস্বর যেন আপনমনেই বিড়বিড় করল, তা হলে তো অনেক সময়…।
উনি ফিরলে কি কিছু বলতে হবে? শোন্তা জিগ্যেস করল।
