শ্রাবন্তীর কথা মনে পড়ল আমার। শ্রাবন্তীকে আমি যে ভালো করেই চিনতাম তার কী মারাত্মক প্রমাণ পেয়েছে ওরা? এর আগের খুনগুলোর বেলায় পুলিশ আমাকে কোনও সন্দেহ করেনি, কোনওদিন আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতেও আসেনি। কিন্তু এইবার যখন এসেছে তখন নিশ্চয়ই ওদের হাতে কোনও-না-কোনও সূত্র আছে। অর্থাৎ, কোথাও একটা ভুল করে ফেলেছি আমি। কিন্তু কী সেই ভুল?
লালবাজারে হোমিসাইড স্কোয়াডের হেডকোয়ার্টারে পৌঁছোতেই আমার ভাবনায় বাধা পড়ল। মনে-মনে নিজেকে তৈরি করে নিলাম। সতর্কতা বাড়িয়ে দিলাম দশ গুণ।
গাড়িতে অটোমেটিক প্রোগ্রাম করাই ছিল। তাই ড্রাইভার হাত গুটিয়ে বসে থাকলেও গাড়িটা হিসেবমতো নিখুঁত বাঁক নিয়ে একটা নির্দিষ্ট পার্কিং স্পেসে গিয়ে দাঁড়াল। গাড়ির ভয়েস রেসপন্স সিস্টেম বলে উঠলঃ আমরা গন্তব্যে এসে গেছি।
ড্রাইভার কী-একটা বোতাম টিপতেই হাইড্রলিক কন্ট্রোল নিঃশব্দে দুটো দরজা খুলে দিল। আমরা তিনজন নেমে পড়লাম।
এক অদ্ভুত অনুভূতি নিয়ে আমি চারপাশটা দেখতে লাগলাম।
লালবাজারের পুলিশ হেডকোয়ার্টারে আগে কখনও আমি আসিনি। এর সামনের রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালিয়ে বহুবার গেলেও ভেতরে এই প্রথম। কেন জানি না, আমার বুকের ভেতরে একটা অচেনা পেন্ডুলাম ঢং-ঢং করে বাজছিল।
পাথর বাঁধানো বিশাল পার্কিং স্পেসে প্রায় দেড়-দু-ডজন গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। জায়গায়। জায়গায় লাগানো হ্যালোজেন বাতি সুন্দর আলোর বৃত্ত তৈরি করেছে। বৃত্তের বাইরেটা আবছা অন্ধকার।
উঠোনের মাঝে একটা লাস্যময়ী নাচিয়ে ফোয়ারা। তার নাচের তালে-তালে লুকোনো বাজনা নীচু গ্রামে বাজছে। বাজনার সঙ্গে তাল রেখে চলছে লাল-নীল-হলদে-সবুজ আলোর খেলা।
উঠোনকে ঘিরে প্রায় বিশতলা উঁচু চারটে বিশাল বাড়ি। বাড়ির দেওয়ালগুলো যেন সানগ্লাসের কাচ দিয়ে তৈরি। বাড়ি লক্ষ করে অনেকগুলো হ্যালোজেন ফোকাস লাগানো রয়েছে। বাড়ির কাচের দেওয়াল সেই আলো আয়নার মতো ঠিকরে দিচ্ছে।
এই সুন্দর-সুন্দর বাড়ির ভেতরেই চলে অপরাধীকে শায়েস্তা করার নোংরা কাজ।
রাত বেড়েছে, তাই লোকজন কম চোখে পড়ল। আমি বর্ধনের দিকে তাকাতেই সে বলল, আমাদের সঙ্গে আসুন।
বিশ্বাস ওর বাঁ কানের সোনার রিংটা নাড়াচড়া করছিল, আমার চোখে চোখ পড়তেই বাঁকা হাসল।
আমরা তিনজনে দ্বিতীয় বাড়িটার দিকে এগোলাম। শানবাঁধানো চাতালে আমাদের জুতোর শব্দ ফোয়ারার বাজনার সঙ্গে মিশে গেল।
বাড়ির ভেতরে ঢুকে দুটো ভয়েস লক দরজা পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম অটোমেটিক এলিভেটরের কাছে। এলিভেটর আমাদের নিয়ে গেল এগারোতলায়। সেখানে আধুনিক ছাঁদে তৈরি গোলকধাঁধার মতো গোটাপাঁচেক অলিন্দ পেরিয়ে পৌঁছোলাম একটা ঘরে। ঘরের দরজায় লাগানো লাল রঙের ইলেকট্রনিক ডিসপ্লে জানিয়ে দিচ্ছে ঘরটার নাম : ইন্টারোগেশান রুম।
ঘরের চারদিকে অসংখ্য অচেনা যন্ত্রপাতি। তার মাঝে ন্যাড়া মাথা, পরনে কালো চামড়ার জ্যাকেট, কুতকুতে চোখ, আর ফরসা চেহারার যে-মানুষটি বসে আছে, তাকেও প্রথমটায় যন্ত্র বলে ভুল হল আমার।
আসুন, মিস্টার মজুমদার…বেশিক্ষণ আপনাকে আটকে রাখব না। শঙ্খচূড় সাপ যদি কথা বলতে পারত তা হলে সে বোধহয় এইভাবেই কথা বলত। কথাটা বলে যন্ত্রের চেহারার মানুষটি হাসল। হাসি মানে তার ঠোঁটের রেখা সামান্য চওড়া হল, দু-একটা ভাঁজ পড়ল ঠোঁটের কোণে।
বিশ্বাস আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে চাপা গলায় বলল, এখন আপনি জোয়ারদারসাহেবের প্রপার্টি। এ-ঘরে ঢোকার আগে আর পরে মানুষ একরকম থাকে না। আমরা দুজন স্রেফ সাক্ষীগোপাল হয়ে ওঁর গান অনুযায়ী তাল দেব।
ঘরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা উষ্ণতাকে বোধহয় দশ-বারো ডিগ্রির কাছাকাছি পৌঁছে দিয়ে থাকবে, কারণ আমার বেশ শীত করছিল।
জোয়ারদার তীক্ষ্ণ চোখে আমাকে জরিপ করতে করতে বলল, বসুন।
একটা আধুনিক টেবিলকে মাঝখানে রেখে আমি জোয়ারদারের মুখোমুখি বসলাম। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় দিয়ে টের পেলাম, বিশ্বাস আর বর্ধন আমার ঠিক পেছনে অ্যাটেনশান হয়ে দাঁড়িয়ে।
জোয়ারদার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। টেবিলের ডানদিক ঘেঁষে রাখা একটা কম্পিউটারের কয়েকটা বোতাম টিপল। চোখ সরু করে মনিটরে কী দেখল কে জানে! তারপর সাপের মতো কেবল লাগানো একটা মাউথপিসের মতো যন্ত্র কম্পিউটারের পাশ থেকে তুলে নিয়ে বলল, বর্ধন, ওঁকে স্ক্যান করো।
বর্ধন চট করে চলে গেল জোয়ারদারের পাশে। ওর হাত থেকে মাউথপিসটা নিয়ে আমার কাছে এল। তারপর আমার বাঁ-হাতের কবজির ওপর যন্ত্রটা না ছুঁইয়ে বুলিয়ে নিল। জোয়ারদার তখনও ঠান্ডা চোখে কম্পিউটারের পরদার দিকে তাকিয়ে।
এখনকার রেওয়াজ অনুযায়ী প্রত্যেক মানুষের বাঁ-হাতের কবজিতে একটা করে পারসোনাল ইনফরমেশান মাইক্রোচিপ বসানো থাকে। সেটা বাইরে থেকে দেখা যায় না। তবে স্ক্যানার দিয়ে স্ক্যান করলে তার যাবতীয় তথ্য কম্পিউটারের পরদায় ফুটে ওঠে। আমারও উঠল।
জোয়ারদার যেন একটু অবাক হয়েই জিগ্যেস করল, মিস্টার মজুমদার, কিড স্ট্রিট ব্রাঞ্চের স্পার্ম ব্যাঙ্কে সেভেন্টি এইটে আপনার জন্ম?
আমার জন্মতারিখ ২২ জানুয়ারি ২০৭৮ সাল। আর স্পার্ম ব্যাঙ্কে, মানে, ল্যাবরেটরিতে জন্ম হওয়াটা প্রায় ষাট বছর হল স্বাভাবিক হয়ে গেছে। সুতরাং জোয়ারদারের প্রশ্নের মানে বুঝতে পারলাম না। তবুও শান্তভাবে জবাব দিলাম, হ্যাঁ।
