জোয়ারদারকে বললাম, আমার আঙুলে ব্যথা আছে। এখন লিখতে আমার অসুবিধে আছে।
পায়চারি করতে করতে থমকে দাঁড়াল জোয়ারদার, হিসহিস করে হেসে উঠে বলল, আই গট য়ু, ম্যান। আমাকে চালাকিতে ফঁকি দেওয়া অত সহজ নয়। এখনও বলছি, মিস্টার মজুমদার, আপনি কনফেস করুন, তা হলে শুধু-শুধু আপনাকে আর টরচার করব না। নাউ, কাম অন–।
আপনি আমার কথা বুঝতে পারেননি, মিস্টার জোয়ারদার– আমি একরোখা গলায় জবাব দিলাম, আমি বলেছি, আজ এখন আমার লিখতে অসুবিধে আছে। আশা করি কাল-পরশুর মধ্যে আমার আঙুলের ব্যথা সেরে যাবে–তখন আপনি যা বলবেন তা-ই লিখে দেব–নো প্রবলেম।
জোয়ারদার গুম হয়ে গেল। একটু আগেই ওর চোখে-মুখে যে-হিংস্র উল্লাস ফুটে উঠেছিল তা স্তিমিত হয়ে গেল পলকে।
আমি জানি, আমার জিজ্ঞাসাবাদের প্রতিটি মুহূর্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিডিয়ো রেকর্ডিং করে নেওয়া হচ্ছে। হাতের লেখা মিলিয়ে দেখার বর্তমান আইন অনুসারে জোয়ারদার আমাকে এখনই লেখার জন্যে বাধ্য করতে পারে না। আমি লিখতে গররাজি হলে অন্য কথা। কিন্তু আমি শুধু দু একদিন সময় চেয়েছি।
আসলে দু-একদিন নয়, আড়ালে দশমিনিট সময় পেলেই আমার কাজ হয়ে যাবে। আমারই ভুল। চিঠিগুলোর কথা আমার মাথা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। অবশ্য বিকল্প পথ জানা আছে বলেই বোধহয় ব্যাপারটা আমি তেমন গুরুত্ব দিইনি।
আপনি তা হলে এখন লিখবেন না?
না–আমার আঙুলে ব্যথা।
কাল সন্ধেবেলা কি আপনার অসুবিধে হবে?
মোটেই না। কখন আসতে হবে বলুন।
রাত আটটার সময় বিশ্বাস আর বর্ধন আপনাকে নিয়ে আসবে। বাট ডোন্ট ট্রাই এনি মাঙ্কি ট্রিক। চালাকি ধরে ফেলা আমার হবি, মিস্টার মজুমদার।
আমি হাসলাম, বললাম, আপনি মিছিমিছি আমাকে সন্দেহ করছেন, জোয়ারদারবাবু। তা ছাড়া আমি জানি, চালাকি করে আপনার সঙ্গে পারব না।
জোয়ারদারের চোখ ছোট হল, চোয়ালের রেখা স্পষ্ট হল। বুঝতে পারলাম, আমার জোয়ারদারবাবু বলার ঢঙটা ওর পছন্দ হয়নি।
এরপর ঘরে ফেরার পালা।
বিশ্বাস আর বর্ধন যত্ন করে আমাকে বাড়ির সামনের রাস্তায় ছেড়ে দিল।
আমি আবার ফিরে গেলাম সুচরিতার কাছে।
আমার ফেরার শব্দ পেয়ে ও জেগে উঠল। আমাকে হাত ধরে টেনে নিতে চাইল বিছানায়। উ-উ-ম-ম করে আদুরে শব্দ করল আলতো গলায়।
আমি ওর পিঠে হাত বুলিয়ে বললাম, একমিনিট, সুইটি–একটু টয়লেট থেকে আসছি।
টয়লেটে গিয়ে অটোমেটিক কোলোন স্পেয়ারের সামনে দাঁড়ালাম। সুগন্ধী ঠান্ডা বাতাস আমাকে ভাসিয়ে দিল। আমি চোখ বুজে শ্রাবন্তীর কথা ভাবতে লাগলাম।
একমাত্র ওকেই আমি ভালোবাসার চিঠি লিখেছি–আর কাউকে না। আমার ভেতরের পাগলটা শুধু ওকেই ভালোবেসে ফেলেছিল। আর সবাই ছিল ওর কাছে একরাত বা কয়েক রাতের সঙ্গিনী। রাত ফুরোলেই সব ভালোবাসা শেষ। সুচরিতাও তাই। আর কাউকে আমি ভালোবাসার চিঠি লিখব না।
যদিও বা লিখি, শ্রাবন্তীকে লেখা চিঠির মতো হাতের লেখায় লিখব না। লিখব অন্য কোনও নতুন হাতের লেখায়।
কোলোন স্পেয়ার বন্ধ করে দেওয়ালে লুকোনো একটা ক্যাবিনেটের দরজা খুললাম। আমার সামনের তাকে এখন অনেকগুলো মেগা স্কেল ইন্টিগ্রেটেড মাইক্রোচিপ। মাথার চুলের ভেতরে হাত চালিয়ে ছোট্ট ধাতব প্লেটটা সরিয়ে দিলাম। মাথার ভেতরে আঙুল ঢুকিয়ে খুব সতর্কভাবে একটা চিপ বেস থেকে খুলে নিলাম। সেটা তাকে রেখে দিয়ে নতুন একটা চিপ তুলে নিলাম। তার নম্বরটা ঠিক আছে কিনা একবার দেখে নিয়ে সাবধানে সেটা বসিয়ে দিলাম মাথার ভেতরে। তারপর ধাতব ঢাকনা টেনে বন্ধ করে দিলাম।
ব্যস, আর কোনও চিন্তা নেই। আমার হাতের লেখা এবার বদলে যাবে।
আমাদের হাতের লেখার ধরন মস্তিষ্কের যে-অংশ নিয়ন্ত্রণ করে এই চিপটা অনেকটা যেন তারই বিকল্প। সতেরো বছর বয়েসে অপারেশানের সময় আমার মাথার ভেতরে একগাদা চিপ বসানো হয়েছিল। তার কয়েকবছর পর হার্ডওয়্যারে গবেষণা করার সময় এ ধরনের মাইক্রোচিপ আমি হঠাৎই আবিষ্কার করেছিলাম। আর তারই একটা দিয়ে বিশেষ ধরনের সার্কিট তৈরি করে বসিয়ে দিয়েছিলাম আমার মাথার ভেতরে।
বিভিন্ন হাতের লেখার ধরনের জন্যে সারকিট ডিজাইন করার বিভিন্ন চিপ পাওয়া যায়। সেই চিপটা পালটে নিলেই আমার হাতের লেখার ধরন পালটে যায়।
সুতরাং আর আমি জোয়ারদার অ্যান্ড কোম্পানিকে ভয় পাই না।
আমার সিরিয়ালের বারো নম্বর এপিসোডের জন্যে মনে-মনে তৈরি হয়ে আমি টয়লেট থেকে বেরিয়ে এলাম।
রাতের ট্রেনে দেখা হয়েছিল
আপনি সুনন্দা পত্রিকার নিয়মিত পাঠক। তাই আপনাকেই শোনাব এই বিচিত্র কাহিনি। তারপর আপনাকে একটা ব্যক্তিগত অনুরোধ করব? যদি পারেন আমাকে একটু সাহায্য করবেন, কারণ আপনিই পারেন আমাকে বাঁচাতে। শুধু আমি কেন, আপনার কাছ থেকে সামান্য একটু সাহায্য পেলে প্রায় দেড়শোটা পরিবার বেঁচে যাবে। ওদের সকলের সমস্যা মাথায় নিয়ে আমি ঘুরে বেড়াচ্ছি উদভ্রান্তের মতো। দূরপাল্লার ট্রেনগুলোয় এলোমেলোভাবে উঠে পড়ছি, নেমেও পড়ছি একইভাবে। যে-কোনও স্টেশন থেকে ট্রেন ধরছি, নেমে পড়ছি যে-কোনও স্টেশনে। ছন্নছাড়ার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছি। পাগলের মতো খুঁজে বেড়াচ্ছি একজনকে। রাতের ট্রেনেই তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল।
ঘটনাটা শুনলে আপনি বিশ্বাস করবেন কি না জানি না, তবে যা বলব তার একটি বর্ণও মিথ্যে নয়।
