সারকুলেশান বাড়ানোর সঙ্গে হিউম্যান কেমিস্ট্রির সম্পর্কটা এবারে যেন আমি আঁচ করতে পারছি। তাই ভেতরে-ভেতরে উত্তেজিত হয়ে পড়লাম।
ভদ্রলোকের প্রশ্নের উত্তরে বললাম, কিন্তু আমার চোখ তো দেখবে আমি একটা ম্যাগাজিন ছুঁয়ে আছি! তা হলে।
আমাকে বাধা দিয়ে ভদ্রলোক হেসে বললেন, ঠিকই বলেছেন। চোখ যে-ইনফরমেশান ব্রেনে পাঠাবে তার সঙ্গে ট্যাক্টাইল ফিডব্যাকের ইনফরমেশান মিলবে না। তখন এই দুটো পরস্পরবিরোধী খবরের মধ্যে যেটা আপনার প্রিয় সেটাই আপনি মেনে নেবেন। এই কারণেই সুনন্দা পত্রিকাটা আপনি কখনও কাছছাড়া করতে চান না। ওটা সবসময় আপনার হাতের কাছে রাখতে ইচ্ছে করে।
আমি হতবাক হয়ে গেলাম। বিমূঢ় চোখে আমার কোলের ওপর রাখা সুনন্দা পত্রিকাটার দিকে তাকালাম। এটাই তা হলে ম্যাগাজিনটার গোপন ম্যাজিক!
সুনন্দা-র ব্যাপারটা আমি ভালো করেই জানি, ভদ্রলোক তখনও বলে যাচ্ছেন, আমি ওদের কনসালট্যান্ট। অবশ্য এটা ওরা সিক্রেট রেখেছে।
সুনন্দা-র ট্যাক্টাইল ফিডব্যাকের রাসায়নিক বিক্রিয়া পালটে দেওয়ার ব্যাপারটা আমার হিউম্যান কেমিস্ত্রির কারিকুরি। জানি, আপনার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু যা সত্যি তাই আপনাকে বললাম…বিশ্বাস করা-না করাটা আপনার ব্যাপার।
একটা ব্যাপারে একটু খটকা লাগছে… একটু ইতস্তত করে আমি বললাম, ট্যাক্টাইল ফিডব্যাকের ইনফরমেশানটা আপনি পালটাচ্ছেন কেমন করে?
ভদ্রলোক আমার দিকে সরাসরি চোখ রেখে মুচকি হাসলেন। চুরুটে গভীর টান দিলেন। চুরুটের ডগার আগুনটা আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল। একটু সময় নিয়ে তিনি বললেন, ট্যাক্টাইল ফিডব্যাক আমি চেঞ্জ করেছি পাইরোনিকিঅ্যামিনোথিলিন দিয়ে।
পাইরোনিকি…। ।
আমাকে থামিয়ে দিয়ে ভদ্রলোক হেসে বললেন, হ্যাঁ, পাইরোনিকিঅ্যামিনোথিলিন। প্রথাগত রসায়নশাস্ত্র কখনও এই কেমিক্যালটার নাম শোনেনি। এটা হিউম্যান কেমিস্ত্রির ব্যাপার…আমার ল্যাবরেটারিতে অনেক ঝাট করে তৈরি। সুনন্দা যে কাগজে ছাপা হয় তার মধ্যে এই কেমিক্যাল নির্দিষ্ট পরিমাণে মিশিয়ে দেওয়া আছে। এ ব্যাপারে পেপার মিলের সঙ্গে ব্যবস্থা করা আছে। আর যেকালিটা ওরা ছাপার জন্যে ব্যবহার করে তার মধ্যেও মেশানো আছে ওই পাইরোনিকিঅ্যামিনোথিলিন। এটাই হল সুনন্দার গোপন ম্যাজিক। তাই আপনাকে বলছিলাম, শুধুমাত্র ভালো লেখা, ছাপা, রংচং বা দামি কাগজ দিয়ে আড়াই লাখ প্লাস সারকুলেশানে পৌঁছানো যায় না–এর অন্য একটা সিক্রেট আছে। এবার তো সেই সিক্রেট আপনি জেনে গেলেন।
কথা শেষ করে ভদ্রলোক চুরুটটা অ্যাশট্রেতে গুঁজে দিলেন। কৌতুকের নজরে চেয়ে রইলেন আমার দিকে।
শীতের মধ্যেও আমার কপালে বোধহয় ঘাম জমছিল। ভদ্রলোকের এই অবিশ্বাস্য কাহিনি কি বিশ্বাস করা যায়? কিন্তু কাজললতা-র সারকুলেশানের যা অবস্থা তাতে মরিয়া হয়ে কিছু একটা আমাকে করতেই হবে। আগামী ছ-আট মাসের মধ্যে সারকুলেশান বাড়ানোর কোনও ব্যবস্থা না করতে পারলে মালিক কলকাতার পাততাড়ি গুটিয়ে চলে যাবেন দিল্লি অথবা মুম্বাইতে। সুতরাং ডুবে যাওয়া মানুষের খড়কুটো আঁকড়ে ধরার মতো আমি ভদ্রলোককে অনুনয়ের সুরে বললাম, আমাদের ম্যাগাজিনটার একটা হিল্লে করে দিন না! আর কয়েক মাসের মধ্যে যদি ওটার সারকুলেশান না বাড়াতে পারি…।
ভদ্রলোককে আমার দুরবস্থার কথা খুলে বললাম।
কিছুক্ষণ চিন্তা করে তিনি বললেন, আপনার পজিশনটা আমি বেশ বুঝতে পারছি। তবে আমারও একটা অসুবিধে আছে। সুনন্দা-র সঙ্গে আমার পাঁচ বছরের এগ্রিমেন্ট হয়েছে। সেই কন্ট্রাক্ট পিরিয়ড শেষ হতে এখনও একটা বছর বাকি। আমি একটা ম্যাগাজিনের হয়ে কখনও পাঁচ বছরের বেশি কাজ করি না। কারণ, একটা ম্যাগাজিন চিরকাল সারকুলেশানের টপে থাকতে পারে না–অন্তত থাকা উচিত নয়–সেটাই ন্যাচারাল। সেই অর্থে আমি কখনও নেচারের বিরুদ্ধে যেতে চাই না। সুতরাং আপনার ম্যাগাজিনের সারকুলেশান কনসালট্যান্ট হতে আমার কোনও অসুবিধে নেই–শুধু ওই কন্ট্রাক্টের ব্যাপারটা ছাড়া। একটা বছর আপনাকে ওয়েট করতেই হবে।
এ–ক বছর!
আমার হতাশা দেখে ভদ্রলোক উৎসাহ দিয়ে বললেন, একটা বছর মানে ৩৬৫ দিন। ও দেখতে-দেখতে কেটে যাবে। তা ছাড়া আমার ফিজের ব্যাপারটা নিয়েও আপনার মালিকের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে হবে। আপনি যেভাবে তোক একটা বছর ম্যানেজ করে নিন। তারপর আমি এসে গেলেই দেখবেন ম্যাজিক। তখন আপনার ম্যাগাজিন সোয়াহিলি ভাষাতে ছাপা হলেও ওই পাইরোনিকিঅ্যামিনোথিলিনের কৃপায় রমরম করে বিক্রি হবে।
খেয়াল করিনি কখন ট্রেনের গতি কমে এসেছিল। আর ভদ্রলোকও কাচের জানলা দিয়ে। হঠাৎ একবার উঁকি মেরে আপনমনেই বললেন, ও, এসে গেছে। তারপর চট করে ব্রিফকেস গুছিয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। ছোট্ট একটা হাই তুলে বললেন, চলি। যা বললাম, ওই একটা বছর কোনওরকমে ম্যানেজ করে নিন।
কেবিনের দরজা ঠেলে তিনি করিডরে পা রাখতেই আমি পিছু ডেকে বললাম, আপনার অ্যাড্রেসটা?
ভদ্রলোক ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন আমার দিকে। মুচকি হেসে বললেন, অ্যাড্রেসের দরকার নেই। এক বছর পর আমিই আপনার অফিসে ফোন করে কনট্যাক্ট করে নেব। কাজললতা তো, আমার মনে থাকবে।
ভদ্রলোক চলে গেলেন। ফার্স্ট ক্লাস কেবিনে আমি একা বসে রইলাম।
