.
হাতের লেখাটা চিনে ফেলতে শোন্তার কোনও অসুবিধে হল না। বাবার লেখা। কিন্তু এইসব অদ্ভুত কথা বাবা লিখেছেন কেন? বইয়ের তাকে বাবার কয়েকটা দরকারি বইয়ের ফাঁকে খুঁজে রাখা ছিল কাগজগুলো। অবন ঠাকুরের বুড়ো আংলা বইটা খুঁজতে গিয়ে হঠাৎই কাগজগুলো বেরিয়ে পড়েছে। কাল রাতে শোওয়ার সময়ে বইটা পড়ছিল শোন্তা। পড়তে-পড়তে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে। কে জানে! ব্যস, তারপর আজ সকালে ঘুম ভেঙেই দেখে বই উধাও। মা বইটাকে যথারীতি লুকিয়ে ফেলেছেন। মায়ের ধারণা, একটু-আধটু গল্পের বই পড়লে নাকি পরীক্ষায় রেজাল্ট খারাপ হয়ে যাবে। সবসময় খালি বলেন, এই গল্পের বই পড়ে-পড়েই ক্লাস টেস্টের রেজাল্ট খারাপ হয়েছে। ক্লাস টেস্টে কুড়িতে পনেরো পেলেও মা বলেন, রেজাল্ট খারাপ। তারপর কেমন একটা সুর করে বলেন, দ্যাখো তো, অর্পিতা কেমন কুড়িতে আঠেরো পেয়েছে।
অর্পিতা তিনটে সেকশন মিলিয়ে ফার্স্ট হয়। কিন্তু মা তো আর জানেন না, অর্পিতাও গল্পের বই পড়ে। বুড়ো আংলা বইটা ওর কাছ থেকেই শোন্তা নিয়ে এসেছে।
সেই বইটা খুঁজতে গিয়েই কাগজগুলো দেখতে পেয়েছে শোন্তা। তারপর বিছানায় বসে পড়তে শুরু করেছে।
আজ বৃহস্পতিবার। ওর স্কুল ছুটি। কিন্তু বাবা অফিসে গেছেন। আর মা রান্নাঘরে রান্নার কাজে ব্যস্ত। দেওয়ালে টাঙানো কোয়ার্টজ ঘড়ির দিকে তাকাল ও। প্রায় পৌনে বারোটা বাজে। শোন্তা জানে, রান্না শেষ করে মা স্নান করতে ঢুকবেন। তারপর স্নান করে বেরোতে-বেরোতে সাড়ে বারোটা। ততক্ষণ ও একা। ওর সঙ্গী বলতে সামনের ঝুলবারান্দার এক চিলতে মেঘলা রোদ, আর বারান্দার রেলিঙে ছড়ানো কয়েকটা জামাকাপড়। নিস্তব্ধ দুপুরে একটা কাক কোথাও ক্লান্তভাবে ডাকছে। যেন বলতে চাইছে, আমার আর কেউ নেই।
বাবাকেও কদিন ধরে ওর কেমন যেন ক্লান্ত মনে হয়েছে। আর কেমন যেন হয়ে গেছেন ধীরে-ধীরে। সবে ক্লাস সেভেনে উঠলে কী হবে, শোন্তা বুঝতে পারে অনেক কিছু। বরং ও যে বুঝতে পারে, সেটা বাবা-মা-ই বুঝতে পারেন না সবসময়।
যেমন, গত কয়েক মাসে বাবাকে বেশ পালটে যেতে দেখেছে শোন্তা। এমনিতে বাবার মেজাজ ছিল বেশ খিটখিটে, সবসময় দুশ্চিন্তা করতেন, অফিসের কাজের চাপে কাহিল হয়ে পড়তেন, বাড়িতেও কথাবার্তা কম বলতেন, কেমন একটা রাশভারী মুখ করে বসে থাকতেন। ফলে মায়ের মনে এতটুকু শান্তি ছিল না। আর শোন্তারও ভীষণ খারাপ লাগত। মনে হত, বাড়ি ছেড়ে কোথাও চলে যায়। অর্পিতার বাবা-মাকে ও স্কুলে পেরেন্টস ডে-তে দেখেছে। ওঁরা সবসময় কেমন হাসছিলেন। ওদের দেখে অর্পিতাকে হিংসে করতে ইচ্ছে হয়েছিল। অথচ বেশি নম্বর পাওয়া নিয়ে শোন্তা কখনও অর্পিতাকে হিংসে করেনি।
হঠাৎই একদিন বাবা বদলে গেলেন। কোথায় গেল সেই দুশ্চিন্তামাখা রাশভারী মানুষটা! খিটখিটে মেজাজটাও কোথায় উধাও হয়ে গেল। আর ক্লান্তি? ক্লান্তি শব্দটাই যেন কেউ মুছে দিল বাবার জীবনের ডিকশনারি থেকে। সারাটা দিন বাবা তাজা শক্তি আর স্ফুর্তিতে টগবগ করতে লাগলেন। যেন টাইম মেশিনে চাপিয়ে কেউ ঝট করে অন্তত পনেরোটা বছর কমিয়ে দিয়েছে বাবার জীবন থেকে।
তারপর থেকে তিনটে মাস কী যে আনন্দে কেটেছে।
অফিস থেকে ফিরে এসে জামাকাপড় ছেড়েই বাবা শোন্তার সঙ্গে খেলতে বসে যেতেন। প্রথম দিন শোন্তা তো ভীষণ অবাক হয়ে গিয়েছিল। ও ভুল দেখছে না তো! যে-বাবা খেলার কথা বললেই সবসময় বলেন, এখন যাও তো, শুধু-শুধু বিরক্ত কোরো না, সেই বাবা ওকে হাসিমুখে আদর করে ডেকে নিয়ে বলছেন, কীরে, খেলবি নাকি–আয়। তোর ওই মুরগি-খেলনাটা নিয়ে আয় তো–যেটা বোতাম টিপলেই কঁক কঁক করে ডিম পাড়ে।
অবাক ভাবটা কেটে যেতেই শোন্তা মুরগি-খেলনাটা বের করে নিয়ে সোজা বাবার কাছে গিয়ে হাজির। মা রান্নাঘরে চায়ের জোগাড় করছিলেন। শোন্তা লক্ষ করেছে, মায়ের চোখেমুখে আনন্দ, অবাক হয়ে বাবাকে দেখছেন।
সেইদিন থেকেই অবাক হওয়ার শুরু। খেলা, হই-হুঁল্লোড়, গাড়ি চালিয়ে বেড়াতে যাওয়া, আর দরকার মতো বই নিয়ে শোন্তাকে ক্লাসের পড়া বুঝিয়ে দেওয়া– কী না করেছেন বাবা!
দেখতে-দেখতে কেটে গেছে তিনটে মাস। কিন্তু তারপর…শোন্তার স্পষ্ট মনে আছে, একদিন ও বারান্দায় বসানো টবের ফুলগাছগুলো নেড়েচেড়ে দেখছিল, বাবা হঠাৎই বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। চোখেমুখে দুশ্চিন্তা, ভয়। আকাশের দিকে চেয়ে কী যেন ভাবছেন। শোন্তা বাবা বলে ডাকতেই একটা অচেনা মানুষ ওর দিকে তাকিয়েছিল।
দ্যাখো, কী সুন্দর ফুল ফুটেছে এই গাছটায়! শোন্তা বাবার মন ভালো করার চেষ্টা করছিল।
ফুল… চিন্তার ঘোর কাটিয়ে অস্পষ্টভাবে কী যেন বললেন বাবা। তারপর কথার শেষটুকু আবার শোনা গেল, যদি একটা ফুল জানত অনেকদিন সে ফুটে থাকবে…অথচ একদিন পরেই তাকে টুপ করে ঝরে পড়তে হত, তা হলে ফুলটার খুব কষ্ট হত…না রে?
শোন্তা কী বলবে বুঝতে পারছিল না। আর ঠিক তখনই মা চায়ের কাপ নিয়ে এসেছিলেন বারান্দার।
সেইদিন থেকে ধীরে-ধীরে পালটাতে শুরু করেছিলেন বাবা।
শোন্তা লেখাটা আবার পড়তে শুরু করল।
.
…ও বলে, শরেনের কথা জানাজানি হলে সারা পৃথিবী নাকি চমকে যাবে। বলা যায় না, হয়তো নোবেল প্রাইজ-টাইজও জুটে যেতে পারে ওর কপালে।
