আপনিই অমিত মজুমদার? দুজনের একজন জানতে চাইল।
আমি শান্তভাবে ঘাড় নেড়ে জানালাম, হ্যাঁ।
আমরা হোমিসাইড স্কোয়াড থেকে আসছি লেজারে হলোগ্রাম করা একটা ছোট্ট কার্ড আমার চোখের সামনে তুলে ধরল প্রথমজন : এত রাতে আপনাকে ডিসটার্ব করার জন্যে দুঃখিত। আপনাকে একবার আমাদের সঙ্গে আসতে হবে।
কেন? কী ব্যাপার?
মার্ডার কেস। শ্রাবন্তী সেন নামে একটা ইয়াং মেয়ের লাশ আমরা কাল সকালে পেয়েছি। গঙ্গায় পাওয়া গেছে। গলা টিপে মার্ডার করে গঙ্গায় ফেলে দেওয়া হয়েছে। বডিটা জেটির নীচে আটকে গিয়েছিল, তাই ভেসে যায়নি।
আমি ভেতরে-ভেতরে নিজেকে সামলে নিলাম। বিব্রতভাবে বললাম, আসুন, ভেতরে এসে বসুন।
প্রথমজন ঠান্ডা গলায় জবাব দিল, বসার টাইম নেই। চলুন, হেডকোয়ার্টারে গিয়ে কথা হবে।
এক মিনিট। আমি চট করে রেডি হয়ে আসছি।
মেক ইট কুইক।
ওদের দরজায় দাঁড় করিয়ে রেখে আমি সুচরিতার কাছে চলে গেলাম। ওর খোলা পিঠে একটা চুমু খেয়ে পোশাক ঠিকঠাক করে নিলাম। মাথা আঁচড়ে গায়ে বিদেশি কোলোন স্প্রে করে নিলাম। তারপর আয়নায় নিজের চোখে তাকিয়ে চাপা গলায় বললাম, সাবধান, যেন কোনও ভুল না হয়। সিরিয়াল কিলারদের ভুল করলে চলে না।
একবার সুচরিতার দিকে তাকালাম। ও একইভাবে বিছানায় শুয়ে আছে। বোধহয় আমার কথাটা শুনতে পায়নি। অবশ্য পেলেও তার মানে বুঝতে পারবে না। যখন বুঝবে তখন আর কিছু করার থাকবে না–অনেক দেরি হয়ে যাবে।
সুচরিতাকে বললাম, লাভ, আমি ঘণ্টাদুয়েকের মধ্যেই আসছি। পুলিশ একটা মার্ডার কেসে ভুল করে আমাকে হ্যারাস করতে এসেছে। তুমি চিন্তা কোরো না নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ো।
সুচরিতা শরীরটাকে আধপাক ঘুরিয়ে অভিমানে ঠোঁট ফুলিয়ে আমার দিকে তাকাল।
–আমি এসে তোমার ঘুম ভাঙাব। ওর দিকে তাকিয়ে কথা শেষ করলাম আমি।
ফ্ল্যাটের বাইরে এসে দরজার পাশে দেওয়ালে বসানো অটোমেটিক ভয়েস লক সিস্টেমের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বললাম, ফ্ল্যাট লক করে দাও।
যন্ত্র তার সূক্ষ্ম বিচারে মালিকের কণ্ঠস্বর নিখুঁতভাবে চিনতে পারল। সঙ্গে-সঙ্গে ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। আমার গলায় খোলার নির্দেশ না পেলে এই দরজার লক আর খুলবে না।
ওরা দুজন পাথরের মূর্তির মতো অপেক্ষা করছিল। আমি চলুন বলতেই রোবট দুটো যেন সাড় ফিরে পেল। নিঃশব্দে দুজন আমার দুপাশে চলে এল। আমরা এলিভেটরের দিকে রওনা হলাম।
বাইরের রাস্তায় এসে গাড়িতে ওঠার সময় ওদের একজন আমাকে জিগ্যেস করল, মিস্টার মজুমদার, শ্রাবন্তী সেনকে আপনি চিনতেন?
আমি শ্রাবন্তীকে চিনতাম–বেশ অন্তরঙ্গভাবেই চিনতাম। তাই নির্লিপ্ত গলায় বললাম, না–।
সঙ্গে-সঙ্গে লোকটা তার পকেট থেকে একটা একশো টাকার নোট বের করে সঙ্গীর হাতে তুলে দিল, বলল, বর্ধন, তুমিই জিতলে–আমি হেরে গেলাম।
আমাকে অবাক হতে দেখে বর্ধন হেসে বলল, মিস্টার মজুমদার, আপনার এখানে আসার সময় বিশ্বাসকে আমি বলেছিলাম, শ্রাবন্তী সেনকে চেনার ব্যাপারটা আপনি ডিনাই করবেন। ও আমার কথা মানতে চায়নি, তাই আমার সঙ্গে একশো টাকা বাজি ধরেছিল– জিভে দুঃখের চুকচুক শব্দ করে আবার হাসল বর্ধন ও বিশ্বাস, বেকার তোমার একশোটা টাকা গেল।
গাড়ির পেছনের সিটে আমাকে মাঝখানে রেখে বর্ধন আর বিশ্বাস দুপাশে বসল। ওদের লুকোনো ব্লাস্টার গান আমার কোমরে খোঁচা দিচ্ছিল। ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দিয়ে এগোতেই বর্ধন চাপা গলায় বলল, মিস্টার মজুমদার, শ্রাবন্তীকে আপনি চিনতেন…আমাদের হাতে মারাত্মক প্রমাণ রয়েছে।
আমি অবাক হওয়ার ভান করে বর্ধনের দিকে তাকাতেই বাঁ-পাশ থেকে বিশ্বাস বলে উঠল, অমন ফুটফুটে সুন্দর মেয়েটাকে খুন করলেন কেন বলুন তো!
আমি অসহায়ভাবে বলে উঠলাম, আপনাদের কোথাও একটা ভুল হচ্ছে শ্রাবন্তীকে আমি চিনি না।
হেডকোয়ার্টারে গিয়ে দাওয়াই দিলেই সব বেরিয়ে পড়বে। দাঁতে দাঁত চেপে বর্ধন মন্তব্য করল।
আমি নিরুপায় হয়ে গাড়ির খোলা জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইলাম। ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটা আমার মুখে দক্ষ হাতে তুলির আঁচড় কাটছিল। আর আমার মনে পড়ছিল ফুটফুটে মেয়েগুলোর কথা।
গত চারমাসে কলকাতার নানা জায়গায় এগারোজন তরুণীর মৃতদেহ পাওয়া গেছে। ওদের প্রত্যেককেই গলা টিপে খুন করা হয়েছে। খুন করেছি আমি। না, আসলে ঠিক আমি না–আমার ভেতর থেকে একটা অচেনা খুন-পাগল লোক এই জঘন্য কাজগুলো করে। চারমাস আগে আমার মাথার ভেতরে ওই পাগলটা প্রথম জেগে ওঠে। খুন করে রত্নাকে। তারপর একে একে মাধুরী, সুজাতা, নয়না, সুন্দরী, প্রথমা, সাগরিকা…সব নাম আমার মনে নেই। সংখ্যাটা যে মনে আছে তার কারণ ইন্টারনেট নিউজে প্রায় প্রতিদিনই এ-নিয়ে খবর বেরোয়–তাতে বারবার করে ওরা সংখ্যাটা আমাকে জানিয়ে দেয়–পাছে আমি ভুলে যাই। ওরা আমার নাম দিয়েছে–মানে, আমার ভেতরের ওই পাগলটার নাম দিয়েছে সিরিয়াল কিলার ধারাবাহিক খুনি। একজন রসিক সাংবাদিক এমন মন্তব্যও করেছে, এই সিরিয়ালের সবে এগারোটা এপিসোড হয়েছে, কত এপিসোডে শেষ হবে কে জানে!
আমার হাসি পেল। কটা এপিসোডে এই সিরিয়াল যে শেষ হবে তা আমিও জানি না। জানে আমার মাথার ভেতরে ঘাপটি মেরে বসে থাকা ওই পাগলটা। তবে এটুকু বুঝতে পেরেছি, আজ কিংবা কাল রাতে সুচরিতাকে নিয়ে পাগলটার বারো নম্বর এপিসোড শেষ করার কথা।
