শুয়োরের চাষের ব্যাপারে সবচেয়ে এগিয়ে চিন। সেখানে গড়ে দুশো মিলিয়ান শুয়োর প্রতিপালন করা হয়।
চিনের পরেই রয়েছে ব্রাজিল। সে-দেশে গড় শুয়োরের সংখ্যা ষাট মিলিয়ান। ব্রাজিলের পর জায়গা পেয়েছে আমেরিকা ও রাশিয়া। এবং তালিকায় দশ নম্বর স্থানে রয়েছে ডেনমার্ক।
বেশ কয়েকমাস যাবৎ শুয়োর-চর্চার ফলে কৌশিকের মনে এইরকম ধারণা জন্মেছিল যে, পশ্চিমবঙ্গে তথা ভারতে শুয়োরের সংখ্যা মোটেই অবহেলা করার মতো নয়। ফলে, বিদেশি বইয়ের শুয়োর-তালিকায় ভারতের নাম না দেখে ও একটা ছোটখাটো অথচ উল্লেখযোগ্য ধাক্কা গেল।
একইসঙ্গে ওর মনে হল ও ভারতে শুয়োর সম্ভবত প্রচ্ছন্নভাবে লালিতপালিত হয়। বিদেশের পরিসংখ্যানবিদরা এইসব প্রচ্ছন্ন শুয়োরকে সহজে চিহ্নিত করতে পারেন না।
শুয়োরের চাষ যে বেশ লাভজনক তা কৌশিক পড়াশোনা করে স্পষ্ট বুঝতে পেরেছে। চাষের শুয়োর প্রধানত দু-রকমের : চর্বিপ্রধান ও মাংসপ্রধান। তবে আশির দশক থেকেই চর্বিপ্রধান শুয়োরের তুলনায় মাংসপ্রধান শুয়োরের চাহিদা বেড়েছে।
একটা শুয়োর স্রেফ চোখে দেখে তার ওজন আঁচ করা শক্ত। যেমন, সবচেয়ে বড় জাতের পুরুষ-শুয়োরের ওজন প্রায় ৪৫০ কিলোগ্রাম পর্যন্ত হতে পারে। আর স্ত্রী-শুয়োরের সর্বোচ্চ ওজন ৩৬০ কেজি ছুঁই-ছুঁই।
এই তথ্য জানার পর কৌশিক সিদ্ধান্তে পৌঁছোয় যে, প্রাণীদের মধ্যে শুয়োরের আপেক্ষিক গুরুত্বই বোধহয় সবচেয়ে বেশি।
বন্ধুমহলে কৌশিকের শুয়োর বিষয়ক গবেষণা যথেষ্ট হাস্যরসের খোরাক জুগিয়েছিল। তা ছাড়া ওকে দেখলেই বন্ধুরা নানা ধরনের লঘু মন্তব্য করে ওঠে। এমনকী আদিরসের রসিকতা করতেও ছাড়ে না।
একদিন এ-জাতীয় রসিকতায় নাস্তানাবুদ হয়ে কৌশিক যখন প্রায় কোণঠাসা এবং পর্যদস্ত, তখন সে গম্ভীরভাবে মন্তব্য করে, ভারতে প্রচ্ছন্ন শুয়োরের সংখ্যা কম নয়। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে এই সংখ্যা অত্যন্ত বেশি।
কৌশিকের এই মন্তব্যের ফলে, কী জানি কী কারণে, ওর বন্ধুরা বেশ আহত হয়েছিল।
কৌশিক তাতে খানিকটা মজা পেয়ে বলেছিল, পশ্চিমবঙ্গের জমিতে শুয়োরের চারা লাগালে তা দেখতে দেখতে লকলকিয়ে বেড়ে উঠবে।
সে-রাতে কৌশিক শুয়োরের চারা শব্দজুটি নিয়ে অনেকক্ষণ ধরে গভীরভাবে ভেবেছিল।
শুয়োর টুপি পরে, না কি পরে না
এই ভাবনা কৌশিকের মাথায় উদয় হয় মহাকবি সুকুমার রায়ের একটি কবিতা পড়ে।
কবিতাটি নামহীন এবং আবোল তাবোল গ্রন্থে পাদপূরণ হিসেবে সঙ্কলিত। কিন্তু কৌশিক অনায়াসে সেই কবিতার মোক্ষম চারটি লাইন মুখস্থ করে ফেলেছে?
বলব কি ভাই হুগলি গেলুম
বলছি তোমায় চুপি-চুপি
দেখতে পেলাম তিনটে শুয়োর
মাথায় তাদের নেইকো টুপি।
সুকুমার রায়ের কবিতা বরাবরই কৌশিককে ভাবায়। যেমন, তার হুঁকোমুখো হ্যাংলা কবিতার শ্যামাদাস মামা তার । আফিঙের থানাদার লাইনটির মধ্যে কৌশিক বর্তমানে বহুল প্রচলিত এবং প্রায় সর্বজনস্বীকৃত মামাতন্ত্রের আভাস পায়। কিংবা, ছায়াবাজি-র ছায়ার সাথে কুস্তি করে গাত্রে হল ব্যথা লাইনটির মধ্যে ও বর্তমানের যাবতীয় তদন্ত কমিশন গঠন ও তাদের হাস্যকর প্রচেষ্টার
স্পষ্ট ইঙ্গিত পায়। এবং এ-জাতীয় তদন্ত কমিশন যে তদন্তের চেয়ে কমিশনের ওপরেই বেশি জোর দিয়ে থাকে, সেই তাৎপর্যও যেন রায়সাহেবের কবিতার এই লাইনটির অন্তরাল থেকে কৌশিকের দিকে তাকিয়ে চোখ মটকে ব্যঙ্গের হাসি হাসে।
ঠিক একইভাবে কিম্ভুত কবিতার মধ্যে কৌশিক নিজেকে শনাক্ত করার চেষ্টা অথবা আত্মানুসন্ধানের ইঙ্গিত পায়। আর খুড়োর কল তো খুড়োর কল! পশ্চিমবঙ্গের জনগণ এই বস্তুটিকে হাড়ে হাড়ে চেনে।
সুতরাং, সুকুমার রায় যিনি কৌশিকের মতে মহাকবি যখন লেখেন টুপিহীন শুয়োর একটি আশ্চর্য ঘটনা, তখন এটা কি ধরে নেওয়া যায় না যে, টুপি পরা শুয়োরের সংখ্যাই সাধারণত বেশি! অথবা, একটু ঘুরিয়ে কি বলা যায়, টুপি পরা শুয়োর বেশি প্রচলিত?
আবোল তাবোল প্রকাশিত হয়েছিল ১৯২৩ সালে। সুতরাং, এটা আশা করা খুবই অযৌক্তিক যে, এখনও একমাত্র হুগলিতেই টুপি পরা শুয়োরের আধিপত্য। যদি একসময় তারা হুগলিতে থেকেও থাকে, এই ৭০ বছরে তারা নিশ্চয়ই নিয়মিত হারে বংশবৃদ্ধি করেছে এবং পশ্চিমবঙ্গের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। তা ছাড়া, হুগলি শব্দটা রায়সাহেব শুধুমাত্র ল বর্ণের অনুপ্রাসের জন্যও ওই কবিতায় ব্যবহার করে থাকতে পারেন।
এইরকম বহুমুখী চিন্তার পর কৌশিক মনে মনে সিদ্ধান্তে পৌঁছোয়ঃ
১) টুপি পরা এবং টুপিহীন–দু-রকম শুয়োরই এখানে পাওয়া যায়।
২) টুপিহীন শুয়োরকে টুপি পরানোর জন্য টুপি পরা শুয়োররা প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে থাকে।
কৌশিকের বিক্ষিপ্ত চিন্তা এবং সমস্যা
শুয়োর গবেষণায় কৌশিক যতই নিমগ্ন হয়, ওর মাথায় ততই বিক্ষিপ্ত চিন্তা জায়গা করে নিতে থাকে। যেমন, ওর মনে হয়, শুয়োরের দুধ মানুষের প্রাচীন পূর্বপুরুষ কবে প্রথম পান করেছিল। সেই দুধের অণুর কোনওরকম রাসায়নিক প্রভাব কি অধস্তন অথবা উত্তরপুরুষে প্রবাহিত হয়েছে? শুয়োরের মারাত্মক অসুখ কলেরা। এই কলেরা সংক্রামক। মানুষের কলেরার সঙ্গে শুয়োর কলেরার কী সম্পর্ক, বা আদৌ কোনও সম্পর্ক আছে কি না, সে-বিষয়ে কৌশিক অনুসন্ধান করতে বদ্ধপরিকর।
