টাকার কথা বলতে চাইছে নাকি প্রভাস? টাকা যে আমার একেবারে নেই তা নয়, তবে যদি ও খুব বেশি কিছু চেয়ে বসে…। সুতরাং ওকে সরাসরি জিগ্যেস করলাম, ঠিক করে বল তো, কত টাকা লাগবে?
প্রভাস হেসে বলল, দূর, টাকার কথা কে বলছে! আমি বলতে চাইছি.মানে…তুই এতসব সুবিধে পাবি ঠিকই, তবে তার জন্যে তোকে ছোট্ট একটু ঝামেলাও ঘাড়ে নিতে হবে।
আমার গলাটা হঠাৎ কেমন শুকিয়ে গেল। জিগ্যেস করলাম, কী ঝামেলা?
বলছি– বলে প্রভাস হাতের সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে গুঁজে দিয়ে নতুন আর একটা ধরাল। বলল, মানে…তোকে একটু সাবধানে থাকতে হবে। নইলে বিপদ হতে পারে।
বিপদ! প্রভাস বলে কী!
.
ঠিক এমনসময় মায়ের হাতের চুড়ির শব্দ শুনতে পেল শোন্তা। মায়ের স্নান শেষ। মা গুনগুন করে গান করছেন। পায়ে-পায়ে এদিকেই আসছেন বোধহয়। একলাফে বিছানা থেকে নেমে পড়ল ও। কাগজগুলো আবার আগের মতো ভাঁজ করে রেখে দিল বাবার দরকারি বইয়ের ফাঁকে। তারপর ভূগোল বইটা খুলে ধপাস করে বসে পড়ল মেঝেতে।
মা ঘরে ঢুকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াতে-আঁচড়াতে জিগ্যেস করলেন কীরে, কী পড়ছিস?
ভূগোল–শোন্তা বইয়ের পাতায় চোখ রেখেই জবাব দিল। ওর মাথায় তখন বিপদের কথা ঘুরছিল। কীসের বিপদ হতে পারে বাবার?
প্রায় তিনটে দিন ছটফট করে কেটেছে শোন্তার। ও কিছুতেই বাবার লেখা কাগজগুলো আর পড়তে পারেনি। বাবাকে কিছু বলতেও পারেনি। শুধু চুপচাপ মানুষটাকে লক্ষ করেছে।
অবশেষে সুযোগ এল রবিবার বিকেলে। বাবা বললেন, আজ বেড়াতে বেরোবেন না। গাড়িটা কোনও মিস্ত্রিভাইয়ের কাছে নিয়ে গিয়ে ভেতরটা প্লাস্টিক দিয়ে নাকি মুড়ে নেবেন। মা অবাক হয়ে জিগ্যেস করলেন, এ আবার কী খেয়াল?
বাবা অস্পষ্টভাবে কী একটা বলে বেরিয়ে গেলেন।
আর তার একটু পরেই সুযোগ পেল শোন্তা। স্কুলের পড়া তৈরি করতে একগাদা বইখাতা নিয়ে ছড়িয়ে বসল ও। তারপর বাবার লেখা কাগজগুলো খুলে আবার লুকিয়ে পড়তে শুরু করল। মাকে নিয়ে এখন আর ভাবনা নেই। মা টিভির সামনে সিনেমা দেখতে বসে গেছেন।
.
…বিপদ! প্রভাস বলে কী!
আমি সাহস দেখিয়ে বললাম, কীসের বিপদ? খুলে বল তো শুনি–।
প্রভাস আমার কথার জবাব না দিয়ে জোরে হেসে উঠল। ওর বিশাল বাড়ির দেওয়ালে দেওয়ালে সে-হাসির প্রতিধ্বনি শোনা গেল যেন। একটু পরে হাসি থামলে প্রভাস বলল, নরেশ আমি দেড়বছর ধরে এই এক্সপেরিমেন্টটা করার জন্যে অপেক্ষা করেছি, কিন্তু সুযোগ পাইনি। এর অঙ্ক-টঙ্ক সব আমার আগেই কষা হয়ে গেছে। এখন শুধু হাতেনাতে পরখ করে দেখা বাকি। এমনই কপাল দ্যাখ, হঠাৎই আজ তোকে পেয়ে গেলাম। চল, ল্যাবে চল–।
প্রভাস উঠে দাঁড়াল। আমাকে একরকম হাত ধরে টেনে নিয়ে চলল ল্যাবের দিকে। আমিও মন্ত্রমুগ্ধের মতো ওকে অনুসরণ করলাম। দুশ্চিন্তাহীন নতুন জীবনের লোভ আমাকে আচ্ছন্ন করে দিল। বারবার মনে হচ্ছিল, আমার ব্যবহারে শোন্তা কিংবা নমিতা এরপর আর কখনও ব্যথা পাবে না। তবুও প্রভাসের বিশাল ল্যাবরেটরিতে পা রাখার সময় কোনওরকমে বললাম, একটু দাঁড়া। তুই যে কী একটা বিপদের কথা বলছিলি…।
প্রভাস আমার কথায় আমল না দিয়ে বলল, ও কিছু নয়। একটু সামলে থাকলেই হবে। আগে চল তো, কাজ শেষ করি–তারপর তোকে সব বুঝিয়ে দেব। ঘাবড়ানোর কিছু নেই, একদম সিম্পল।
ল্যাবের একটা জায়গায় আমাকে দাঁড় করিয়ে দিল প্রভাস। নানারকম বোতাম-টোতাম টিপে বেশ কয়েকটা রঙিন আলো জ্বেলে দিল। হঠাৎই দেখি আমাকে ঘিরে মেঝে খুঁড়ে দাঁড়িয়ে গেল চকচকে চারটে দেওয়াল। দেওয়ালের বাইরে থেকে প্রভাস চেঁচিয়ে বলল, দেওয়ালগুলো নম্যাগনেটিক অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি। তারপর ও কয়েকটা পাওয়ার সুইচ অন করে দিল। ফলে হাই পাওয়ার ম্যাগনেটিক ফিল্ড চালু হয়ে গেল, আরও কী কী যেন হল। ক্রিকেট খেলার কমেন্ট্রির মতো চেঁচিয়ে-চেঁচিয়ে সব বলে যাচ্ছিল প্রভাস। ধীরে-ধীরে ওর গলার স্বর যেন মিলিয়ে যাচ্ছিল। তারপর একসময় আমার আর কিছু মনে নেই।
যখন আবার সব টের পেলাম, তখন প্রভাসের বসবার ঘরে সোফায় বসে আছি। আর প্রভাস আমার পিঠ চাপড়ে বলছে, ..সেরকমভাবেই চলবি। তোর আর কোনও চিন্তা নেই, নরেশ। এবার সত্যিই তুই নরেশমানে, রাজা। এই দুনিয়ায় তুই-ই সবচেয়ে সুখী। তবে ছোট্ট একটা ব্যাপারে তুই একটু খেয়াল রাখিস… প্রভাসের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। একটু থেমে-থেমে ও বলল, তুই নিশ্চয়ই এটুকু বুঝতে পারছিস যে, তোর অ্যান্টি-বায়ো-মডেলটা অ্যান্টিম্যাটার দিয়ে তৈরি। ম্যাটারে যেমন ইলেকট্রন কণা থাকে, অ্যান্টিম্যাটারে তেমনই থাকে পজিট্রন। আর সাধারণ পদার্থের প্রোটনের জায়গায় অ্যান্টিম্যাটারে থাকে অ্যান্টিপোটন। সুতরাং এটা স্বাভাবিক যে, ম্যাটার আর অ্যান্টিম্যাটার পরস্পরকে স্পর্শ করলেই সর্বনাশ। সাংঘাতিক বিস্ফোরণের সঙ্গে-সঙ্গে বিকিরিত হবে অ্যানিহিলেশন রেডিয়েশান। আর তৎক্ষণাৎ ম্যাটার আর অ্যান্টিম্যাটার–দুটোরই অস্তিত্ব শেষ। মানে তোর আর তোর মডেলের সংঘর্ষ যদি হয় তা হলে তোরা দুজনেই শেষ। তুইও থাকবি না, আর শরেনও থাকবে না।
আশ্চর্য! প্রভাসের কথা শুনে আমার এতটুকু দুশ্চিন্তা হল না। বরং ওর শেষ কথাটায় অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম, শরেন মানে?
