মাস চারেক আগে প্রভাসের সঙ্গে আমার হঠাৎ দেখা হয়ে গিয়েছিল অফিসপাড়ায়, পার্ক স্ট্রিটে। অফিসের লাঞ্চের সময় বাইরে বেরিয়ে একটা পানের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। হাতে সিগারেট ছিল। কিন্তু সিগারেটের কথাটা আমার বোধহয় খেয়াল ছিল না। কীসব উলটো পালটা ভাবছিলাম। মাথার ভেতরে ভীষণ টেনশান ছিল। হঠাৎ আঙুলে ছ্যাকা লাগতেই চমকে উঠে সিগারেটটা ফেলে দিলাম, আর তখনই কে যেন আমাকে চেনা গলায় নাম ধরে ডাকল। তাকিয়ে দেখি, প্রভাস। সেই কোনকালে আমার সঙ্গে কলেজে পড়ত। কসবায় থাকত, বেশ ডানপিটে আর বেপরোয়া ছিল। খেলাধুলো, আড্ডা, সিনেমা–কোনওটাই বাদ দিত না। কিন্তু কী করে যে ভালো রেজাল্ট করত কে জানে। সেই প্রভাস, বাইশ বছর পর, আমার সামনে।
চিনতে পারামাত্রই ওকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম আমি। কোথায় হারিয়ে গেল একটু আগের টেনশান আর ক্লান্তি। তারপর রাস্তার ওপরে দাঁড়িয়েই শুরু হয়ে গেল আমাদের গল্প। কত পুরোনো কথা, কত ভুলে যাওয়া ঘটনা, কত হারিয়ে যাওয়া সুখের স্মৃতি। কিছুক্ষণের জন্যে সবকিছু ভুলে গিয়েছিলাম আমি। প্রভাস আমাকে ওর বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্যে হাত ধরে রীতিমতো টানাটানি শুরু করে দিল। ও এমন যে, ওকে কখনও না বলা যায় না। অগত্যা অফিস থেকে ছুটি করিয়ে বেরিয়ে পড়লাম ওর সঙ্গে। অফিসের পার্কিং স্পেসে আমার পুরোনো আমলের ফিয়াট গাড়িটা দাঁড় করানো ছিল। ওটা আমি নিজেই চালাই। মাঝে-মাঝে নমিতা আর শোন্তাকে নিয়ে ভিক্টোরিয়ায় বা আউটরাম ঘাটে বেড়াতে যাই। সেটা প্রভাসকে বলতেই ও ওর ড্রাইভারকে বলে দিল ওর মারুতিটা নিয়ে বাড়ি চলে যাওয়ার জন্যে। আমি একটু হেসে ওকে বললাম, আমার ছ্যাকরাগাড়ি চড়তে তোর কষ্ট হবে না তো? উত্তরে ও যেটা বলল সেটা আর লেখা যাবে না।
সল্ট লেকে প্রভাসের বাড়ি দেখে যেমন তাজ্জব হয়ে গেলাম, তেমনই অবাক হয়ে গেলাম ওর ল্যাবরেটরি দেখে। বড়লোক ওরা বরাবরই, তবে প্রভাস যে-মাপের ল্যাবরেটরি করেছে তার জন্যে লক্ষ-লক্ষ টাকা দরকার। আমাকে ল্যাব দেখাতে-দেখাতে নানা কথা বলছিল প্রভাস। ও সাতটা কোম্পানির টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজার। গবেষণার জন্যে সরকারি টাকাও পায়, আর সংসার করেনি গবেষণা করবে বলে। কথা বলতে-বলতে মাঝে-মাঝেই দরাজ গলায় হেসে উঠছিল ও। একটা সুখী মানুষের প্রাণখোলা হাসি। স্পষ্টই বোঝা যায়, ওর তেমন কোনও দুশ্চিন্তা নেই।
রাতের খাওয়াদাওয়া প্রভাসের বাড়িতেই করতে হল। তখন আমি নিজের কথা বলছিলাম। শোন্তার কথা, নমিতার কথাও বলেছি। শেষে বলেছি আমার দুশ্চিন্তা, টেনশান আর ক্লান্তির কথা। আমি জানি, অফিসে আড়ালে অনেকেই আমাকে বদমেজাজি, খিটখিটে বলে। না, কথাগুলো একেবারে মিথ্যে নয়। কিন্তু আমি তো সাধ করে ওরকম হইনি। আমার মাথার ভেতরটা সবসময় যেন কেমন করে।
পরে বুঝেছি, প্রভাসকে ওই কথাগুলো বলেই আমি নিজের বিপদ ডেকে এনেছি। প্রভাস সিগারেট ধরিয়েছিল। ফুরফুর করে ধোঁয়া ছেড়ে বিজ্ঞের মতো মাথা নেড়ে বলল, নরেশ, তোর এই প্রবলেম আমি এক্ষুনি সন্ড করে দিতে পারি–।
আমি অবাক হয়ে বলেছি, সত্যি।
তখন প্রভাস আমাকে বলতে শুরু করল।
যখন আমাদের দুশ্চিন্তা, টেনশান, বদমেজাজ এসব হয়, তখন আমাদের শরীরের ভেতরে কারেন্ট বইতে থাকে। আসলে বায়োকারেন্ট থাকে সবসময়েই, কিন্তু সেটা এত কম যে, হিসেবের মধ্যেই আসে না। দুশ্চিন্তা, টেনশান এসব হলে ব্লাড প্রেসার বেড়ে যায়, হার্ট বিট বেড়ে যায়, পাক্স রেটও যায় বেড়ে। এসবের মূলে হচ্ছে অটোনোমিক নার্ভস আর অটোনোমিক অরগ্যানিক স্টেট। তো এই অবস্থায় এক অদ্ভুত ধরনের বায়োরেডিয়েশান লক্ষ করেছি আমি। সেই রেডিয়েশান আর বায়োকারেন্ট–এই দুটোকে ব্যবহার করে তোর সব প্রবলেম সম্ভ করে দেওয়া যায়।
প্রভাস ফিজিক্স অনার্স নিয়ে বিএসসি পড়েছিল। পরে আরও বহু ডিগ্রি কুড়িয়ে খ্যাতি পেয়েছে। ওর কাছেই শুনেছি, গত পাঁচ-সাত বছর ধরে ওর গবেষণা বায়ো-পার্টিকল্স-এর স্ট্রাকচার, ফিল্ড আর রেডিয়েশান নিয়ে। ও আমাকে আরও কীসব বোঝাতে চেষ্টা করেছিল কিন্তু আমি কিছুই বুঝিনি। বোঝার কথাও নয়। কোনওরকমে পাস কোর্সে বিএসসি পাশ করার পর আমি কস্ট অ্যাকাউনট্যান্সি পড়েছি। এখন বলতে গেলে শুধু জমা-খরচের হিসেব নিয়েই নাড়াচাড়া করি। সুতরাং প্রভাস খুব আগ্রহ নিয়ে আমাকে অনেক কিছু বললেও তার বেশিরভাগটাই বেনা বনে মুক্তো ছড়ানো। হচ্ছিল।
প্রভাস তখন বলছে, শোন, তোর একটা অ্যান্টি-বায়ো-মডেল তৈরি করে দেব আমি। তার মধ্যে ঠিক বিপরীত ব্যবস্থা থাকবে। অ্যান্টি-বায়োকারেন্ট, অ্যান্টি-বায়োরেডিয়েশান–এইসব। ফলে যখনই তোর কোনও টেনশান বা দুশ্চিন্তা হবে, তখন ওই অ্যান্টি-বায়ো-মডেল তোর সমস্ত রিঅ্যাকশন শান্ত করে দেবে। এক মুহূর্তের জন্যেও তুই অশান্ত হবি না, তোর মেজাজ খারাপ হবে না কখনও। আর বালিশে মাথা ঠেকলেই গভীর ঘুম। তুই বোধহয় আর কখনও স্বপ্নও দেখবি না।
প্রভাস এমনভাবে সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে হাত নেড়ে সব বোঝাচ্ছিল যেন ব্যাপারটা জলের মতোই সহজ। আমি শুনতে-শুনতে একেবারে বিভোর হয়ে গিয়েছিলাম। বুকের ভেতর থেকে একটা বিশাল পাথর নেমে যাচ্ছিল ক্রমশ। আর ঠিক তখনই প্রভাস বলল, নরেশ, বুঝতেই পারছিস, এতসব সুবিধে তো একেবারে বিনি পয়সায় পাওয়া যায় না…।
