আমি একটি পত্রিকা অফিসে কাজ করি। সেই হাউসের চারটি ম্যাগাজিন আছে। তিনটি ইংরেজি, একটি বাংলা। বাংলা পত্রিকাটি পাক্ষিক। নাম চারুলতা। নাম শুনে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন পত্রিকাটির চরিত্র সুনন্দার মতোই। আমি এই পত্রিকার সারকুলেশানের দায়িত্বে রয়েছি।
তিন বছর ধরে চারুলতা প্রকাশিত হচ্ছে। নামী লেখকরা নিয়মিত এই পত্রিকায় লেখেন। অনেক খরচ করে যত্ন নিয়ে এই রঙিন পাক্ষিকটি প্রকাশিত হয়। কিন্তু তিন বছর এই পত্রিকার সারকুলেশান পনেরো হাজারেও পৌঁছোয়নি।
আমাদের হাউসের মালিক সর্বেশ্বর নাগ অনেক আশা নিয়ে ম্যাগাজিনটি বের করেছিলেন। পত্রিকার প্রথম সংখ্যা প্রকাশ করার আগে চুলচেরা মার্কেট সার্ভে করা হয়েছিল। তার পজিটিভ আউটকাম দেখেই যথেষ্ট উৎসাহ নিয়ে পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়।
তিন বছর ধরে আমি মুখে রক্ত তুলে চারুলতা-র বিক্রি বাড়াতে চেষ্টা করেছি। ইস্টান রিজিওনের বাঙালি অঞ্চলে ঘন-ঘন ট্যুর করেছি। কিন্তু চারুলতা-র বিক্রি সুনন্দা-র ধারে কাছে পৌঁছোতে পারেনি। আমি দুটো পত্রিকা হাতে নিয়ে লক্ষবার তুলনামূলক বিচার করেছি। কিন্তু কিছুতেই চারুলতা-র মাইনাস পয়েন্ট বের করতে পারিনি।
গত কয়েকমাসে মিস্টার নাগ আমাকে ডেকে বেশ কয়েকবার প্রচ্ছন্ন ধমক দিয়েছেন। যার অর্থ হল, যদি আগামী ছ-আট মাসে ম্যাগাজিনের বিক্রি বাড়াতে না পারি, তা হলে উনি ম্যাগাজিন বন্ধ করে দেবেন। আর যদি শুধু ইংরেজি পত্রিকাই বের করতে হয়, তা হলে কোনও অবাঙালি বিজনেস পার্টনার নিয়ে দিল্লি বা মুম্বাই থেকে তিনি সেগুলো বের করবেন। অর্থাৎ, কলকাতা থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে নেবেন। যার বাংলা মানে হল, প্রায় দেড়শো স্টাফ বেকার হবে। সেইসঙ্গে দেড়শো পরিবার এক চরম অবস্থায় মুখোমুখি দাঁড়াবে।
এইরকম একটা বিপন্ন অবস্থায় আমি পত্রিকার বিক্রি বাড়ানোর কাজে আসাম আর উত্তরবঙ্গ টুরে গিয়েছিলাম। অক্লান্ত পরিশ্রম করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দুটো সপ্তাহ মরিয়া হয়ে কাজ করেছি। তারপর নিতান্ত ক্লান্ত-শ্রান্ত শরীরে উঠে পড়েছি হাওড়া ফেরার ট্রেনে।
নভেম্বরের শেষ। এ-সময়ে কলকাতায় শীত তেমন জাঁকিয়ে না-বসলেও এ-দিকটায় ঠান্ডা আছে।
আমার ফার্স্ট ক্লাস কেবিনে দূরপাল্লায় যাত্রী কেউ ছিল না। তাই কারও সঙ্গেই তেমন করে আলাপ জমেনি। কিন্তু সন্ধের পর একটা বড়সড় ব্রিফকেস হাতে এমন একজন যাত্রী কেবিনে ঢুকলেন, যাঁর চেহারা রীতিমতো নজর কেড়ে নেয়।
ভদ্রলোকের বয়েস ষাট-বাষট্টি হবে। ফরসা স্বাস্থ্যবান শরীর। পরনে গাঢ় রঙের স্যুট, টাই। মাথার মাঝখানটা টাক পড়লেও পিছন দিকে ঘন কাঁচাপাকা বাবরি চুল। কপালে সমান্তরাল কয়েকটা ভাঁজ। চোখে কালো চওড়া ফ্রেমের চশমা। চশমার কাচ এতই পুরু যে, কয়েকটা সাদা রিঙের মতো দাগ চোখে পড়ছে।
ভদ্রলোকের পুরুষ্টু গোঁফ আর জুলপি দেখে মনে হয় এককালে মিলিটারিতে ছিলেন। মুখেও সেই ধাঁচের একটা রাশভারী ভাব। আর তীব্র চোখের নজর যেন তির বেঁধানো।
কামরায় উঠেই ভদ্রলোক একটা চুরুট ধরালেন। তারপর ব্রিফকেস খুলে একটা বই বের করে নিয়ে বেশ মনোযোগ দিয়ে পড়তে শুরু করলেন। বইটার নামটা অদ্ভুত বলেই আমার মনে আছে?
হেটেরোসাইক্লিক কেমিস্ট্রি।
আমি সুনন্দার নতুন সংখ্যাটা নিয়ে চোখ বোলাচ্ছিলাম। আজই নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশান থেকে ওটা কিনেছি। পত্রিকাটা কী ম্যাজিক জানে আমি বলতে পারব না। তবে লক্ষ করেছি, ম্যাগাজিনটা হাতে নিলে আমার আর ছাড়তে ইচ্ছে করে না।
ঘণ্টাখানেক পরেই কেবিনের অন্য দুজন যাত্রী নেমে গেল। ফলে কামরায় শুধু আমরা দুজন। আমার সহযাত্রী এইবার বোধহয় আমার সঙ্গে আলাপ জমাতে চাইলেন।
হাওড়া পর্যন্ত যাবেন বুঝি? ওঁর গলার স্বর বেশ ভারী। ঠোঁটের কোণে সামান্য একচিলতে হাসি।
এইভাবেই আলাপ শুরু।
কথায় কথায় আমার ম্যাগাজিনের কথা বললাম। ব্যাগ থেকে এককপি চারুলতা দেখিয়ে বললাম, আমি এই ম্যাগাজিনের সারকুলেশান ডিভিশনের চিফ।
ভদ্রলোক কৌতুকের হাসি হেসে বললেন, ম্যাগাজিনটা খুব একটা বিক্রি হচ্ছে না তো–।
আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। এই ভেতরের খবরটা উনি কী করে জানতে পারলেন?
ভদ্রলোক সবজান্তা হাসি হাসলেন চাপা গলায়। তারপর বললেন, না, না, অবাক হওয়ার কিছু নেই। আপনি চারুলতা-র লোক হয়ে সুনন্দা পড়ছেন, তাই বললাম চুরুটের ঘন ধোঁয়ায় নিজেকে ঝাপসা করে দিয়ে বললেন, তা ছাড়া ম্যাগাজিন লাইনে আমারও একটু-আধটু ইন্টারেস্ট আছে।
আমি আর কথা বাড়ালাম না। হাউসের সিক্রেট যাকে-তাকে বলা ঠিক নয়। তবে ভদ্রলোকের কথায় একটা ঠান্ডা অস্বস্তি আমার শিরদাঁড়ায় কাকড়াবিছের মতো হেঁটে বেড়াতে লাগল।
প্রশ্ন করে জানলাম, ভদ্রলোক পেশায় কনসালট্যান্ট। তবে ঠিক কীসের কনসালট্যান্ট তা উনি স্পষ্ট করে বললেন না। ওঁর কথায়, আচরণে, আর হাসিতে কোথায় যেন একটা রহস্য জড়িয়ে রইল। উনি আবার ওঁর কেমিস্ট্রি বইটায় মন দিলেন। আমিও সুনন্দা-র পাতার ফিরে গেলাম।
সুনন্দা-র পাতা ওলটাতে-ওলটাতে একটা গল্পে আমার চোখ আটকে গেল। আমি ভুল দেখছি না তো! গল্পের নামটা একটু রহস্যময়। কিন্তু তার প্রথম লাইন দুটো আমাকে পাথর করে দিল।
