ও হো-হো করে হাসল। তারপর বলল, বুঝলি না? তোর অ্যান্টি-বায়ো-মডেলের আমি নাম রেখেছি শরেননরেশের ঠিক উলটো। শরেনকে দেখতে হুবহু তোর মতো–শুধু ওর দেহটা খানিকটা স্বচ্ছ…মানে অনেকটা ঘষা কাচের মতো। তবে ওর ভেতরটা তোর একেবারে উলটো– ম্যাটার, অ্যান্টিম্যাটার। আবার হেসে উঠল প্রভাস। ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে লাগল। ওর চোখেমুখে অহঙ্কার টগবগ করে ফুটে বেরোচ্ছে। ওর ঘরের দেওয়ালে নানা বিজ্ঞানীর ফটোগ্রাফ বাঁধানো। ব্রিটিশ বিজ্ঞানী পল ডিরাকের ফটোর কাছে গিয়ে দাঁড়াল প্রভাস। আবেগভরা গলায় বলল, অ্যান্টিপার্টিলের ধারণা প্রথম দিয়েছিলেন পল ডিরাক ১৯৩০ সালে। তখন তার কথা কেউ বিশ্বাস করেনি, কিন্তু দু-বছর পরেই মার্কিন বিজ্ঞানী কার্ল ডেভিড অ্যান্ডারসন পজিট্রন আবিষ্কার করেন। তারপর ১৯৩৩-এ ডিরাক নোবেল পুরস্কার পান। আমার দিকে ফিরে তাকাল প্রভাস : আমার পরীক্ষার প্রথম পদক্ষেপ হল শরেন। ওর কথা সবাই যখন জানবে তখন তাজ্জব হয়ে যাবে– কী বলিস? কে বলতে পারে, হয়তো নোবেল প্রাইজও জুটে যেতে পারে আমার কপালে।
হঠাৎ করেই আমার মনে হল প্রভাসের বোধহয় মাথার ঠিক নেই। বেঁকের মাথায় এ কোন ফাঁদে পা দিলাম আমি! এখন কি আর ফেরার পথ আছে? কিন্তু প্রভাসের পরীক্ষার কোনও ভুল হয়নি। ওর মুখে এরকম বিপদের কথা শুনেও কেমন শান্ত, স্থির রয়েছি আমি। সত্যিই দুশ্চিন্তা আর টেনশান একেবারে নেই। ভীষণ হালকা লাগছে। শুধু মাথাটা একটু ঝিমঝিম করছে। প্রভাসকে সেটা বলতেই ও বলেছে, ওটা হাই-ইনটেনসিটি ফিল্ডের জন্যে। একটু পরেই সব ঠিক হয়ে যাবে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তারপর ওকে জিগ্যেস করলাম, শরেন, মানে, ওই মডেলটা এখন কোথায়? সেই বুঝে আমাকে তো চলাফেরা করতে হবে।
প্রভাস বলল, নরেশ, সত্যি বলছি, শরেন কোথায় আছে আমি জানি না। শুধু এটুকু জানি, যে-মুহূর্তে আমার এক্সপেরিমেন্ট সাকসেসফুল হয়েছে ঠিক সেই মুহূর্ত থেকে শরেনের জন্ম হয়েছে। আমার থিয়োরি বলছে, এই অ্যান্টি-বায়োমডেলটা তোর ঠিক দুশো কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে থাকবে। আর তোর বায়োফিল্ডের টানে ওটা তোর কাছে আসার জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা করবে। অন্য কোনও মানুষ বা অন্য কোনও জিনিসের দিকে শরেনের কোনও টান থাকবে না। এক্সপেরিমেন্টের পর ঠিক কোন কো-অর্ডিনেটে শরেন অ্যাপিয়ার করবে, এটা আমার জানা নেই। থিয়োরির ওই জায়গাটা একটু ঝাপসা রয়ে গেছে। সবই স্পেস-টাইম আর ফিল্ড-রেডিয়েশানের ব্যাপার। সে যাকগে, দুশো কিলোমিটার দূরত্ব মানে প্রায় একত্রিশ হাজার চারশো বর্গকিলোমিটার এলাকা শরেনকে খুঁজতে হবে। ফলে ও চট করে তোকে খুঁজে পাবে না। কিন্তু তোর রেডিয়েশনের সিগন্যাল ওর অ্যানটেনায় সবসময় ধরা পড়বে।
শোন্তার কথা মনে পড়ল আমার। নমিতার কথা মনে পড়ল। কেমন একটা ব্যথা টের পেলাম বুকের ভেতরে। শরেন যদি শেষ পর্যন্ত আমাকে খুঁজে পায়! ওকে ঠেকানোর কি কোনও উপায় নেই? সে-কথা প্রভাসকে জিগ্যেস করতেই ও কিছুক্ষণ গম্ভীরভাবে চিন্তা করে তারপর বলল, একটা জিনিস দিয়ে শরেনকে হয়তো আটকানো যায়–তবে আমি কখনও পরীক্ষা করে দেখিনি।
কী জিনিস? অনেক আশা নিয়ে জানতে চাইলাম আমি।
আয়োনাইজড পলিমারমানে, আয়োনাইজড প্লাস্টিকও হতে পারে। কিন্তু বললাম যে, ওতে কতটা কাজ হবে ঠিক জানি না।
আর কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। কেমন একটা নেশার মধ্যে পাঁচ ঘণ্টা সময় কেটে গেছে। আমার। কোথা থেকে কী হয়ে গেল! দুশ্চিন্তা, টেনশান, ক্লান্তি, খিটখিটে রুক্ষ স্বভাব হয়তো আমার আর থাকবে না, কিন্তু স্পষ্ট বুঝতে পারলাম, মনের মধ্যে এক অসহায় ভয় বাসা বেঁধেছে। আর বুকের মধ্যে এক অদ্ভুত কষ্ট। নমিতা যদি এসব জানত! আমার ক্লাস সেভেনে পড়া ছোট্ট মেয়েটা যদি এসব জানত! তা হলে ওরা বোধহয় আগের খিটখিটে মানুষটাকেই মেনে নিত।
প্রভাসের বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসার সময় ও বলল, তোর দুশ্চিন্তাহীন নতুন জীবন সুখের হোক।
আমি কোনও জবাব দিলাম না, পেছন ফিরেও তাকালাম না। গাড়ি নিয়ে রওনা হয়ে পড়লাম বাড়ির দিকে।
ফেরার পথে একটা মানুষকে আমার চোখ খুঁজে বেড়াল। শরেন, তুই কোথায়?
.
পড়তে-পড়তে শোন্তা থামল। বাবার লেখা ও সবটা যে বুঝতে পারছে তা নয়। বিশেষ করে বিজ্ঞানের জায়গাগুলো বেশ জট পাকিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তা হলেও বাবার কষ্ট বুঝতে ওর কোনও অসুবিধে হচ্ছে না। এখন ও বুঝতে পারছে, কেন বাবা গাড়িটাকে প্লাস্টিক দিয়ে মুড়তে চাইছেন। ওই প্লাস্টিকটা নিশ্চয়ই আয়োনাইজড প্লাস্টিক।
এর পরের লেখাগুলো এলোমেলো, খাপছাড়া। স্কুলের পড়া ভুলে সেই লেখাগুলো পড়তে লাগল শোন্তা।
.
…শরেনকে আমি দেখতে পেয়েছি! গত পরশু সন্ধেবেলা রাজা দিনেন্দ্র স্ট্রিটে একটা বস্তিতে ঢোকার মুখে হঠাৎই শরেনকে দেখতে পেলাম। একটা অশথ গাছের গায়ে হেলান দিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে। নির্বিকার হবে না কেন? ওর যে শুধু একটাই কাজ আমাকে খুঁজে বের করা।
বাথরুমের কলটা সারানোর জন্যে কলের মিস্ত্রিকে খবর দিতেই ওই বস্তিটায় ঢুকেছিলাম আমি। আর প্রভাসের এক্সপেরিমেন্ট, শরেন, অ্যান্টি-বায়ো-মডেল–এসবের কথা ভাবছিলাম। এমন সময় ওকে দেখতে পেলাম।
