বস্তুত, শুয়োরের ভাবনায় কৌশিক এতই আচ্ছন্ন হয়ে উঠল যে, ও শুয়োর বিষয়ক স্বপ্ন অনায়াসে দেখতে লাগল। শুয়োরের ঘোঁত-ঘোঁত শব্দ এবং দেড় প্যাঁচওয়ালা লেজও ওর গভীর চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়াল।
ইদানীং কৌশিক নানারকম মানুষ দ্যাখে আর অবাক হয়ে ভাবে, এককালে আমাদের হাতদুটো ছিল সামনের পা। পায়ে খুর ছিল না বটে, তবে গায়ে বড়-বড় লোম ছিল।
এইসব ভাবনায় নিমজ্জিত অবস্থায় কৌশিক একদিন ময়দানের একটি জনসভায় হাজির ছিল। ওর উদ্দেশ্য ছিল, শুয়োর বিষয়ে আরও নতুন নতুন তথ্যসংগ্রহ। আর টুপি পরা শুয়োর টুপিহীন শুয়োরকে কীভাবে টুপি পরাতে চেষ্টা করে তাও হাতে-নাতে দেখা।
মঞ্চে এক প্রখ্যাত এবং ঘোড়েল রাজনীতিবিদ জ্বালাময়ী ভাষণ দিচ্ছিলেন। ভাষণের সারমর্ম বিপক্ষের রাজনৈতিক দলের গায়ে কাদা ছোঁড়া। আজকাল এটাই সহজ পথ হয়ে উঠেছে? আমি যে কত ভালো তা প্রমাণ করার একমাত্র উপায়, তুমি কত খারাপ সেটা সবাইকে সহজে বুঝিয়ে দেওয়া। এ-জাতীয় কাদাঘাটার মধ্যে কৌশিক যথারীতি শুয়োর-প্রবণতার লক্ষণ দেখতে পেল।
বক্তৃতার শেষে সেই নেতা যখন মঞ্চ থেকে নেমে আসছেন তখন কৌশিক তার মুখোমুখি হাজির হয়ে নিষ্পাপভাবে প্রশ্ন করে, আপনার ও-দুটো হাত, না সামনের পা?
পরিণামে, প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, ক্যাডাররা কৌশিককে তুলোধোনা করে।
মার খেয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় কৌশিক যখন অন্ধকার খোলা মাঠে পড়ে থাকে তখন ওর নিজেকে টুপিহীন শুয়োর মনে হয়। কিন্তু যারা ওকে নৃশংসভাবে আক্রমণ করেছিল, তারাও কি একই শ্রেণির? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে কৌশিক জ্ঞান হারায়। আকাশের চাঁদ ও তারা ওর অচেতন দেহ পাহারা দিতে থাকে।
কৌশিক সুস্থ হয়ে ওঠে সতেরো দিন পরে।
ময়দানে সেই পশুর মতো আক্রমণ ওকে এতটুকু বিচলিত করতে পারেনি। বরং ও বুঝতে পারে, টুপিহীন শুয়োরদের বেশিরভাগই হয় অন্ধ, নয়তো আত্মকেন্দ্রিক এবং স্বার্থপর।
কৌশিক বুঝতে পার, ওর সামনে এখন অনেক কাজ। শুয়োর বিষয়ে আরও অনেক গবেষণা ওকে করতে হবে।
এই সিদ্ধান্তে পৌঁছে কৌশিক জিলিপির কাছে কৃতজ্ঞতা বোধ করে।
শেষ লেখা
ঘরটা অস্বাভাবিক চুপচাপ। রাত এখন গভীর, কিন্তু গভীর রাতেও কিছু কিছু শব্দ থেকে যায়। কুকুরের চিৎকার, ছুটে যাওয়া কোনও ট্রাকের গর্জন, সিলিং-ফ্যানের শনশন, হাওয়ায় ওড়া দেওয়াল ক্যালেন্ডারের ঘষটানি।
আমার আঙুল তখন দড়িটার গেট নিয়ে ব্যস্ত, আমার চোখ একটু দূরে দাঁড়ানো ত্রস্ত মেয়েটির দিকে। বুক-কেসের সামনে শক্ত কাঠের পুতুল হয়ে দাঁড়িয়ে। লক্ষ করছে আমার প্রতিটি নড়াচড়া। ওর সুন্দর মিষ্টি মুখটা এখন ফ্যাকাসে, সেখানে প্রাণের কোনও অভিব্যক্তি নেই। ভয় নেই, করুণা নেই, এমন কি ঘৃণাও নেই।
দড়ির ফাসটা গলায় পরে নিলাম। তারপর কাঁপা হাতে সেটা টেনে আঁট করে বসালাম। বড্ড বেশি শক্ত হয়ে গেছে। একটু টেনে আলগা করলাম ফাসটা। মনের মধ্যে নানান ভাবনার ভিড়–একে অপরকে ঠেলে সরিয়ে জায়গা করে নিতে চাইছে।
কুন্তলার দিকে তাকিয়ে বললাম, ভয় পেয়ো না। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে দাঁড়ালাম। কারণ, বইয়ের থাকের ওপর আমি দাঁড়িয়ে আছি। আমি চাই না, সময় হওয়ার আগেই পায়ের নীচে ভরসাটুকু সরে যাক।
কুন্তলাকে আবার বললাম, কী কী করতে হবে সব মনে আছে তো?
এসব করার কী দরকার, রাজীব? কুন্তলার স্বর ওর মুখের মতোই ভাবলেশহীন। যেন পাথরে-পাথরে ঠোকাঠুকি হয়ে তৈরি হওয়া শব্দ। ওর জটিল মনের অন্দরে কী যে আঁকাবাঁকা চিন্তার খেলা চলে তার হদিস কখনও পেলাম না। কুন্তলা অন্য মেয়েদের মতো চিন্তা করে না। ও আলাদা।
না করে উপায় নেই, কুন্তলা।
সবসময় তুমি একই কথা বলো–আমার বিশ্বাস হয় না। এসব শুধু আমাকে কষ্ট দেওয়ার ফন্দি।
ছেলেমানুষী কোরো না, কুন্তলা!
একটা আবছা হাসি ওর মুখের আড়ষ্টতা নরম করল। মিষ্টি হাসি? নরম হাসি? মোনালিসা?
হঠাৎই ওর হাসি মিলিয়ে গেল। চমকে বলে উঠল, দাঁড়াও!
কেন?-আমার ঠোঁট শুকিয়ে গেছে।
কে যেন আসছে।
বাইরে অন্ধকার বারান্দায় পায়ের শব্দ শোনা গেল। শব্দটা একটু ইতস্তত করল, তারপর আবার চলতে শুরু করল। আমি শুধু অপলকে ওকে লক্ষ করছি। ও কি সত্যিই হেসেছে? নাকি কল্পনা?
ওরা চলে গেছে। আমি অস্পষ্ট গলায় বললাম।
কুন্তলা যেন সে কথা শুনতেই পেল না। নিষ্প্রাণ সুরে বলল, এসব কাণ্ড করে কি সত্যিই কোনও লাভ আছে, রাজীব?
এটা ওর অন্তরের কথা কি না টের পাওয়া ভার।
আমি কোনও উত্তর দিলাম না। আর-একটা মুহূর্ত অপেক্ষা করে দেখা যাক। এক মুহূর্ত!
একরাশ বইয়ের স্তূপের ওপরে দাঁড়িয়ে গলায় ফঁস পরে একটা অতিরিক্ত মুহূর্ত কোন কাজে লাগে কে জানে!
ঢোঁক গিলোম। বেশ কষ্ট হল। দড়িটা কেমন করে যেন বেশি এঁটে বসেছে। ঘামে-ভেজা হাতের তালু ঘষে নিলাম প্যান্টের খসখসে কাপড়ে। একটু আগেই দড়িটা ঢিলে করে দিয়েছিলাম, কিন্তু এখন দেখছি টাইট হয়ে গেছে। আমার মাথার ভেতরে একটা অংশ যুতসই শব্দ খুঁজে বেড়াল। তারপর শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে তৈরি করতে লাগল কথা।
..তার মনটা যেন খাঁচায় বন্দি এক উদভ্রান্ত বুনো পাখি…।
না, এটা ঠিক লাগসই হল না।
