কাচের জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে স্টেশানের নামটা পড়তে চেষ্টা করলাম। কিন্তু কুয়াশা আর টিমটিমে মলিন আলো আমার চেষ্টায় বাদ সাধল।
ট্রেন আবার ছুটতে শুরু করল। আমি সুনন্দা পত্রিকাটা হাতে তুলে নিলাম। তারপর চোখ বুজে সুনন্দার-র পাতায় হাত বোলাতে লাগলাম। মনে হল, একটা অদ্ভুত আমেজ যেন টের পাচ্ছি। পাইরোনিকিঅ্যামিনোথিলিন তা হলে মিথ্যে নয়!
একটা বছর সত্যিই দেখতে-দেখতে কেটে গেল। কিন্তু কোনও টেলিফোন এল না আমার অফিসে। তারপর আরও দশটা দিন কেটে গেছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও ওই কনসালট্যান্ট ভদ্রলোক আমাকে ফোন করেননি।
মালিককে অনেক বলে কয়ে হাতে-পায়ে ধরে আমি পত্রিকাটা এখনও চালু রেখেছি। ওঁকে বলেছি ট্রেনের সেই ভদ্রলোকের কথা, পাইরোনিকিঅ্যামিনোথিলিনের কথা। তাতে উনি খুব হেসে ব্যাপারটাকে গাঁজাখুরি বলে উড়িয়ে দিতে চেয়েছেন। কিন্তু আমার বিশ্বাস তাতে একটুকুও টলেনি। তাই আমি এখনও মরিয়া হয়ে একটা টেলিফোনের জন্যে অপেক্ষা করছি। আমি জানি ফোন আসবেই। কারণ, সেই ফোনটার ওপরে প্রায় দেড়শো পরিবারের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।
আর সুনন্দা-র পাঠক হিসেবে আপনাকে একটা ব্যক্তিগত অনুরোধ করব। যদি কখনও সেই ভদ্রলোককে কোথাও দেখতে পান, দয়া করে আমাকে টেলিফোন করার কথাটা ওঁকে একবার মনে করিয়ে দেবেন। বলবেন, আমরা সবাই ওঁর মুখ চেয়ে তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করছি।
আমিও অবশ্য একেবারে হাত গুটিয়ে বসে নেই। দূরপাল্লার ট্রেনগুলোতে বিশেষ করে রাতের ট্রেনে–খেয়ালখুশি মতো উঠে পড়ছি। ফার্স্ট ক্লাস কামরায় খুঁজে বেড়াচ্ছি সেই ভদ্রলোককে।
আমি জানি, একদিন-না-একদিন ওঁকে খুঁজে পাবই। যে করে তোক খুঁজে আমাকে পেতেই হবে।
.
গল্পটা শেষ করে আমার মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। হাত-পা কঁপতে লাগল। কপালের কাছটায় অদ্ভুত ব্যথা শুরু হয়ে গেল।
এমন সময় চমকে উঠে খেয়াল করলাম, ট্রেনের গতি কমতে শুরু করেছে। বোধহয় সামনে কোনও স্টেশান আসছে।
কনসালট্যান্ট ভদ্রলোক ব্রিফকেস গুছিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। কাচের জানলা দিয়ে বাইরে একবার উঁকি মেরে বললেন, চলি, আমার স্টেশন এসে গেছে।
আমি তখন মরিয়া হয়ে ওঁকে বললাম আমার ম্যাগাজিনের কথা।
তাড়াহুড়ো করে বলতে গিয়ে অনেক কথা জড়িয়ে গেল। কিন্তু ভদ্রলোক আশ্বাস দেওয়ার ভঙ্গিতে মসৃণ হেসে হাত নেড়ে বললেন, কোনও চিন্তা নেই। সব বুঝতে পেরেছি। পাইরোনিকিঅ্যামিনোথিলিনের ব্যাপার তো! আসলে আমার সঙ্গে সুনন্দার কন্ট্রাক্ট শেষ হতে এখনও এক বছর বাকি। এই একটা বছর কোনওরকমে ম্যানেজ করে নিন, তারপর…।
আপনার অ্যাড্রেস বা ফোন নাম্বার যদি দেন।
ভদ্রলোক কেবিনের দরজার কাছে থমকে দাঁড়িয়ে ঘুরে তাকালেন আমার দিকে। মুচকি হেসে বললেন, ওসবের দরকার নেই। এক বছর পর আমিই আপনার অফিসে ফোন করে কনট্যাক্ট করে নেব। চারুলতা তো, আমার মনে থাকবে।
ভদ্রলোক চলে গেলেন। ফার্স্ট ক্লাস কেবিনে শুধু চুরুটের গন্ধ ভেসে রইল।
তারপর এক বছর কেটে গেছে, কিন্তু আমার অফিসে কোনও ফোন আসেনি। বছর পেরিয়ে আরও দশদিন কেটে গেছে, কিন্তু ওই কনসালট্যান্ট আমার সঙ্গে কোনও যোগযোগ করেননি।
তবে আমি কিন্তু এখনও হাল ছাড়িনি। মরিয়া হয়ে একটা টেলিফোনের জন্যে অপেক্ষা করছি। আর দুরপাল্লার ট্রেনগুলোতে বিশেষ করে রাতের ট্রেনে–খেয়ালখুশি মতো উঠে পড়ে ফার্স্ট ক্লাস কামরায় হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছি সেই ভদ্রলোককে।
আমি জানি, একদিন-না-একদিন ওঁকে আমি খুঁজে পাবই। যে করে তোক খুঁজে আমাকে পেতেই হবে।
আর সুনন্দা-র পাঠক হিসেবে আপনাকেও একান্ত অনুরোধ, যদি কখনও সেই ভদ্রলোককে কোথাও দেখতে পান, দয়া করে আমাকে টেলিফোন করার কথাটা ওঁকে একবার মনে করিয়ে দেবেন। বলবেন, দেড়শোটা পরিবার ওঁর মুখ চেয়ে তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করছে।
শুয়োর বিষয়ক একটি অসম্পূর্ণ গবেষণাপত্র
প্রথমে বন্দনা করি বাহ-নন্দন
অতঃপর বন্দি আমি কোটি দেবগণ।
ধরিত্রী আকুল যবে প্রলয় সলিলে
তোমা রূপ ধরি বিষ্ণু রক্ষে প্রাণিকুলে।
পশু মধ্যে তুমি শ্রেষ্ঠ তুমি শক্তিমান
পাপীরে পবিত্র কর তুমি পুণ্যবান।
(আদিকাণ্ড, বরাহ বন্দনা কাব্য, কবিকুলতিলক অখিলবন্ধু দেবশৰ্ম্মণ প্রণীত, ১২৩১ সন)
শুয়োর বিষয়ক গবেষণায় কৌশিকের প্রথম আগ্রহ জাগিয়ে তুলেছিল একটি অকিঞ্চিৎকর ছেঁড়া ঠোঙা।
জিলিপি বরাবরই কৌশিকের প্রিয়। বস্তুটির আড়াই প্যাঁচের রহস্য এবং মহিমা কৌশিককে বরাবরই বিস্মিত করেছে। কিন্তু একদিন জিলিপির বদলে তার ছেঁড়া ঠোঙা ওর তীব্র বিস্ময়ের কারণ হয়ে দাঁড়াল।
ঠোঙার শেষ জিলিপিটির সদগতি করে কৌশিক যখন সামান্য ছেঁড়া ঠোঙাটিকে ছুঁড়ে ফেলতে যাচ্ছে, ঠিক তখনই পয়ার ছন্দে লেখা কয়েকটি লাইন ওর দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
ঠোঙাটি সম্ভবত কোনও ফোটোকপি করা কাগজ থেকে তৈরি হয়েছিল। তার ফলেই কৌশিক প্রথম কবিকুলতিলক অখিলবন্ধু দেবশর্মণের নাম জানতে পারে এবং শুয়োরের প্রতি আকৃষ্ট হয়।
বছর চব্বিশের একজন সুপুরুষ যুবকের যখন টিভি, ভিডিও, ত্রিভঙ্গ নৃত্য (যার প্রচলিত নাম ব্রেক ডান্স) এবং তরুণীতে আকৃষ্ট হওয়ার কথা, তখন কৌশিক প্রথাগত পথ ছেড়ে হঠাৎই শুয়োরের প্রতি আকৃষ্ট হয়।
