যদি আমার হঠাৎ করে কিছু হয়, তাই তোমাদের সব কথা জানিয়ে রাখলাম। ইতি– হতভাগ্য জিতেন্দ্রনাথ সেন
চিঠিটা বারদুয়েক খুঁটিয়ে পড়ল ইন্দ্রজিৎ। তারপর বলল, আপনি ঠিকই বলেছেন–উনি যেন জানতেন ওঁর খারাপ কিছু একটা হবে।
হ্যাঁ–সেটাই তো আপনাকে বলছিলাম। চিঠিটা বাবার বেডরুমে একটা টেবিলের ওপরে পেপারওয়েট চাপা দেওয়া ছিল।
আপনার বাবার একটা ফটো দেখাতে পারেন?
এক মিনিট। এক্ষুনি নিয়ে আসছি। মহেন্দ্র ফটোর জোগাড় করতে চলে গেলেন।
ইন্দ্রজিৎ দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এল। সঙ্গে-সঙ্গে কানে এল মিহি গলায় কেউ গান গাইছে। সুরেন্দ্র গলা সাধছেন।
শুনে হাসি পেয়ে গেল ইন্দ্রজিতের। গানের জন্য এ-গলা তৈরি হয়নি। এ-গলা তৈরি হয়েছে শুধু দেহকে মাথার সঙ্গে জুড়ে রাখার জন্য। তবে একটা ব্যাপার ইন্দ্রজিতের ভালো লাগল। সুরেন্দ্র একজন নামী গায়িকার গানই প্র্যাকটিস করছেন। অর্থাৎ, সুরেন্দ্র গায়ক নয়, গায়িকা হওয়ারই চেষ্টা করছেন।
মহেন্দ্র একটা অ্যালবাম নিয়ে ফিরে এলেন। তার একটা পৃষ্ঠা খুলে ইন্দ্রজিৎকে দেখালেন। বছরতিনেক আগে চারদিনের ফুরসত পেয়ে জিতেন্দ্রনাথ তিন ছেলেমেয়েকে নিয়ে সিঙ্গাপুর বেড়াতে গিয়েছিলেন। ফটোটা সেখানেই তোলা। আলো-ঝলমলে একটা রাস্তায় জিতেন্দ্রনাথ দাঁড়িয়ে। পিছনে দূরে একটা বাড়ির মাথায় গ্লো-সাইনে তৈরি একটা ড্রাগনের ছবি দেখা যাচ্ছে।
জিতেন্দ্রনাথকে খুঁটিয়ে দেখল ইন্দ্রজিৎ।
লম্বা দোহারা চেহারা। মাথায় বিস্তৃত টাক–শুধু দুকানের পাশে চুলের ঝালর। চোখে চশমা নেই। নিশ্চয়ই কনট্যাক্ট লেন্স পরেছেন। প্যান্ট-শার্ট পরা জিতেন্দ্রনাথকে বেশ সুপুরুষই দেখাচ্ছে। ইন্দ্রজিতের মনে হল, সীমন্তিনী মারা যাওয়ার পর উনি অনায়াসেই বিয়ে করতে পারতেন।
ইন্দ্রজিৎ বলল, এই ফটোটা আর এই চিঠিটা হাতের চিঠিটা দেখাল ইন্দ্রজিৎ, আমি একটু রাখছি। কপি করে কাল বা পরশু আপনাকে ফেরত দেব।
মহেন্দ্র রাজি হয়ে ঘাড় নাড়লেন। ফটোটা অ্যালবাম থেকে খুলে ইন্দ্রজিতের হাতে দিলেন।
আমি এবার আপনার ভাই-বোনের সঙ্গে একটু কথা বলব…তারপর নীচে যাচ্ছি।
ইঙ্গিতটা ধরতে পেরে মহেন্দ্র নির্লিপ্ত মুখে নিজের ঘরে ঢুকে গেলেন।
ইন্দ্রজিৎ পায়ে-পায়ে সুরেন্দ্রর ঘরে গিয়ে হাজির হল।
*
সুরেন্দ্রর ঘরের দরজা খোলাই ছিল। এ-ঘরে এসি নেই।
বড় মাপের ঘর। ঘরের দেওয়ালে রবীন্দ্রনাথ আর লতা মঙ্গেশকরের বাঁধানো ফটো ঝুলছে। এখানে-ওখানে হারমোনিয়াম, তানপুরা, তবলা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। গোটা ঘরটায় কেমন অগোছালো ভাব। শিল্পীর ঘর বোধহয় এরকমই হয়!
ঘরের ডানদিকের দেওয়াল ঘেঁষে একটা শৌখিন শো-কেস। তাতে যত রাজ্যের ক্যাসেট। শো-কেসের ওপরে বসানো রয়েছে চার হাজার পি.এম.পি.ও.-র একটি সনি সাউন্ড সিস্টেম। তার স্পিকার দু-দিকের দেওয়ালে বসানো।
সুরেন্দ্র হামোনিয়াম বাজিয়ে গান গাইছিলেন। ইন্দ্রজিৎকে দেখেই গানবাজনা থামিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। সৌজন্যের হাসি হেসে বললেন, আসুন।
মেঝেতে দামি কার্পেট পাতা ছিল। সেখানে ইন্দ্রজিতকে বসতে অনুরোধ করে সুরেন্দ্র নিজেও বসলেন।
আমাকে কিছু জিগ্যেস করবেন?
হ্যাঁ। মাথার চুলে হাত বুলিয়ে নিয়ে বলল ইন্দ্রজিৎ, আপনার বাবার কিডন্যাপিং সম্পর্কে আপনার কি আইডিয়া?
একটু ইতস্তত করে সুরেন্দ্র চাপা গলায় বললেন, ওপেনলি বলব?
অফ কোর্স!
আমার মনে হয় এটা দাদার কাজ।
ইন্দ্রজিৎ চমকে উঠল। সুরেন্দ্রকে এমনিতে দেখে ওর ভীতু মনে হয়েছে। সুরেন্দ্র যে ওঁর দাদার নামে এরকম একটা অভিযোগ করতে পারেন সেটা ও কল্পনাও করেনি। মনে-মনে নিজের কানটা মুলে দিল ইন্দ্রজিৎ। একজন তুখোড় ডিটেকটিভকে সবরকম সম্ভাবনার কথা হিসেবে রাখতে হয়।
আপনার এরকম মনে হয় কেন?
দাদা নিত্যনতুন বিজনেস চালু করে এক্সপেরিমেন্ট করে। সেজন্যে ওর মাঝে-মাঝেই অনেক টাকার দরকার হয়। এই তো শুনলাম এখন না কি গ্লাসউলের ফ্যাক্টরি খুলবে বলে ভাবছে। আসলে দাদার ব্যবসা চালানোর কোনও মাথা নেই…।
ইন্দ্রজিৎ বাধা দিয়ে বলল, যার ব্যবসায় মাথা নেই তাঁর কিডন্যাপিং-এ মাথা থাকবে?
খুব থাকবে। প্রায় মুখ ভেংচে বললেন সুরেন্দ্র, হাতে টাকা পাওয়ার জন্যে দাদা মরিয়া হয়ে উঠেছে। আর ব্যবসায় বুদ্ধি না থাকলে কি কারও মাথায় বদমায়েশি বুদ্ধি থাকতে পারে না!
তাই যদি হয়, তা হলে মহেন্দ্রবাবু আমার কাছে গেলেন কেন? এতে তো ওঁরই অসুবিধে হবে।
সাধ করে কি আর গেছে। আসলে আশপাশের লোকজন পাঁচরকম কথা বলছে, তাই।
ইন্দ্রজিৎ কিছুক্ষণ চুপ করে কী ভাবল। তারপর আচমকা বলল, আপনি তো লাস্ট শনিবার জিতেনবাবুর সঙ্গে খুব তর্কাতর্কি করেছেন। গানবাজনার দল নিয়ে আপনি বিদেশে কোথায় যাচ্ছেন?
সুরেন্দ্রর মুখ থেকে পলকে সব রক্ত সরে গেল।
কে বলেছে আপনাকে? নিশ্চয়ই পরানদা!
সুরেন্দ্রর গলা মেয়েলি হলে কি হবে, ওঁর বুদ্ধির কোনও খামতি নেই। ভাবল ইন্দ্রজিৎ।
যে-ই বলুক–ব্যাপারটা তো সত্যি।
মাথা নীচু করলেন সুরেন্দ্র। কিছুক্ষণ পর মুখ তুলে তাকালেন ইন্দ্রজিতের দিকেঃ বাবার কালচার বলে কিছু ছিল না। গানবাজনার লেভেলটা বাবা ঠিক বুঝত না।..মা কিন্তু এরকম ছিল না।
আপনার অনেক স্বপ্ন আছে, সুরেন্দ্রবাবু। রবীন্দ্রনাথের ছবির দিকে তাকিয়ে বলল ইন্দ্রজিৎ, স্বপ্ন সবারই থাকে–স্বপ্ন থাকাটা দোষের নয়। তবে কথাটা কী জানেন, জিতেনবাবুরও হয়তো কিছু স্বপ্ন ছিল…।
