রহস্যটা খতিয়ে দেখতে মাত্র তিনদিন সময় নিয়েছে ইন্দ্রজিৎ। জিনির টাইপ করে দেওয়া তথ্য, নিজের স্মৃতি আর বুদ্ধিকে বারবার ব্যবহার করে একটা অনুমানে পৌঁছেছে। তারপর অনিমেষ সরকারের লিখে দেওয়া ঠিকানা আর ফোন নম্বর ওকে একটা প্রায়-সিদ্ধান্তের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।
সুতরাং, পুরোপুরি তৈরি হওয়ার পর ও মহেন্দ্র সেনকে ফোন করেছে। জানিয়েছে, আজ সন্ধ্যায় চায়ের আসরে ও সব রহস্যের জট খুলবে। চেষ্টা করবে, কিডন্যাল্ড হয়ে যাওয়া জিতেন্দ্রনাথকে ফিরিয়ে আনতে।
..কিডন্যাপাররা টাকা চাইতে দেরি করায় আমার প্রথম খটকা লেগেছিল। তা হলে কি কিডন্যাপিংটা যে বা যারা করিয়েছে তারা খুবই বড়লোক? তাদের টাকার দরকার নেই? একে একে মহেন্দ্র, সুরেন্দ্র এবং নবনীতাকে দেখে নিল ইন্দ্রজিৎ : সাধারণত কিডন্যাপিং-এর কেসে যেটা হয়, পণবন্দিদের লুকিয়ে রাখাটা ভীষণ রিসকি বলে কিডন্যাপাররা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব টাকা নিয়ে তাদের ছেড়ে দিতে চেষ্টা করে। কিন্তু এক্ষেত্রে ব্যাপারটায় তাড়াহুড়োর বদলে কেমন যেন ডিলি ড্যালি গা-ছাড়া ভাব লক্ষ করা যাচ্ছিল।
সেদিন আপনাদের সবার সঙ্গে কথা বলে আমার মনে হল, কিডন্যাপিং-এর মতো দুঃসাহসিক কাজ করার সাহস আপনাদের কারও নেই। আশা করি আমার এই মন্তব্যকে আপনারা প্রশংসা হিসেবে নেবেন। যাই হোক, বাকি আলোচনায় যাওয়ার আগে আমি অনিমেষবাবুকে কয়েকটা কথা বলতে চাই–আর সেইসঙ্গে আপনাদের সবাইকে জানাতে চাই, জিতেন্দ্রনাথকে কে কিডন্যাপ করেছে।
সবাই উশখুশ করতে লাগলেন। এ-ওর দিকে অস্বস্তির চোখে দেখতে লাগলেন।
অনিমেষ বললেন, বলুন, কী বলতে চান।
হাসল ইন্দ্রজিৎ অপরাধীকে ধরে ফেলার হাসি ও দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি জিতেন্দ্রনাথকে আপনিই কিডন্যাপ করেছেন।
সবাই অবাক চোখে তাকালেন অনিমেষ সরকারের দিকে। ঘরে আলোচনা আর গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। দশরথ মুখের একটা অদ্ভুত ভঙ্গি করে চোখে বুজে মাথা নাড়তে লাগল।
এক মিনিট! সবাইকে কথা থামাতে ইশারা করল ইন্দ্রজিৎ : আর-একটা কথা অনিমেষবাবুকে আমার বলার আছে। জিতেন্দ্রনাথ সেনের সঙ্গে আপনার সারা জীবনেও আর দেখা হবে না। আপনি যদি একশো বছরও এ-বাড়িতে অপেক্ষা করেন, তা হলেও তার দেখা পাবেন না।
কেন, জিতেন কি আর বেঁচে নেই? অনিমেষ অবাক হয়ে জানতে চাইলেন।
সে তো আমার চেয়ে আপনি ভালো জানেন। চোখ মটকে বাঁকা হাসল ইন্দ্রজিৎ।
বাবা…বাবাকে কি মেরে ফেলা হয়েছে? মিহি গলায় প্রশ্ন করলেন সুরেন্দ্র।
বাবা কি এ-বাড়িতে আর কখনও আসবেন না? মহেন্দ্র।
কীসব কোড ল্যাঙ্গুয়েজে কথা বলছেন। স্টপ বিটিং অ্যারাউন্ড দ্য বুশ। নবনীতা।
হাত তুলে সবাইকে ধৈর্য ধরতে বলল ইন্দ্রজিৎ। তারপর ও অনিমেষ সরকার যতদিন এ বাড়িতে আছেন ততদিন জিতেন্দ্রনাথের এ-বাড়িতে আসা সম্ভব নয়। ওঁরা দুজন হরিহর-আত্মা হলেও ওঁদের দুজনকে একসঙ্গে পাওয়া ইমপসিবল।
কেন? অনিমেষ প্রশ্ন করলেন।
কারণ, আপনারা দুজনে একই লোক। হরিহর-আত্মা নন–একই আত্মা।
পলকে সবাই চুপ করে গেলেন। নিস্তব্ধতা পুরু মোলায়েম চাদরের মতো বিছিয়ে গেল সারাটা ঘরে।
অনেক-অনেকক্ষণ পর জিতেন্দ্রনাথের গলায় কথা বললেন অনিমেষ, থ্যাংক য়ু, মিস্টার চৌধুরী। এবং পরচুলা, চাপদাড়ি ও চশমা খুলে ফেললেন। নাকের ডগা থেকে টেনে খুলে নিলেন একদলা প্লাস্টিসিন।
বাবা! মহেন্দ্র, সুরেন্দ্র এবং নবনীতা।
পরান ছুটে গিয়ে জিতেন্দ্রনাথের পা জড়িয়ে ধরল। কান্না-ভাঙা গলায় ডুকরে উঠল, বড়বাবু! আপনি বড়বাবু!
জিতেন্দ্রনাথ ওর মাথায় হাত বুলিয়ে ওকে দাঁড় করিয়ে দিলেন, বললেন, হ্যাঁ রে, আমি। আর কোনও চিন্তা নেই।
এবার ইন্দ্রজিতের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, আপনি খুব প্রমিসিং ডিটেকটিভ, মিস্টার চৌধুরী। এখন বলুন তো, আমাকে আপনি কী করে সন্দেহ করলেন?
ইন্দ্রজিৎ মাথার ঝাঁকড়া চুলে একবার হাত বুলিয়ে নিল। তারপর ও প্রথম সন্দেহ হল, আপনি জিতেন্দ্রনাথের লেখা বহু চিঠির কথা বলেছেন, একটা চিঠি আমাকে দেখিয়েছেনও–কিন্তু আপনার লেখা কোনও চিঠির কথা বলেননি। বাড়িতে আপনার লেখা কোনও চিঠি পায়নি কেউ। সবসময়েই অনিমেষ সরকার ফোন করে কথা বলতেন।
দ্বিতীয়ঃ আপনার লাঠিটা নতুন। আর আপনার সামান্য খুঁড়িয়ে হাঁটাটা মাঝে-মাঝে ঠিকঠাক স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছিল।
তৃতীয়ঃ আমি যখন সন্দেহ থেকেই আপনাকে অ্যাড্রেস আর ফোন নাম্বার লিখে দিতে বলছিলাম, আপনি কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না।
চার নম্বরঃ আপনার রুমাল। আমি আর আপনি যখন সেদিন ও-ঘরে বসে– ইশারা করে ঘরটার দিকে দেখাল ইন্দ্রজিৎ? কথা বলছিলাম তখন আপনি রুমাল বের করে চোখ মোছার ভান করছিলেন। সেইসময়ে পরান চায়ের কাপ-প্লেট নিতে ঘরে ঢুকেছিল। আপনার হাতের রুমালটা দেখে ও চমকে উঠেছিল। আমি পরে ওর সঙ্গে কথা বলেছি। ওটা জিতেন্দ্রনাথের রুমাল। সে রুমাল আপনার পকেটে গেল কেমন করে?
অবশ্য তখন আমি আপনাকে কিডন্যাপিং-এর নাটের গুরু বলে সন্দেহ করেছিলাম। পুরোপুরি জিতেন্দ্রনাথ বলে ভাবিনি।
সেটা ভাবলেন কখন?
ওই রক্তের রিপোর্টটা পাওয়ার পর। তখন বুঝলাম, পয়সা থাকলে একটা নকল কিডন্যাপিং এর ব্যবস্থা করা কোনও কঠিন ব্যাপার নয়। তা ছাড়া টাকা আদায়ের ব্যাপারে কিডন্যাপারদের যেন কোনও মাথাব্যথাই ছিল না। এ ছাড়া আর-একটা ব্যাপার সবচেয়ে উদ্ভট ছিল…।
