..তার মন যেন বুনো হাঁসের ডানায় ভর করে…।
এটা মন্দ নয়। এটাকেই ঘষেমেজে কাল ঠিক করে নেওয়া যাবে। কাল? জীবনের শেষ মুহূর্তে দাঁড়িয়েও একটা মানুষ আগামীকালের কথা ভাবে! সত্যি, স্বপ্ন দেখার কোনও শেষ নেই। এই কথাগুলোও মনে রাখতে হবে। বেশ ভালো। লেখার সময় যেন বাদ না পড়ে।
দড়িটা দেখছি ক্রমশ এঁটে বসছে। ঘামে ভিজে কি দড়ির আঁশগুলো কুঁকড়ে যাচ্ছে? না বোধহয়।
যাক, আর অপেক্ষা করে লাভ নেই কাজটা শেষ করে ফেলাই ভালো। কারণ, একটা উপন্যাস আমাকে শেষ করতে হবে।
নাও, আমি তৈরি, কুন্তলা। আমার কথাগুলো যেন শুকনো কাঠের খটাখট শব্দ।
এক গ্লাস জলের ছবি ভেসে উঠল চোখের সামনে। তেষ্টা পেল। কিন্তু না, এখন জল চাইলে সময় নষ্ট হবে। কল্পনায় টের পেলাম, আমি এক গ্লাস ঠান্ডা জল ধীরে-ধীরে চুমুক দিয়ে খাচ্ছি।
ঢোঁক গিলল সে। গলায় এঁটে বসা মোটা দড়িটা যেন হাজার ছুঁচ ফোঁটাচ্ছে। একটা শীতল অনুভূতি গলা বেয়ে নেমে যাচ্ছে তার অস্থির পাকস্থলীতে…।
না, জল চাই না!
দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার দিকে আবার চোখ ফেরালাম। একটা দুয়ে শীতল হাসি ঠোঁটে খেলিয়ে অপেক্ষা করছে। যেন এভাবে অনন্তকাল ও অপেক্ষা করতে পারে।
আমার মন তখন ছুটন্ত ঘোড়া। প্রতিটি ইন্দ্রিয়ের অনুভূতি ভীষণ স্পষ্ট! কুন্তলার প্রতিটি অভিব্যক্তি, ঘরের প্রতিটি আসবাব, আমার মস্তিষ্কের কোশে-কোশে গেঁথে যাচ্ছে শিলালিপির মতো।
…ফ্রেমে বাঁধানো ছবির কাঁচে মোমবাতির শিখা থরথর করে কাঁপছে। বইয়ের তাকে ছোট্ট ফাঁকা জায়গাটা যেন একটা অসুস্থ ক্ষত।
আমার টেবিলে একরাশ কাগজপত্র ছড়িয়ে রয়েছে। যে-উপন্যাস এখন লিখছি তারই পরিশ্রমের চিহ্ন। আমার মনের অন্য অংশ তখনও খুঁজে চলেছে সুন্দর শব্দ, সুন্দরতর বাক্য…।
…ঘরের একমাত্র খোলা জানলার বাইরে আকাশ অন্ধকার। সেই আঁধারের বুকে এক চিলতে চঁদ। হাতছানি দিয়ে তাকে ডাকছে। ডাকছে এমন জগতে, যেখানে অতীত নেই, ভবিষ্যৎ নেই, শুধু অস্তিত্ব আছে..।
নাঃ, ঠিক হল না। উপমাগুলো বড় পুরোনো। এ চলবে না।
আরও বহু শব্দ উথলে উঠছে মনের ভেতরে। জায়গা করে নিতে চাইছে সবার আগে। জটিল স্তব্ধতা, চিত্রার্পিত প্রতীক্ষা, ইঙ্গিতের ভারে অন্তঃসত্ত্বা চতুর হাসি। সব মিলিয়ে কুন্তলা।
মনের জানলা নিশ্চিত হাতে বন্ধ করে দিয়েছিলাম নিচ্ছিদ্র করে, কিন্তু ঠিক সেই সময়ে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল দরজাটা। সঙ্গে-সঙ্গে আঁপিয়ে এল স্মৃতির স্রোত। আমার চেতনা অচেতন হল। ওর দিকে তাকালাম। ছোট্ট দেহটা দেওয়ালে মিশিয়ে নিথর দাঁড়িয়ে আছে। অথচ এই নিশ্চল ভঙ্গিতেও কেমন যেন একটা গতির ইশারা ফুটে বেরোচ্ছে। প্রশান্ত সাগরের অতলে অজানা অচেনা গোপন ঢেউ ফুঁসে উঠছে…।
হ্যাঁ, বরাবরই ওর মধ্যে এই গুণটা আমি লক্ষ করেছি। যখন ওকে প্রথম দেখি, সেই মুহূর্তে বুকের ভেতরে বেজে উঠেছিল কামনার দুন্দুভি। তখনই এই চরিত্র আমি চিনতে পেরেছি। ওর বহিরাবরণ সবসময়ই নির্লিপ্ত। কখনও উচ্ছ্বাস নেই, আবার তেমন বিষণ্ণতাও নেই। যেন সব কিছুকেই মেনে নেয়। এমনকী ওর সঙ্গে অন্তরঙ্গ মুহূর্তেও এই একই ভাব আমি টের পেয়েছি। মনের গভীরে ও কী ভাবে আমি জানি না। আজ পর্যন্ত কখনও কোনওদিন ও রেগে ওঠেনি, বিরক্ত হয়নি, ঘৃণা করেনি, কোনও আবেগকে প্রশ্রয় দেয়নি।
যখন বাচ্চাটা মারা যায় তখনও নয়।
দুঃখ নিশ্চয়ই ও পেয়েছিল। ওর জুলজুলে চোখে আকস্মিক আঘাতের ছায়া পড়েছিল কয়েকদিনের জন্যে। কিন্তু আমার সংশয় তবু থেকে গেছে। তারপর থেকে কেমন অদ্ভুতভাবে ও নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে।
প্রথমে ভেবেছি, ও পম্পির মৃত্যুর জন্যে আমাকে দায়ী করে।
আমার শেষ উপন্যাসের প্রথম চ্যাপ্টার নিয়ে সেদিন একেবারে মগ্ন ছিলাম। কুন্তলা কেনাকাটা করতে কোথায় যেন বেরিয়েছিল। যাওয়ার আগে বারবার করে বলে গিয়েছিল, মাঝে-মাঝে যেন উঠে আমি বাচ্চাটার খাটের দিকে নজর দিই। কিন্তু লিখতে বসে একবারও উঠতে পারিনি। যখন লিলি আর অমিতাভর দৃশ্যটা নিয়ে মেতে আছি, তখনই ঘটেছিল সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। আমার ভীষণ খারাপ লেগেছিল। খুব অপরাধী মনে হয়েছিল নিজেকে…। কিন্তু একজন প্রকৃত শিল্পী যখন সৃষ্টির নেশায় মগ্ন তখন পার্থিব জগতে কী ঘটল না ঘটল তার জন্যে কি তাকে দোষ দেওয়া চলে! আর-কেউ না বুঝলেও কুন্তলা সেটা বুঝেছিল। আর সমালোচকরা আমার উপন্যাসের সেই দৃশ্যটাকে মহৎ, চিরায়ত ইত্যাদি বিশেষণে প্রশংসা করেছিলেন।
কয়েকদিন মনমরা হয়ে থাকার পর কুন্তলা চালচলনে স্বাভাবিক হয়েছিল। শুধু স্বাভাবিক নয়, ও যেন আমার আরও কাছাকাছি চলে এসেছিল। চটপট খুশি করতে পারত আমাকে, কোন জিনিসটা আমার কখন দরকার যেন অলৌকিক ক্ষমতায় বুঝে নিত, সৃষ্টির কাজে যখন হতাশ হয়ে পড়তাম তখন আমাকে উৎসাহ দিত সতেজ উদ্যমে। গুণীজনেরা বলেন, প্রতিটি প্রতিভাধর মানুষের পেছনে রয়েছে কোনও রমণীর প্রেরণা, ত্যাগ। আমার জীবনেও তাই। কুন্তলা। আর সাহিত্যিক হিসেবে আমার খ্যাতির পেছনে কুন্তলার কৃতিত্ব অনেকখানি! ওর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার কখনও আমি করিনি। সীমার সঙ্গে যে নিজেকে কিছুদিনের জন্যে জড়িয়ে ফেলেছিলাম তার কারণ পম্পির আকস্মিক মৃত্যু। পরে কুন্তলাকে সীমার ব্যাপারটা খুলে বলেছিলাম, বুঝিয়েছিলাম আমার হঠাৎ পদস্খলনের কারণ। কুন্তলা সে-নিয়ে কখনও কোনও অভিযোগ করেনি। শুধু বলেছে, এইরকমটাই হয়ে থাকে। ওর সহ্যশক্তি, মানিয়ে চলার ক্ষমতা আমাকে অবাক করে দিয়েছে।
