নবনীতার ভেতরটা কিছু একটা করার জন্য নিশপিশ করছিল। ওর চোখে আগুন জ্বলছিল। আক্রোশ-ভরা চোখে ইন্দ্রজিৎকে দেখছিল ও।
আপনার বাবাকে কিডন্যাপ করার পেছনে কার হাত আছে বলে মনে হয়? শান্ত গলায় জিগ্যেস করল ইন্দ্রজিৎ।
নবনীতা রাগে গুম হয়ে ছিল। কাটা-কাটা জবাব দিল : জানি না।
আপনার ছোড়দা বলছিলেন যে, মহেন্দ্রবাবুর হাত থাকলেও থাকতে পারে।
হু! ছোড়দা পুরুষ নাকি! শুধু অন্যদের হিংসে করে। নিজের ইমপোটেন্সি ঢাকতে অন্যের নামে কাদা ছেটায়।
অনিমেষবাবু কেমন লোক?
খুব ভালো ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল নবনীতা, শুধু বাবার ঠিক উলটো। ওই লোকটা যে সত্যি-সত্যি সবকিছুর মালিক সেটা ওর কথাবার্তায় বোঝা যায়। এক নম্বরের কঞ্জুস! সবসময় পুজো আচ্চা নিয়ে থাকার ভান করে, গেরুয়া পাঞ্জাবি পরেবলে, ওটা নাকি খুব পবিত্র রং। আসলে পুরোটাই ঢং।
ইন্দ্রজিৎ মনে-মনে সবকিছু খতিয়ে দেখার চেষ্টা করছিল।
অনিমেষ সরকারের ওপরে তিন ভাই-বোনের রাগ থাকাটা স্বাভাবিক। কারণ, শুনে যতদূর মনে হচ্ছে, কড়া ধাতের কঞ্জুষ মানুষ কখনও স্নেহকাতর পিতার বিকল্প হতে পারে না। সুতরাং জিতেন্দ্রনাথকে ফিরিয়ে আনাটা দারুণ জরুরি। কিন্তু তিনি কি এখনও বেঁচে আছেন? বিছানায় চাদরের ওই রক্তের দাগ বলতে চাইছে কিডন্যাপাররা নিষ্ঠুর, হিংস্র। কিন্তু ওই রক্তের দাগ কি সত্যিই জিতেন্দ্রনাথের? নাকি অন্য কারও? ল্যাব রিপোর্ট পাওয়ার আগে নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়।
অনিমেষ সরকার কি এ-বাড়িতে নিজেকে মানিয়ে নিতে পেরেছেন? ইন্দ্রজিৎ জানতে চাইল।
মানিয়ে নেওয়ার আর কী আছে! হাত উলটে জবাব দিল নবনীতা, উনিই প্রায় সবকিছুর মালিক। দিব্যি খাচ্ছেন-দাচ্ছেন-ঘুরছেন, এনজয় করছেন আর আমাদের তেষ্টার ছটফটানি দেখছেন। বিনা পয়সার সার্কাস।
ইন্দ্রজিৎ বিদায় নিতে যাচ্ছিল হঠাৎই একতলার ড্রইং-ডাইনিং স্পেস থেকে প্রবল ধমকানির চিৎকার ওর কানে এসে ঢুকল।
ভরাট গলায় কেউ চিৎকার করে বলছে, ইন্দ্রজিৎ চৌধুরী আমাদের বাড়িতে এসেছেন চারটের সময়–আর এখন প্রায় সাড়ে সাতটা বাজে। অথচ তোমরা কেউ আমাকে খবরটা দেওয়ার দরকার মনে করোনি! মহেন্দ্র, জিতেনের কাছে আগেই শুনেছিলাম তুমি একটু স্টুপিড টাইপের। এখন দেখছি ও ঠিকই বলেছে। কমনসেন্স বলেও তোমার কিছু নেই। তোমার কাছে সেন্সের মানে একটাই । ননসেন্স।
ইন্দ্রজিৎ বারান্দায় চলে এল। সেখান থেকেই পাখির চোখে দৃশ্যটা দেখতে পেল।
জিনি আর দশরথের সোফার কাছাকাছি একটা জটলা মতন। সেখানে মহেন্দ্র, পরান এবং আরও একজন ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে।
ইন্দ্রজিৎ লক্ষ করল, নবনীতা দরজা ফাঁক করে নীচের তলার ঘটনা দেখতে চেষ্টা করছে।
ইন্দ্রজিৎ তরতর করে সিঁড়ি নামতে লাগল। নামতে নামতে কথাবার্তাগুলো ওর কানে আসছিল।
মহেন্দ্র মিনমিন করে বলছিলেন, না…মানে…আপনি বাড়িতে নেই। কী করে খবর দেব ঠিক বুঝতে…।
না বোঝার কী আছে! তোমাদের কাছে তো আমার মোবাইল নাম্বার রয়েছে!
আর কোনও উত্তর নেই। মহেন্দ্র মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন।
ইন্দ্রজিৎ ওঁদের সামনে এসে দাঁড়াল। ওর খুব খারাপ লাগছিল। হয়তো মহেন্দ্রদের এরকম রুক্ষ শাসনের লাগামেই রাখা দরকার, কিন্তু তাই বলে পরানের সামনে, বাইরের গেস্টদের সামনে।
অনিমেষ সরকারকে ভালো করে দেখল ইন্দ্রজিৎ।
মাথায় কাঁচা-পাকা চুল, চোখে হাই-পাওয়ার চশমা, নাকটা অস্বাভাবিক মোটা, গালে হালকা চাপদাড়ি।
পরনে, নবনীতা যেমনটি বলেছিল, গেরুয়া খদ্দরের পাঞ্জাবি আর সাদা পাজামা। হাতে সাধারণ একটা লাঠি। হয়তো চলার সময় ভর দেওয়ার দরকার হয়। লাঠিটা দেখে নতুন বলে মনে হল।
ইন্দ্রজিৎ পরিচয় দিয়ে একগাল হাসতেই অনিমেষ সরকারের মুখের রুক্ষতা কেটে গেল। কপালে ফুটে ওঠা বিরক্তির ভাঁজও গেল মিলিয়ে।
আসুন, মিস্টার চৌধুরী, আমার ঘরে আসুন। আপনাদের আপ্যায়নের কোনও ত্রুটি হয়নি তো?
ইন্দ্রজিৎ বিনীতভাবে জানাল যে, না, হয়নি। তারপর বলল, আপনি ঘরে যান–ফ্রেশ হয়ে নিন। আমি ওঁদের সঙ্গে দুমিনিট কথা বলেই যাচ্ছি– ইশারা করে দশরথ আর জিনিকে দেখাল ইন্দ্রজিৎ।
ওইটা আমার ঘর–মানে, আপাতত ওখানেই আশ্রয় নিয়েছি। জিতেন্দ্রনাথের ঘরের লাগোয়া একটা ঘর দেখালেন অনিমেষ। তারপর লাঠিতে ভর দিয়ে সামান্য খুঁড়িয়ে হেঁটে এগোলেন সেই ঘরের দিকে।
পরান ইতস্তত পায়ে ওঁকে অনুসরণ করল।
মহেন্দ্র অপ্রস্তুতভাবে এদিক-ওদিক তাকিয়ে আমি আসছি বলে চলে গেলেন।
ইন্দ্রজিৎ জিনির পাশে সোফায় গিয়ে বসল।
জিনি, ভেবেছিলাম দোতলায় গিয়ে ইন্টারোগেট করার সময়েও তোমাকে সঙ্গে থাকতে বলব, তুমি নোট নেবে–কিন্তু তাতে সিচুয়েশানটা এত এমব্যারাসিং হয়ে যেত যে… কথা শেষ করল না ইন্দ্রজিৎ।
জিনি মুখ ভার করে বলল, বসে-বসে শুধু বোর হচ্ছি। দশরথদা যত রাজ্যের ডিটেকটিভ গল্প শুনিয়ে আমাকে আরও বের করে দিচ্ছে।
দশরথ আমতা-আমতা করে হেসে বলল, ইনভেস্টিগেশানের মূল মন্ত্রটা ওঁকে বোঝাতে চাইছিলাম।
সেটা কী? ইন্দ্রজিৎ জানতে চাইল।
দশরথ গম্ভীরভাবে বলল, ইনভেস্টিগেট, ইনভেস্টিগেট, ইনভেস্টিগেট। শুধু তদন্ত করে যাও, তা হলেই ফল মিলবে।
ইন্দ্রজিৎ হেসে ফেলল। তারপর জিনিকে বলল, কয়েকটা ইমপরট্যান্ট পয়েন্ট খুব তাড়াতাড়ি লিখে নাও। পরে হয়তো মাথা থেকে বেরিয়ে যাবে।
