কোনটা?
আপনার এই মালিক বন্ধু অনিমেষ সরকারকে হঠাৎ করে জন্ম দেওয়া। আগে তো কখনও আপনি অনিমেষ সরকারের কথা ছেলেমেয়েকে বলেননি! তা হলে হঠাৎ করে এই ক্ষমতাবান বন্ধু এল কোত্থেকে!
আসলে, মিস্টার সেন–আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই কম-বেশি দুটো করে ব্যক্তিত্ব আছে। একটা নরম, আর-একটা কঠিন। একজনের কাজ ভালোবাসা, অন্যজনের কাজ শাসন করা। যদিও ব্যাপারটা অ্যাবসোলিউটলি আপনাদের ফ্যামিলির ব্যাপার–তবুও বলছি, আপনার একটা পারসোনালিটি বহুদিন ধরে ঘুমিয়ে ছিল। অনিমেষ সরকার। আপনি জিতেন্দ্রনাথ আর অনিমেষ–দুজনকেই সজাগ রাখুন। তবে দুজনের মধ্যে ব্যালান্সটা আপনাকেই মেইনটেইন করতে হবে। বেশি ভালোবাসাও যেমন ঠিক নয়, বেশি শাসনও তাই। যদি আপনি এবার থেকে এটা মেইনটেইন করতে পারেন তা হলে সবার ভালো হবে। আর সীমন্তিনীদেবীও খুশি হবেন।
সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল ইন্দ্রজিৎ। সকলের দিকে একবার দেখে নিয়ে নীচু গলায় বলল, বয়েসে ছোট হলেও অনেক অপ্রিয় কথা বললাম–হোপ ইউ উডন্ট মাইন্ড। আমাদের কাজ শেষ আমরা এবার যাই।
একমিনিট, মিস্টার চৌধুরী। উঠে দাঁড়ালেন জিতেন্দ্রনাথ। তারপর পরানকে বললেন, পরান, আমার চেকবইটা নিয়ে আয় তো।
পরান তাড়াতাড়ি চলে গেল জিতেন্দ্রনাথের ঘরের দিকে।
জিতেন্দ্রনাথ ইন্দ্রজিতের কাছে এসে আন্তরিক গলায় বললেন, আপনার কথায় আমি কিছুই মনে করিনি। বরং আপনার কথাগুলো মনে রাখার চেষ্টা করব। আসলে মেন্টাল টরচারে-টরচারে আমি দিশেহারা হয়ে মরিয়া হয়ে উঠেছিলাম। তারপর, ঝোঁকের মাথায় এসব করে ফেলেছি…।
চেকবই এসে গিয়েছিল। জিতেন্দ্রনাথ পেন দিয়ে খসখস করে একটা পঞ্চাশ হাজার টাকার চেক লিখে দিলেন। নামের জায়গায় এসে থমকালেন তিনি, কী নামে হবে চেকটা?
প্রাইভেট আই ডট কম।
কত টাকার চেক দিলে, বাবা? নবনীতা জিগ্যেস করল।
জিতেন্দ্রনাথ ওর দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বললেন, দ্যাট ইজ নান অফ ইওর ব্লাডি বিজনেস, লেডি।
ইন্দ্রজিৎ বুঝল জিতেন্দ্রনাথ তাঁর নতুন ভূমিকা এখন থেকেই শুরু করে দিয়েছেন। ওরা তিনজনে বেরিয়ে এল সেন কটেজ থেকে।
মারুতি ভ্যানে ওঠার পর দশরথ বলল, স্যার, কাল সকালে এই চেকটা শার্লক হোমসের ছবিতে ঠেকিয়ে তারপর ব্যাঙ্কে জমা দেবেন।
ইন্দ্রজিৎ হাসল। গাড়ি স্টার্ট দিল।
জিনি বলল, আজকেও ডিনার সেরে গেলে কেমন হয়?
আমি, স্যার, ঠিক এই রিকোয়েস্টটাই করব ভাবছিলাম। কিন্তু সংকোচ আর লজ্জা এসে আমার কণ্ঠরোধ করেছিল। যদিও আমার হাঙ্গার স্ট্রাইকের অভ্যেস আছে, তবু…।
মারুতি ভ্যানের মিউজিক সিস্টেম অন করে দিল ইন্দ্রজিৎ। সুরের ঝংকারে দশরথের শেষ কথাগুলো আর শোনা গেল না।
রাত ফুরোল, কথা ফুরোল
কোনও মেয়েকে একান্তে চুমু খেতে যাওয়ার মুহূর্তে যদি দরজায় কলিংবেল বেজে ওঠে তা হলে কে না বিরক্ত হয়!
সুতরাং আমিও বিরক্ত হলাম।
সুচরিতার প্রস্ফুটিত ঠোঁট আমার চোখের সামনে ক্লোজ আপে ভাসছিল। ঝিম ধরিয়ে দেওয়া কেমন একটা গন্ধ ওর শরীর থেকে বিকিরিত হয়ে আমাকে দুর্বল করে দিচ্ছিল। কিন্তু কলিংবেলের শব্দে আমার চোয়াল শক্ত হতেই সুচরিতা সেটা টের পেল। আলতো গলায় ও বলে উঠল, এই ফ্ল্যাটে নয়–ওদিকের ফ্ল্যাটে কেউ বেল বাজাচ্ছে।
ওর অবস্থা আমি বুঝতে পারছিলাম..ঠিক আমার মতোই।
কলিংবেল অধৈর্য সুরে আবার বেজে উঠল। কোনও ভুল নেই আমার ফ্ল্যাটেই।
এরপর আর বিছানায় শুয়ে থাকা যায় না। সুতরাং বিরক্তির একটা শব্দ করে উঠে পড়লাম। ছোট্ট করে তীক্ষ্ণ শিস দিতেই অটোমেটিক অডিয়ো কন্ট্রোল ঘরের আবছা আলো ধীরে-ধীরে জোরালো করে দিল। ধবধবে সাদা বিছানায় সাপের মতো এঁকেবেঁকে শুয়ে থাকা ধবধবে ফরসা সুচরিতাকে একপলক দেখলাম। তারপর মনে-মনে নিজের পছন্দের তারিফ করলাম।
আমি বাইরের ঘরের দিকে রওনা হতেই সুচরিতা অস্পষ্ট গলায় পিছন থেকে বলল, ম্যানেজ করে জলদি চলে এসো।
আমি হাতঘড়ির বোতাম টিপতেই টকিং ওয়াচ মিষ্টি মেয়েলি গলায় বলে উঠল, এখন রাত দশটা বেজে আটাশ মিনিট বারো সেকেন্ড।
এত রাতে কে এল আমাকে ডাকতে!
একথা ভাবতে-ভাবতে ফ্ল্যাটের দরজার কাছে এসে দাঁড়ালাম। পাশের স্ট্যান্ড থেকে রিমোট কন্ট্রোল ইউনিটটা তুলে নিয়ে দরজা লক্ষ করে একটা বিশেষ বোতাম টিপলাম। সঙ্গে-সঙ্গে দরজার একটা অংশ চৌকো জানলার মতো স্বচ্ছ হয়ে গেল। এর মধ্যে দিয়ে ভেতর থেকে বাইরেটা দেখা যায়, কিন্তু বাইরে থেকে ভেতরটা দেখা যায় না।
বাইরে দাঁড়ানো দুজন লোককে আমি দেখতে পেলাম। আর সঙ্গে-সঙ্গেই বুঝতে পারলাম, এদের ম্যানেজ করে জলদি সুচরিতার কাছে ফিরে যাওয়া যাবে না। জানলাটাকে আবার অস্বচ্ছ করে দিলাম।
লোক দুজন বোধহয় হোমিসাইড স্কোয়াডের সাদা পোশাকের অপারেটর। ওদের পোড় খাওয়া চেহারা, ঠান্ডা চোখ অন্তত সে কথাই বলছে। ওরা কি তা হলে শ্রাবন্তীকে খুঁজে পেয়েছে? কিন্তু তার সঙ্গে আমাকে জড়াল কেমন করে। সেরকম কোনও চিহ্ন তো আমি ফেলে আসিনি!
রিমোট কন্ট্রোল ইউনিটের অন্য একটা বোতাম টিপতেই বন্ধ দরজা নিঃশব্দে পাশে সরে গেল। আমি এবার ওদের মুখোমুখি।
ওদের সাজপোশাক প্রায় একই ধাঁচের–চেহারাও অনেকটা তাই।
চাপা জিনসের প্যান্ট, ঢোলা সুতির জামা, চোখে কালো সানগ্লাস। মাথার চুল ছোট করে ছাঁটা, কপালে ভাঁজ, চোয়ালের হাড় উঁচু। একজনের বাঁকানের লতিতে একটা সোনার রিং চকচক করছে।
