জিতেন্দ্রনাথকে নিয়ে স্মৃতিচারণ শুরু করলেন অনিমেষ। স্কুলের গল্প, কলেজের গল্প, একসঙ্গে বেড়ানোর গল্প, বিয়ের গল্প, ব্যবসার গল্প…গল্পের আর শেষ নেই।
ইন্দ্রজিৎ মোটেই বিরক্ত হচ্ছিল না, বরং গভীর মনোযোগে শুনছিল। অনিমেষের কয়েকটা গল্প এমনই যে, খুব অন্তরঙ্গ বন্ধু ছাড়া জানা সম্ভব নয়।
কথার মাঝে পরান ঘরে এসে ঢুকল। অনিমেষের চায়ের কাপ-প্লেট তুলে নিয়ে ও চলে যাচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎই ওর চোখ পড়ল ইন্দ্রজিতের দিকে।
পরান যেন সামান্য অবাক হল। কিন্তু কিছু বলল না। আপনমনেই কীসব বিড়বিড় করতে করতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
ইন্দ্রজিৎ অনিমেষ সরকারকে দেখছিল আর ভাবছিল কিডন্যাপিং-এর পিছনে এ-বাড়ির কেউ নেই তো! মহেন্দ্র, সুরেন্দ্র, নবনীতা–ওঁরা কি স্রেফ টাকার লোভে জিতেন্দ্রনাথকে কিডন্যাপ করতে পারেন? আর অনিমেষ সরকার? উনি কি কিডন্যাপ করতে পারেন জিতেন্দ্রনাথকে? কিন্তু সে নিশ্চয়ই টাকার লোভে নয়। অন্য আর কী কারণ থাকতে পারে?
কুয়াশা দিয়ে তৈরি একটা ছবি ইন্দ্রজিতের চোখের সামনে ভেসে বেড়াচ্ছিল। ছবিটা স্পষ্ট হতে গিয়েও বারবার অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছিল।
অনিমেষ সরকারের গল্প শেষ হলে ইন্দ্রজিৎ বলল, একটা কাগজে আপনার অ্যাড্রেস আর সেলফোন নাম্বারটা একটু লিখে দেবেন?
কেন বলুন তো! এ-বাড়ির ফোন নাম্বার তো আপনি জানেন!
না, আপনার সঙ্গে আলাদা কথা বলার দরকার হতে পারে।
ঠিক আছে, লিখে নিন।
আমার পেনের রিফিল শেষ হয়ে গেছে। মিথ্যে কথা বলল ইন্দ্রজিৎ।
তখন নিমরাজি হয়ে বিছানা ছেড়ে উঠলেন অনিমেষ। হাতে ধরা রুমালটা পকেটে রেখে পা টেনে-টেনে কোণের টেবিলটার কাছে গেলেন। ড্রয়ার থেকে পেন বের করে একটা ছোট প্যাডের কাগজে খসখস করে ঠিকানা আর ফোন নম্বর লিখলেন। তারপর পৃষ্ঠাটা ছিঁড়ে নিয়ে ইন্দ্রজিৎকে দিলেন।
কী মনে হচ্ছে, মিস্টার চৌধুরী? এই কেসটা আপনি সলভ করতে পারবেন?
ইন্দ্রজিৎ হাসল ও সভ তো করতেই হবে! এটা আমার প্রথম কেস।
উইশ ইউ বেস্ট অফ লাক। হাসলেন অনিমেষ।
ইন্দ্রজিৎ বেরিয়ে এল ঘর থেকে। আপাতত ওর কাজ শেষ। তবে মারুতি ভ্যানে ওঠার আগে পরানের সঙ্গে একবার কথা বলে নিতে ও ভুলল না।
ফেরার পথে স্টিয়ারিং-এ বসে ইন্দ্রজিৎ অনেক কথা বলল। দশরথ নানান প্রশ্ন করল ওকে। প্রশ্নের ঢংগুলো এমন যে, সে যেন কোনও অপরাধীকে থানায় ডেকে জেরা করছে।
ইন্দ্রজিৎ হাসিমুখে দশরথের সব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিল, আর জিনিকে বলল কথাবার্তাগুলো যতটা সম্ভব টুকে নিতে।
কাল অফিসে এগুলো ওয়ার্ড প্রসেস করে আমাকে একটা ড্রাফট প্রিন্ট-আউট দিয়ো।
জিনি বলল, ও.কে., স্যার।
উল্টোডাঙ্গা-ভি. আই. পি.-র মোড়ে গাড়ি আসতেই ইন্দ্রজিৎ ঘড়ি দেখল। রাত প্রায় নটা। খিদেয় পেট চুঁইছুঁই করছে। জিনি আর দশরথদারও বোধহয় একই অবস্থা। তাই ও বলল, এসো, এখানে কোনও একটা রেস্তোরাঁয় আমরা ডিনার সেরে নিই। জিনি, তুমি বাড়িতে একটা ফোন করে দাও। আমি তোমাকে বাড়িতে ড্রপ করে দেব।
রাস্তার পাশ ঘেঁষে গাড়ি পার্ক করল ইন্দ্রজিৎ। ওরা গাড়ি থেকে নামল।
জিনি বলল, আমি চট করে একটা ফোন করে আসছি।
ও চলে যেতেই নিজের পেটে হাত বোলাল ইন্দ্রজিৎ ও দশরথদা, পেটে একেবারে ছুঁচোয় ডন মারছে। তোমারও নিশ্চয়ই একই অবস্থা?
দশরথ একগাল হেসে বলল, না, স্যার। পুলিশে চাকরি করার সময় ইউনিয়ন করতাম। তখন হাঙ্গার স্ট্রাইক করে করে খিদে সহ্য করার অভ্যেস হয়ে গেছে।
ইন্দ্রজিৎ হো-হো করে হেসে ফেলল।
.
প্রথমেই সবাইকে জানাই বিছানায় চাদরে যে-রক্তের দাগ পাওয়া গেছে সেটা মানুষের রক্ত নয়…মুরগির রক্ত।
ইন্দ্রজিতের কথা শেষ হতে-না-হতেই দশরথ চাপা গলায় বলল, মোরগেরও হতে পারে।
সে-কথা ইন্দ্রজিতের কানে গেল বলে মনে হল না। ও তখন কৌতূহল নিয়ে বসে থাকা মানুষগুলোর মুখের দিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে।
ওঁরা সকলেই চমকে উঠলেন।
অনিমেষ সরকার, মহেন্দ্র, সুরেন্দ্র, নবনীতা–আর পরান।
প্রথম চারজন সোফায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসেছিলেন। আর পরান একপাশে সংকুচিতভাবে দাঁড়িয়ে।
কী বলছেন, মিস্টার চৌধুরী! অবিশ্বাসের সুরে বলে উঠলেন অনিমেষ সরকার, মানুষের রক্ত নয়! মুরগির রক্ত।
মোরগেরও হতে পারে। আপনমনেই বিড়বিড় করে আবার বলল দশরথ।
হ্যাঁ মুরগির রক্ত।
দশরথ আবার বিড়বিড় করল। কী বলল ঠিক বোঝা গেল না, তবে অনুমান করা গেল।
তা হলে বাবার কোনও বিপদ হয়নি! এবারে সুরেন্দ্র কথা বললেন।
ইন্দ্রজিৎ সুরেন্দ্রর কথাটা যেন শুনতে পেল না। সোফায় হেলান দিয়ে আরাম করে বসে চোখ বুজে বলল, এই ইনফরমেশানটা ল্যাব থেকে পাওয়ার পরই আমি অন্য অ্যাঙ্গল থেকে ব্যাপারটা অ্যানালিসিস করতে শুরু করলাম…।
হঠাৎই চোখ খুলে হাসল ইন্দ্রজিৎঃ আর তখনই সব কেমন ঠিকঠাক খাপে খাপে মিলে গেল। এবং কিডন্যাপিং রহস্যের উত্তরটা ভেসে উঠল আমার চেখের সামনে।
সেন কটেজ-এর ড্রইং-ডাইনিং স্পেসে বসে কথা হচ্ছিল। ঘড়ির কাঁটা প্রায় সাতটার ঘরে পৌঁছে গেছে। বিচিত্র ঢঙের সুন্দর-সুন্দর সব বাতি ঘরটাকে প্রায় দেওয়ালির রাত করে তুলেছে। কিন্তু এখন আবহাওয়া খানিকটা থমথমে। সবাই কেমন যেন গম্ভীর। এমনকী নবনীতাও। আজ, এই মুহূর্তে, যেন গৃহকর্তার অভাবটা টের পাওয়া যাচ্ছে।
