কৌশিক বরাবর মাঝারি। ও জন্মসূত্রেও মাঝারি পিতামাতার সন্তান। ওঁদের বিত্ত এবং সামাজিক গুরুত্বও ছিল মাঝারি। পড়াশোনা ও আচরণে কৌশিক প্রত্যাশা মতোই মাঝারি-রেখাকে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে অনুসরণ করেছে। ওর পড়াশোনার বিষয় ছিল বাংলা এবং লক্ষ্য ছিল যথারীতি স্কুল বা কলেজে শিক্ষকতা।
বাংলায় এম. এ. মাঝারিভাবে পাশ করার পর ও নিয়মমাফিক অ্যাপ্লিকেশান, ইন্টারভিউ ইত্যাদি দিয়ে চলেছে। এবং নিয়মমতো বরাবরই ওর নাম প্যানেলে থেকেছে, চ্যানেলে যায়নি।
ক্রমাগত এইসব প্রচেষ্টায় যখন কৌশিকের একেবারে মাখামাখি অবস্থা, তখন ওর মাঝারি জীবন এক তরুণীর ভালোবাসায় কিছুটা ডগমগ হয়ে ওঠে। কিন্তু এবারেও ওর প্যানেলে নাম থেকে যায়, তরুণীর অন্যত্র বিয়ে হয়, কৌশিক বিয়ের নেমন্তন্ন পায় এবং কেঁদে আকুল হয়।
এইভাবে কৌশিক আদর্শ মাঝারি বাঙালি তরুণ হয়ে ওঠে। শুরুতে ও যে প্রচ্ছন্ন বেকার ছিল, ক্রমে তা অপ্রচ্ছন্ন হয়ে উঠতে থাকে। তবে জিলিপির প্রতি ওর দুর্বলতায় কখনও কোনওরকম ভাটা পড়েনি।
সুতরাং অপ্রচ্ছন্ন বেকার কৌশিক শুয়োর বিষয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠার পর একজন একনিষ্ঠ গবেষকের মতো এই অদ্ভুত চতুষ্পদটি সম্পর্কে তত্ত্বগত ও বাস্তবসম্মত অনুসন্ধান শুরু করে দিল।
শুয়োর এবং মানুষের সম্পর্ক
কৌশিক ঘুণাক্ষরেও জানত না, এই চতুষ্পদটির সঙ্গেই মানুষের সম্পর্ক প্রাচীনতম। এই তথ্য ওকে জানাল বালক-বালিকার জন্য প্রকাশিত ব্রিটানিকা জুনিয়ার এনসাইক্লোপিডিয়া। সুইডা পরিবারের সদস্য এই প্রাণীটি মানুষের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আদিম মানুষ প্রথম যেসব প্রাণীকে পোষ মানিয়েছিল, তার মধ্যে শুয়োর ছিল প্রধান। খ্রিস্টের জন্মের প্রায় ২৯০০ বছর আগে এশিয়াটিক সোয়াইনকে মানুষ পোষ মানায়। আর তাদের ইয়োরোপিয়ান জাতভাইয়েরা মানুষের কাছে পোষ মানে খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ সাল নাগাদ। কিন্তু অনেক চেষ্টা এবং খোঁজাখুঁজি করেও কৌশিক ভারতীয় শুয়োর অথবা পশ্চিমবঙ্গের শুয়োর সম্পর্কে সেরকম কোনও ঐতিহাসিক তথ্য জোগাড় করতে পারেনি। তবে ও মোটামুটি ধরে নিল, মানুষের (সম্ভবত) প্রাচীনতম গৃহপালিত পশুর নাম শুয়োর।
এ-থেকে কৌশিক দুটো সিদ্ধান্তে পৌঁছোয় :
১) শুয়োর মানুষের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২) শুয়োরের ঐতিহ্য মানুষের চেয়ে কোনও অংশে কম নয়।
এ ছাড়া আরও কয়েকটি তথ্য কৌশিককে বিচলিত করে ও শুয়োর মানুষের মতোই স্তন্যপায়ী। এবং মানুষের মধ্যে যেমন সাদা-কালো ভেদ আছে, শুয়োরের মধ্যেও সাদা-কালো ভাগ আছে। তবে কিছু শুয়োর আছে, যাদের রং সাদা কালো মেশানো। আর পশ্চিমবঙ্গে প্রধানত যে-শুয়োর পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া যায়, তার রং কালো।
সদ্য আবিষ্কৃত এই বৈশিষ্ট্যগুলো কৌশিককে রীতিমতো ভাবিয়ে তোলে। এবং একইসঙ্গে শুয়োর বিষয়ে ওর আগ্রহকে পাঁচ গুণ করে দেয়।
শুয়োরের আচরণ ও গতিবিধি
শুয়োরের আচরণ একটু-একটু কৌশিকের জানাই ছিল। কিন্তু গবেষণার তীব্রতা বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ও শুয়োর সম্পর্কে বহুগুণ বেশি মনোযোগী হয়ে উঠল।
কৌশিকের বাড়ির কাছাকাছি একটি প্রায়-মজে-যাওয়া দুর্দশাগ্রস্ত খাল আছে। এককালে নাকি এই খালে বজরা ভাসত। এখন যা ভাসে তা শুধুই কচুরিপানা এবং মানুষের বর্জ্য পদার্থ।
এই খালের পাড়ে অসংখ্য ঝুপড়ি। ঝুপড়িগুলো আবর্জনা ও মানুষে একেবারে উপচে পড়ছে। এই সব নিম্নবর্গের জনগণের কেউ-কেউ শুয়োর পালন করে থাকেন। শুয়োর পালনের কাজে খালের দুর্গন্ধময় ভয়ংকর নারকীয় পরিবেশ যথেষ্ট অনুকূল। খালের জলে থিকথিক করা পাঁক কালো কালো শুয়োরগুলোর গরম শরীরকে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে। শুয়োরের খাদ্য যা বাস্তবে অখাদ্য এবং কুখাদ্য–এখানে পাওয়া যায় অঢেল। সুতরাং অনায়াসে শুয়োরের পাল এখানে লালিতপালিত হয় এবং নির্বিঘ্নে দ্রুত হারে বংশবৃদ্ধি করে।
কৌশিক লক্ষ করেছে, আবর্জনার প্রতি আকর্ষণ শুয়োরের মৌলিক প্রবণতা। অক্লান্তভাবে নোংরা ঘেঁটে দেখা তাদের প্রিয় নেশা। পরিবেশ কোনও কারণে সাফসুতরো হয়ে উঠলেই শুয়োরের দঙ্গলে ত্রাহি ত্রাহি রব ওঠে। কারণ, নোংরা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশকেই তারা জিইয়ে রাখতে চায়। কোনও শুয়োরকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পরিবেশে নিয়ে গেলে সে হয় নোংরা পরিবেশে ফিরে আসে, অথবা সেই পরিষ্কার পরিবেশকে দ্রুত দূষিত করে নিজের বাসযোগ্য করে তোলে।
এ ছাড়া আরও একটা ব্যাপার কৌশিক লক্ষ করেছে : শুয়োর যখন নিজের খেয়ালে চরে বেড়ায় তখন কোনওদিকেই সে ভুক্ষেপ করে না–শুধুমাত্র নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকে। অর্থাৎ, নিজের স্বার্থটুকু বাদ দিলে শুয়োরকে মোটামুটিভাবে আত্মভোলা বলা যায়।
শেষ লাইনটায় প্রচ্ছন্ন পরস্পরবিরোধী ভাব লক্ষ করে কৌশিক নিজের স্বার্থটুকু বাদ দিলে কথাগুলো কেটে দেয়।
কৌশিক যতই ওর পর্যবেক্ষণের ফলাফল নিয়ে চিন্তা করছিল ততই দুটো সিদ্ধান্ত ওর মগজে স্পষ্ট চেহারা নিচ্ছিল?
১) নোংরা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ শুয়োরের ভীষণ প্রিয়। ২) নিজের ব্যাপার ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে শুয়োর যারপরনাই অন্যমনস্ক।
শুয়োরের চাষঃ নানা দেশে
ব্রিটানিকা জুনিয়ার এনসাইক্লোপিডিয়া-র ১৯৮০ সালের সংস্করণ কৌশিককে শুয়োরের চাষ সম্পর্কে কিছু মৌলিক তথ্য জোগান দিল।
