রাতের ট্রেনে দেখা হয়েছিল
সোমদত্ত সেনচৌধুরী
আপনি সুনন্দা পত্রিকার নিয়মিত পাঠক। তাই আপনাকেই শোনাব এই বিচিত্র কাহিনি। তারপর আপনাকে একটা..
.
গল্পটা পড়তে-পড়তে আমি অন্য কোথাও হারিয়ে যাচ্ছিলাম। হুবহু আমার কথা লিখেছেন লেখক। আমাদের হাউসের গোপন খবর কেউ কি বেনামে গল্প লিখে ফাঁস করে দিচ্ছে? সোমদত্ত সেনচৌধুরী নামটা বেশ অদ্ভুত। চারটে পদবি দিয়ে তৈরি নাম। নিশ্চয়ই কারও ছদ্মনাম। কিন্তু এই ছদ্মনামের আড়ালে কে লুকিয়ে রয়েছে?
গল্পটায় ঘটনা হুবহু একইভাবে এগিয়েছে। অন্তত সহযাত্রী ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ হওয়া পর্যন্ত। তবে লেখকের পত্রিকার নাম চারুলতা নয়, কাজললতা। এ ছাড়া সবকিছুতেই আশ্চর্য মিল। এমনকী হেটোরোসাইক্লিক কেমিস্ট্রি পর্যন্ত।
আমি নিশি-পাওয়া মানুষের মতো গল্পটা পড়তে শুরু করলামঃ
.
…সুনন্দা-র পাতা ওলটাতে-ওলটাতে কী মনে হওয়ায় ব্যাগ থেকে কাজললতা-র নতুন সংখ্যাটা বের করলাম। সুনন্দায় এমন কী আছে যা আমার পত্রিকার নেই? এবারের ট্যুরে পরের মাস থেকে সারকুলেশান কতটা বাড়বে কে জানে! যে করে হোক, আগামী ছমাসের মধ্যে সারকুলেশান আমাকে বাড়াতেই হবে। তা না-হলে মালিকের কাছ থেকে হে বন্ধু বিদায়।
সারকুলেশান কিছুতেই বাড়াতে পারছেন না, তাই না? ভদ্রলোকের গম্ভীর গলা মোক্ষম প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল আমার দিকে।
আমি চমকে ওঁর মুখের দিকে তাকালাম।
মিলিটারি গোঁফের কোণে দুয়ে হাসি। হাতের চুরুট মাপে ছোট হয়ে এলেও তার ধোঁয়ার তেজ কমেনি।
ভদ্রলোক আমার হতভম্ব মুখের দিকে তাকিয়ে যেন বেশ মজা পেলেন। বারকয়েক মাথা নেড়ে বাবরি চুলে হাত চালিয়ে বললেন, ওপর-ওপর দেখলে মনে হবে সুনন্দা-য় যা-যা আছে সবই আপনার ম্যাগাজিনে আছে। নামি-দামি লেখক, সুন্দর-সুন্দর ছবি, দামি কাগজ, ভালো ছাপা বলতে গেলে তেমন কোনও তফাত নেই।
আমি চটপট বারতিনেক ঘাড় নাড়লাম। কনসালট্যান্ট ভদ্রলোক ঠিক আমার মনের কথাটি বলেছেন। কিন্তু কিছু বলতে গিয়ে টের পেলাম, আমার মুখের ভেতরে জিভটা যেন গিরগিটির খসখসে লেজ। একইসঙ্গে গলা শুকিয়ে কাঠ।
ভদ্রলোক তার হাতের বইটা ব্রিফকেসের ওপরে নামিয়ে রাখলেন। চুরুটে আয়েস করে ঘন ঘন দুটো টান দিলেন। হাত নেড়ে চোখের সামনে থেকে ধোঁয়া সরিয়ে বললেন, আপনার সঙ্গে নিছকই ট্রেনে আলাপ। এ-বিষয়ে বেশি কথা বলা ঠিক হবে কি না জানি না। তবে আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে খুব মানসিক চাপের মধ্যে আছেন…তাই বলছি…।
আমি দম বন্ধ করে অপেক্ষা করতে লাগলাম।
রাতের ট্রেন কোনও একটা স্টেশনকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। ট্রেনের খটাখট শব্দ হঠাৎ যেন কয়েক ধাপ বেড়ে গেল। বন্ধ কাচের জানলার ফাঁক দিয়ে শীতের ঠান্ডা বাতাস ঢুকছিল। কিন্তু আমি শীত গ্রাহ্য না করে ভদ্রলোকের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। ওঁর চশমার ডান কাচে কেবিনের একটা আলোর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু ওঁর বাঁ-চোখ লেন্সের ভেতর দিয়ে আমাকেই দেখছিল।
ভদ্রলোক সামান্য কেশে গলা পরিষ্কার করে নিয়ে বললেন, আপনি নিশ্চয়ই জানেন, সুনন্দা-র বিক্রি আড়াই লাখের বেশি। শুধুমাত্র ভালো লেখা, ছাপা, রংচং বা দামি কাগজ দিয়ে এই সারকুলেশানে পৌঁছোনো যায় না। এর জন্য একটা সিক্রেট আছে…।
কী সিক্রেট? আমি চাপা গলায় প্রশ্ন করার সঙ্গে-সঙ্গে ভদ্রলোকের দিকে খানিকটা ঝুঁকে পড়লাম।
ভদ্রলোক চুরুটটা অ্যাশট্রেতে গুঁজে দিয়ে সামান্য হাসলেন : সিক্রেটটা হল হিউম্যান কেমিষ্ট্রি। আমি জানি, আপনি এর নাম শোনেননি–শোনার কথাও নয়। কারণ ব্যাপারটা সতেরো শতকের অ্যালকেমির মতোই খুব গোপনে চর্চা করা হয়…।
হিউম্যান কেমিস্ট্রি। কেমিস্ট্রির এরকম কোনও শাখা আছে বলে কখনও শুনিনি। তা ছাড়া সেই ছোটবেলা থেকেই কেমিস্ত্রিকে ভয় পেয়ে বড় হয়েছি। প্রায় রোজই করুণাময় ঈশ্বরকে প্রাণপণে ডেকেছি, কবে কেমিষ্ট্রি আমার নগণ্য জীবন থেকে অদৃশ্য হবে। আর শেষকালে ম্যাগাজিনের রেকর্ড সারকুলেশানের সিক্রেট কিনা ইয়ে কেমিস্ট্রি!
বুঝতে পারছি, রসায়নশাস্ত্র ব্যাপারটার প্রতি আপনার খুব একটা শ্রদ্ধা-ভক্তি নেই। অ্যালকেমি সম্পর্কেও বেশিরভাগ মানুষের এইরকমই ধারণা ছিল। অ্যালকেমি শব্দটার বাংলা নাম দেওয়া হয়েছে অপরসায়ন। কিন্তু যারা জানেন তারা ঠিকই জানেন কোন-কোন ধাতু থেকে কীভাবে সোনা তৈরি করা যায়। সুতরাং, অ্যালকেমি একেবারে অলীক ব্যাপার নয়।
প্রসঙ্গ পালটে যাচ্ছে দেখে আমি অধৈর্য হয়ে ভদ্রলোককে খেই ধরিয়ে দিতে চাইলামঃ কিন্তু সারকুলেশানের সঙ্গে হিউম্যান কেমিস্ট্রির কী সম্পর্ক?
সম্পর্ক আছে খুব গভীর সম্পর্ক। অ্যালকেমির মতো হিউম্যান কেমিস্ট্রিও খুব গোপনে চর্চা করা হয়। সারা পৃথিবীতে এই বিষয় নিয়ে এখন গবেষণা করছে বড়জোর শ-দুয়েক বিজ্ঞানী। আমি এই লাইনে গবেষণা করছি প্রায় ৪০ বছর…।
আপনি যে বললেন, আপনি…ইয়ে…মানে, কনসালট্যান্ট?
ভদ্রলোক ভরাট গলায় নীচু পরদায় হাসলেন। বললেন, হ্যাঁ, ম্যাগাজিনের সারকুলেশান কনসালট্যান্ট–যদিও আসলে ব্যাপারটা পুরোপুরি হিউম্যান কেমিস্ট্রি।
আমি আর থাকতে না পেরে একটু খোঁচা দিয়েই বললাম, আপনার ওই হিউম্যান কেমিস্ট্রি দিয়ে সারকুলেশান বাড়ানো যায় নাকি?
