সেটা আমরা তিন ভাই-বোনে চুরমার করে দিয়েছি। খানিকটা ক্ষোভের সঙ্গেই বললেন সুরেন্দ্র।
ওঁর অনেক দুঃখ-কষ্ট ছিল।
দুঃখ-কষ্ট আমার নেই। আপনি জানেন, আমার এই মেয়েলি গলার জন্যে কত অপমান আমাকে ছোটবেলা থেকে সহ্য করতে হয়েছে–এখনও হয়! আমার ছোটবোন পর্যন্ত আমাকে এ নিয়ে ব্যঙ্গ করে, খোটা দেয়!
ইন্দ্রজিৎ উঠে দাঁড়াল : নিশ্চয়ই এই দুঃখ-কষ্টের প্রতিবাদে আপনি জিতেনবাবুকে কিডন্যাপ করেননি?
সুরেন্দ্রর ফরসা মুখে রক্তের ঝলক ঝাপটা মারল। কথা বলতে গিয়ে উত্তেজনায় ওঁর গলা চিরে গেল; বাঃ, চমৎকার! এই না হলে ডিটেকটিভ! আপনি বরং আমাকে অ্যারেস্ট করুন। অনিমেষকাকা বাড়িতে থাকলে আপনার এই ইনসাল্টের যোগ্য জবাব দিত। আপনার আর নবনীতার মধ্যে কোনও ডিফারেন্স নেই দেখছি!
সুরেন্দ্রর অভিমান ইন্দ্রজিৎকে ছুঁয়ে গেল। ও বলল, সরি, আমি ঠিক সিরিয়াসলি কথাটা বলিনি। এমনি ঠাট্টা করে বলেছিলাম…।
সুরেন্দ্র একটু স্বাভাবিক হলেন। দাঁত দিয়ে বারদুয়েক ঠোঁট কামড়ালেন। ইন্দ্রজিতের সঙ্গে-সঙ্গে ঘরের দরজা পর্যন্ত এগিয়ে এলেন।
আচ্ছা, আপনার বাবার বন্ধু অনিমেষ সরকার কি খুব কড়া ধাতের লোক?
হ্যাঁ…বাবার তুলনায় তো বটেই!
জিতেনবাবুর চিঠির কথা তো আপনি সব জানেন!
হ্যাঁ–দাদা সবাইকে ওটা পড়ে শুনিয়েছিলেন।
চিঠির কথা সব সত্যি?
ইতস্তত করে সুরেন্দ্র বললেন, প্রথমটা তো বিশ্বাস হতে চায়নি। পরে, অনিমেষকাকা আসার পর বুঝলাম, শুধু সত্যি নয়–হ্যাঁড়ে-হাড়ে সত্যি। টাকাপয়সা, কোম্পানি সবকিছুরই কন্ট্রোল অনিমেষকাকার হাতে।
মনে-মনে হেসে ফেলল ইন্দ্রজিৎ। সবকিছুর কন্ট্রোল হাতে থাকায় অনিমেষবাবুর অনিমেষকাকা হয়ে উঠতে আর দেরি হয়নি। এ-দুনিয়ায় লক্ষ্মী বড় শক্তিশালী।
আচ্ছা, সুরেন্দ্রবাবু–থ্যাঙ্ক ইউ ফর ইয়োর কোঅপারেশান। পরে দরকার হলে আবার কথা বলব। আপনার ছোটবোনের ঘরটা কোনদিকে?
অদ্ভুত চোখে ইন্দ্রজিতের দিকে তাকিয়ে বারান্দার শেষ প্রান্তের একটা ঘরের দিকে আঙুল তুলে দেখালেন সুরেন্দ্র। তারপর চাপা গলায় বললেন, একটু কেয়ারফুল থাকবেন। খরচের টাকায়। টান পড়ায় নীতা খুব চটে আছে। কাল ও অনিমেষকাকার কাছে টাকা চাইতে গিয়েছিল–অনিমেষকাকা স্রেফ না করে দিয়েছেন। নীতা অনিমেষকাকার ওপরে একেবারে ফায়ার হয়ে আছে। বাবা ফিরে না এলে আমাদের এই দম আটকানো অবস্থা কাটবে না।
সুরেন্দ্র ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে ইন্দ্রজিৎকে বিদায় দিলেন।
ইন্দ্রজিৎ মার্বেল পাথরের বারান্দার পা ফেলে নবনীতার ঘরের দিকে এগোল।
*
ঘরে ঢুকতেই এয়ারকুলারের ঠান্ডা ছোঁয়া ইন্দ্রজিৎকে জড়িয়ে ধরল। আর একইসঙ্গে হালকা পারফিউমের গন্ধ ওকে আদর করল।
ঘরে কোথাও আলতো মিউজিক বাজছিল কিন্তু শব্দটা ঠিক কোন দিক থেকে আসছে সেটা ঠাহর করা যাচ্ছিল না।
দরজার পাল্লা ঠেলে ঢোকার সময় নক করেছিল ইন্দ্রজিৎ। আর তখনই বিছানায় শুয়ে থাকা নবনীতা ঘাড় উঁচু করে তাকিয়েছিল ইন্দ্রজিতের দিকে। সুন্দর করে হেসে অভ্যর্থনা জানিয়েছিল? কাম অন ইন, শার্লক। বড়দা বলছিল আপনার নাম না কি ইন্দ্রজিৎ? তা ইন্দ্রের সঙ্গে কতটা মিল আপনার?
কথা বলতে বলতে বিছানায় উঠে বসল নবনীতা। অবাধ্য চুলগুলোকে মাথার এক মনোরম ঝাঁকুনিতে পিঠের দিকে ফেরত পাঠাল। তারপর তেরছা চোখে তাকিয়ে রইল ইন্দ্রজিতের দিকে– যেন একটু আগের প্রশ্নটার জন্য অপেক্ষা করছে।
ধর্ম-টর্ম কিংবা দেবতা নিয়ে আমার তেমন একটা চর্চা নেই, ম্যাডাম। আমার কারবার অধর্ম আর শয়তান নিয়ে। বাট আই ডু লাভ ইট।
ও– করে অদ্ভুত এক শব্দ করল নবনীতা। বসে-বসেই শরীরটাকে লাটুর মতো ঘুরিয়ে পা দুটো বিছানার বাইরে ঝুলিয়ে দিল। ভুরু কপালে তুলে প্রশংসার ঢঙে বলল, স্মার্ট! স্মাট! আই ডু লাভ ইট। বিউটি আর ব্রেইন একই শরীরে…উঃ, ভাবা যায় না!
দেওয়ালে নবনীতার অনেকগুলো ফটোগ্রাফ পোস্টারের মতো করে লাগানো ছিল। তাতে নবনীতাকে নানান পোশাকে দেখা যাচ্ছে। পোশাকগুলোর বেশিরভাগই বিদেশের সি-বিচে মানানসই।
অবশ্য নবনীতার এখনকার পোশাকটাও অনেকটা সেই ধরনের। পোশাকটা ম্যাক্সিগোছের, তবে হাঁটুর নীচেই শেষ হয়েছে। হালকা নীল আর সাদা জমিতে সুতোর কাজ করা। কাপড়টা এমনই স্বচ্ছ যে, বোঝা যাচ্ছে নবনীতা অন্তর্বাস পরেছে।
বলুন, মিস্টার ডিটেকটিভ, আমার কাছ থেকে ডিটেইলে কী জানতে চান? ঠোঁট উলটে বলল নবনীতা। একটু থেমে তারপর ও ওই চেয়ারটায় বসতে পারেন– ইশারায় হাততিনেক দূরের একটা চেয়ার দেখাল ও অথবা এইখানটায় বসতে পারেন। বিছানায় ঠিক ওর পাশটায় আলতো চাপড় মারল নবনীতা। তারপর খিলখিল করে জলতরঙ্গ শুনিয়ে দিল।
ইন্দ্রজিৎ বখে-যাওয়া মেয়েটাকে একপলক দেখল। তারপর চেয়ারটায় গিয়ে বসল।
আপনি মডেলিং করেন?
বিছানায় বসে পা দোলাচ্ছিল নবনীতা। পা দোলানো থেমে গেল : কেন, আপনার আপত্তি আছে?
হাসল ইন্দ্রজিৎ? কেউ নিজের ইচ্ছায় উচ্ছন্নে গেলে আমার আপত্তি করার কী আছে!
উচ্ছন্নে! কী বলতে চান আপনি! জানেন ফ্যাশান টিভি চ্যানেলে আমাকে দেখিয়েছে।
বুঝেছি–আপনি নিজেকে ভীষণ দেখাতে চান। কিন্তু কেউ যদি দেখতে না চায়?
রাগে থমথম করছিল নবনীতার মুখ। বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে হাত ছুঁড়ে কী একটা বলতে যাচ্ছিল, ওকে ইশারায় থামতে বলল ইন্দ্রজিং। তারপর ধীরে, ম্যাডাম, ধীরে। আমি আপনার বড়দা বা ছোড়দা নই। আর, বড়লোক হলেই কি অসভ্য হতে হবে?
