তারপর থেকে আমার লেখার কাজ দিব্যি এগিয়ে চলেছে। শুধু থমকে দাঁড়িয়েছে আজ। একটা ভালো শব্দ, একটাও ভালো লাইন মাথায় আসছে না। মস্তিষ্কের ভাবনা-চিন্তার ভাঁড়ার সব শূন্য, নীরস মরুভূমি। কোন অদৃশ্য ছিদ্র দিয়ে যেন সব সাহিত্য-মনস্কতা চুঁইয়ে-টুইয়ে ঝরে গেছে রুক্ষ মাটিতে। সব চিন্তা জট পাকিয়ে এক ধাঁধা তৈরি করেছে মাথার ভেতরে। পাতার পর পাতা লিখেছি আর ছিঁড়ে ফেলেছি, ছিঁড়ে ফেলেছি আর লিখেছি। কুন্তলা কোনও প্রতিবাদ করেনি, বরং বন্ধুর হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু যখন বলেছি, এবারে ফাঁস লাগিয়ে ঝুলে না পড়লে আমার উপায় নেই, একমাত্র তখনই প্রতিবাদ করেছে কুন্তলা।
না, না, রাজীব, সে আমি সইতে পারব না। আমাকে জোর কোরো না!
কুন্তলা একথা বলেছে, কারণ, ও জানে আমি যখন কঁসি দেব তখন ওর ভূমিকা কী হবে।
কিন্তু আমি জেদ ছাড়িনি। ফলে ও বইয়ের পর বই সাজিয়ে তৈরি করেছে আমার দাঁড়ানোর জায়গা, আর আমি লিখতে বসেছি আত্মহত্যার স্বীকারোক্তি ও আমার মৃত্যুর জন্যে কেউ দায়ী নয়।
কুন্তলা দড়ি জোগাড় করেছে। রান্নাঘর থেকে নিয়ে এসেছে ধারালো ছুরি। তারপর বইয়ের স্কুপের ওপরে দাঁড়িয়ে যখন আমি ফাঁসির গেঁট বেঁধেছি তখন ও আমাকে ধরে রেখেছে সযত্নে, যাতে ব্যালান্স হারিয়ে পড়ে না যাই…।
.
আমি ঢোঁক গিলোম। দম বন্ধ হয়ে আসছে।
কুন্তলা আবার বলল, এসব করে সত্যিই কোনও লাভ আছে, রাজীব? এক সেকেন্ডের এদিক ওদিক হলেই বিপদ হতে পারে।
কথাগুলো শুনে মনে হল যেন বহুবার মহলা দেওয়া কোনও নাটকের সংলাপ। এর যেন কোনও গভীরতর অর্থ রয়েছে।
ওর নির্লিপ্ততার মুখোশ ভেদ করে আবেগের ছোঁওয়া টের পেলাম। অবশেষে এই আবেগ ভাসতে ভাসতে উঠে আসছে ওপরের স্তরে। আমার মধ্যেও শুরু হয়েছে এক অচেনা আবর্ত, এক শক্তিশালী অনুভূতি। কী লুকোতে চাইছে কুন্তলা? সেটা আমার জানার অধিকার আছে। ইচ্ছে করছে, ওর তন্বী দুপঁধে আমার হাতের শক্ত বাঁধন বসিয়ে প্রবল ঝাঁকুনি দিই, যাতে ওর লুকোনো চিন্তাগুলো রঙিন কাচের গুলির মতো শব্দ করে গড়িয়ে পড়ে মেঝেতে। তখন আমি জানতে পারব কোন সর্বনাশা ধূর্ত কুটিল সাপ কুণ্ডলী পাকিয়ে বসে আছে ওর মনের ভেতরে, কেন আমার মনে জেগে উঠেছে অস্বস্তি, অচেনা সংশয়, সূক্ষ্ম সন্দেহ। এইসব অস্পষ্ট অনুভূতিগুলো আমার ভেতরে এক প্রচণ্ড ঝড় তুলেছে।
কুন্তলা আমার…? জটিল যন্ত্রণায় ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম লেখার টেবিলের দিকে। একপাশে সাজানো রয়েছে লেখা পৃষ্ঠাগুলো। কুন্তলা…।
উঁহু, এ অসম্ভব। আমার লেখা কুন্তলা কখনও পড়তে চায় না। পাণ্ডুলিপিও নয়, বইও নয়। ও বলে, তোমার লেখার প্রতিটি বিষয় আমার এত চেনা, এত জানা যে, নতুন করে পড়ার কিছুই নেই। সুতরাং আমি কী করে তোমার লেখা সমালোচকের চোখ দিয়ে পড়ব? আমি তো জানি লেখার আইডিয়াগুলো তুমি কোথা থেকে পেয়েছ…।
কথাটা সত্যি। ফলে আমার অসমাপ্ত লেখার ওই দৃশ্যটা ও পড়েছে বলে মনে হয় না। ওই জায়গাটাই হবে আমার উপন্যাসের সেরা জায়গা, আমার জীবনের সেরা লেখা। জীবন থেকে নিংড়ে নেওয়া সাহিত্যনাঃ, এসব এখন ভেবে লাভ কী? হাতের কাজটুকু শেষ হয়ে যাক, তারপর ভাবব। কুন্তলা দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে…কীসের জন্যে?
আমার মৃত্যুর জন্যে।
ঠোঁটে জিভ বুলিয়ে নোনতা স্বাদ পেলাম। ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই। এরকম ঘটনা আগেও বার-সাতেক ঘটেছে। জীবন-মৃত্যুর সীমারেখায় দাঁড়িয়ে আমি লেখার রসদ জোগাড় করেছি। আমাকে বাধ্য হয়ে সাহায্য করেছে কুন্তলা। বিষধর কঁকড়াবিছের কামড়। ঘুমের ট্যাবলেট। কবজির ধমনি কেটে দেওয়া। আমার চারনম্বর উপন্যাসের সেই দৃশ্যটা–বাক্সের ভেতরে দম বন্ধ হয়ে মৃত্যু। তারপর পায়ে পাথর বেঁধে জলে ডুবে মৃত্যু–যেখানে কোমরে বাঁধা দড়িটা ধরা রয়েছে তীরে দাঁড়ানো এক যুবতীর হাতে। এই যুবতী ডুবন্ত নায়কের প্রেমে ও ঘৃণায় পাগল…অপূর্ব! সমালোচকরা একসুরে প্রশংসা করেছেন আমার ভয়ানক বাস্তববোধের। আমার বইয়ের প্রতিটি জীবন্ত মরণ-দৃশ্য আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। কোনও খাদ নেই তাতে। মৃত্যু–এক রহস্যময়ী রূপসি রমণী!
এইরকম প্রতিটি বিপজ্জনক পরীক্ষায় সময় আমি কুন্তলাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করেছি। কখনও ভাবিনি, সেই বিপন্ন মুহূর্তে আমি ওর শক্তির কাছে পরাধীন। তা হলে এবারে এত বিচলিত হয়ে পড়ছি কেন?
কুন্তলা! কুন্তলা! আতঙ্কে আমার স্বর রুদ্ধ বিকৃত হয়ে গেল। শরীরের আকস্মিক আক্ষেপকে সামাল দিতে গিয়ে বেসামাল হয়ে পড়লাম। অপ্রত্যাশিতভাবে পড়ে গেল বইয়ের পাহাড়। আমার চোখ ঠেলে বেরিয়ে এল, পা-জোড়া ছটফট করতে লাগল, হাত দুটো খুঁজতে লাগল যে-কোনও আশ্রয়। তারপর আপ্রাণ শক্তিতে খুলে ফেলতে চাইল গলায় এঁটে বসা ফঁসের দড়ি।
আমার যন্ত্রণাবিদ্ধ চোখের অস্পষ্ট দৃষ্টিতে ওকে দেখতে পেলাম। দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে আমাকে লক্ষ করছে, আর হাসছে কুন্তলা হাসছে–এদিকে আমার জীবনীশক্তি ধাপে-ধাপে শেষ হচ্ছে, অথচ ধারালো ছুরিটা ওর নিথর হাতে নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে ধরা। এবারে ও আমাকে আর বাঁচাবে না। আর খুনের দায়ে দোষীও হবে না ও। আমার চোখের সামনে ভাসতে লাগল ছুটন্ত আলোককণার আলপনা, তারপর একসময় সেটা ঝাপসা হয়ে নেমে এল অন্ধকার–শুধু চোখে নয়, চেতনাতেও।
