জিনি নোট-প্যাড আর পেনসিল নিয়ে তৈরি হল।
ইন্দ্রজিৎ সংক্ষেপে গড়গড় করে কিছু তথ্য আর কিছু মন্তব্য বলে গেল। জিনি পেশাদারি ঢঙে সেগুলো শর্টহ্যান্ডে লিখে নিল।
দশরথ কান খাড়া করে ইন্দ্রজিতের কথাগুলো শুনতে লাগল, আর মাঝে-মাঝে বিজ্ঞের মতো মাথা নাড়তে লাগল।
ডিকটেশন দেওয়া শেষ হতেই ইন্দ্রজিৎ অনিমেষ সরকারের ঘরের দিকে পা বাড়াল।
মার্বেল পাথরের মেঝেতে আলোর কুচির নকশা ছড়িয়ে ছিল। তার উৎস খুঁজতে মুখ তুলে ওপরে তাকাল ইন্দ্রজিৎ।
কাট গ্লাসের ঝাড়লণ্ঠন থেকে আলোর টুকরো নানান দিকে ঠিকরে পড়ছে।
*
অনিমেষ সরকারের ঘরটা মাপে ছোট, তবে ছিমছামভাবে সাজানো। ঘরের এককোণে একটা ছোট টেবিলের ওপরে পাশাপাশি শিব ও কালীর ফটো–তাতে চন্দনের টিপ লাগানো।
খাটের ওপরে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিলেন অনিমেষ। ইন্দ্রজিৎকে দেখে উঠে দাঁড়ালেন : আসুন, আসুন। ওই চেয়ারটায় বসুন।
আগে ততটা খেয়াল করেনি, কিন্তু এখন ইন্দ্রজিৎ লক্ষ করল, অনিমেষ সরকারের গলার স্বরটা কেমন যেন ফাঁসফেসে।
ওঁর দেখিয়ে দেওয়া চেয়ারটায় বসল ইন্দ্রজিৎ।
বলুন, জিতেনের খোঁজখবরের কোনও হদিশ পাওয়া গেল?
কপালে ভাঁজ ফেলে ইন্দ্রজিৎ বলল, এখনও পর্যন্ত পাইনি। তবে কতকগুলো ব্যাপারে খুব খটকা লাগছে। কিডন্যাপাররা মুক্তিপণ চাইতে এত দেরি করছে কেন। তারপর, কিডন্যাপিংটা যেভাবে হয়েছে মানে, বাড়িতে এসে যেভাবে ওরা জিতেন্দ্রনাথকে তুলে নিয়ে গেছে, তাতে কাজটা যে খুবই রিকি ছিল…। আই মিন, কিডন্যাপাররা হেভি রিস্ক নিয়েছিল। জেনারালি এতটা রিস্ক ওরা নেয় না। কিন্তু নিলই যখন, তা হলে টাকা চাইতে দেরি করছে কেন? যারা এত ডেসপারেট…!
ঠিকই বলেছেন। জাস্টিফায়েড পয়েন্ট। তবে ওরা হয়তো চাইছে, কটাদিন যাক–ব্যাপারটা থিতিয়ে পড়ুক, তারপর…।
কী জানি! দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়ল ইন্দ্রজিৎ ও ওসব যাকগে, এবারে আপনার কথা বলুন। এ-বাড়িতে কেমন লাগছে?
ভালো কী করে লাগবে বলুন! কাপে শেষ চুমুক দিয়ে কাপটা একটা টি-টেবিলে নামিয়ে রাখলেন অনিমেষ : যার সঙ্গে এতদিন পর দেখা করতে এলাম সে-ই নেই। তার ওপর এরকম বাজে খবর..আমার মনটাই কেমন ডিপ্ৰেণ্ড হয়ে গেছে।
মহেন্দ্র, সুরেন্দ্র, নবনীতা ওদের কেমন বুঝছেন?
হু! প্রবল বিরক্তির একটা শব্দ করলেন অনিমেষ ও একেবারে উচ্ছন্নে গেছে। যে-কোনও কারণেই হোক, জিতেন ওদের বড় লাই দিয়ে মানুষ করেছে। আমাকে ও পরপর বেশ কয়েকটা চিঠিতে ওর দুঃখের কথা লিখেছিল। লাস্ট চিঠিটা পেয়েছিলাম দিন-পনেরো আগে। এই দেখুন– খাট ছেড়ে উঠে পড়লেন অনিমেষ। দেওয়ালের সুদৃশ্য হুকে ঝোলানো ওঁর কয়েকটা জামাকাপড়ের কাছে গেলেন। সেগুলোর পকেট হাতড়ে-হাতড়ে একটা ভাঁজ করা চিঠি বের করলেন। সেটা খুলে একবার দেখে নিয়ে খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে ইন্দ্রজিতের কাছে এলেনঃ এটা পড়ে দেখুন, তা হলেই মোটামুটি সব বুঝতে পারবেন…।
ইন্দ্রজিৎ চিঠিটা নিয়ে পড়ল।
হাতের লেখা যে জিতেন্দ্রনাথের তাতে কোনও সন্দেহ নেই। প্রাণের বন্ধুকে নিজের প্রাণের কথা লিখেছেন জিতেন্দ্রনাথ। বন্ধুকে এ-বাড়িতে আসার জন্য বারবার করে অনুরোধ করেছেন। বলেছেন, ..তোর বিষয়-সম্পত্তি তুই এবারে বুঝে নে। আমাকে মুক্তি দে। আমি বিবাগী হয়ে কোথাও চলে যাই। সংসারে আর লোভ নেই।
ইন্দ্রজিৎ চিঠিটা ফেরত দিয়ে জিগ্যেস করল, আপনি এ-চিঠির জবাব দেননি?
না। ফোনে কথা বলেছিলাম। পা টেনে-টেনে খাটে গিয়ে বসলেন অনিমেষ, ওকে অনেক বোঝাতে চেষ্টা করেছিলাম। বলেছিলাম, তুই শক্ত হাতে ছেলেমেয়ের রাশ টেনে ধর। সব ঠিক হয়ে যাবে। ওদের শাসন করার সময় এখনও পেরিয়ে যায়নি।
আপনার পায়ে কী হয়েছিল?
পায়ে! ইন্দ্রজিতের আচমকা এই প্রশ্নে অনিমেষ কেমন যেন থতমত খেয়ে গেলেন। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, বছরদশেক আগে হিমাচল প্রদেশে বেড়াতে গিয়ে পায়ে চোট পেয়েছিলাম। ফিমার বোনের শ্যাফ্ট ভেঙে গিয়েছিল। ডাক্তাররা স্টিলের প্লেট বসিয়ে ওটা মেরামত করেছে বটে, তবে পায়ে একটু দোষ থেকে গেছে। কথা শেষ করে মলিন হাসলেন অনিমেষ। চোখ থেকে চশমাটা খুলে পাঞ্জাবির খুঁট দিয়ে কাচ দুটো মুছলেন। তারপর আলোর দিকে চশমাটা তুলে ধরে কাচ পরখ করে চশমাটা আবার চোখে দিলেন।
আপনি এ-বাড়িতে এসেই যখন শুনলেন জিতেনবাবু কিডন্যাপ হয়েছেন, তখন পুলিশে ইনফর্ম করার কথা বলেননি?
না, বরং অন্যরকম সাজেশানই দিয়েছিলাম। মহেন্দ্রকে বলেছিলাম, পুলিশে খবর দিলে ব্যাপারটা পাঁচকান হবে। এতে সবারই লজ্জা। তা ছাড়া কিডন্যাপাররা শাসিয়েছে। পুলিশে ইনফর্ম করলে হয়তো জিতেনের বড় রকমের ক্ষতি হয়ে যাবে। হয়তো জিতেনের সঙ্গে কোনওদিনই আমার আর দেখা হবে না…।
গলার স্বর ভেঙে গিয়ে বুজে এল। অনিমেষ সরকার মুখ নীচু করলেন। পকেট থেকে নীল কালো চেক-চেক একটা রুমাল বের করে চশমার ফাঁক দিয়ে চোখ মুছলেন। তারপর কিছুটা সময় নিয়ে মুখ তুললেন। শক্ত গলায় বললেন, সেইজন্যেই আমি পুলিশে খবর দিতে বারণ করেছি। জিতেনের বাড়িতে আমি এই প্রথম এলাম, অথচ ওর সঙ্গে দেখা হবে না–এটা ভাবা যায় না।
জিতেনবাবু ফিরে আসার জন্যে আপনি কতদিন ওয়েট করবেন?
দেখি..আরও সপ্তাদুয়েক তো বটেই! আশা করছি এর মধ্যে কিডন্যাপাররা যোগাযোগ করবে। ওরা যা-ই টাকা দাবি করুক, দিয়ে দেব। টাকার অঙ্কে জিতেনের দাম মাপা যায় না। ও আমার কোন ছোটবেলার বন্ধু! জানেন, একবার…।
