ইন্দ্রজিতের কাছে পারিবারিক ছবিটা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছিল। ছেলেমেয়েদের লোভের উৎপাতে অতিষ্ঠ এক স্নেহময় ধনী পিতা। সত্যি, জিতেন্দ্রনাথের জন্য বেশ কষ্ট হয়।
শেষ দিকটায় বড়বাবু প্রায়ই বলতেন, ওদের শিক্ষা দেওয়া দরকার। উচিত শিক্ষা। যাতে ওরা স্নেহ-ভালোবাসা ভাঙিয়ে আমার কাছ থেকে আর সুযোগ নিতে না-পারে। লোভ ওদের শেষ করে দিয়েছে। ওদের কাছে সম্পর্কের আর কোনও দাম নেই।
কথা শেষ করে হতাশায় মাথা নাড়ল পরান।
কিছুক্ষণ চুপ করে রইল ইন্দ্রজিৎ। তারপর বলল, ঠিক আছে, পরান-তুমি এখন যাও। এসব কথা আর কাউকে বলার দরকার নেই। যদি সে-রকম বুঝি, তা হলে তোমার সঙ্গে পরে কথা বলব।
পরান উঠে দাঁড়াল। ইন্দ্রজিৎকে নমস্কার করে ধীরে-ধীরে চলে গেল ঘর ছেড়ে।
কবজি উলটে ঘড়ি দেখল ইন্দ্রজিৎ। প্রায় ছটা বাজে। ঘরের কোয়ার্জ ওয়াল-ক্লকটা পাঁচ মিনিট ফাস্ট। নাকি ইন্দ্রজিতেরটা পাঁচ মিনিট স্লো!
এমন সময় মহেন্দ্র ঘরে ঢুকলেন। স্মিত হেসে বললেন, মিস্টার চৌধুরী, আসুন, একটু চায়ের ব্যবস্থা করেছি। দরকার হলে চায়ের পর আবার কাজ শুরু করবেন…।
চলুন– বলে মহেন্দ্রকে অনুসরণ করে ইন্দ্রজিৎ আর জিনি ড্রইং-ডাইনিং স্পেসে এসে হাজির হল।
এসে দেখল দশরথ চায়ের কাপে চুমুক দেওয়া শুরু করেছে।
.
চা খেতে-খেতে ইন্দ্রজিৎ জিতেন্দ্রনাথের একটা ফটো দেখতে চাইছিল। মহেন্দ্র উত্তরে বলেছেন, চা শেষ করে আমার ঘরে চলুন–ফটোও দেখাব, আর চিঠিটাও দেখাব।
সুতরাং জিনি আর দশরথকে সোফায় বসিয়ে রেখে ইন্দ্রজিৎ মহেন্দ্রর সঙ্গে দোতলায় গেল। জিনি তখন মুগ্ধ চোখে ঘরের নানান আসবাবপত্র দেখছে। আর দশরথ এমনভাবে ড্রইং-ডাইনিং স্পেসে ঘুরে বেড়াচ্ছে যেন স্রেফ ঘ্রাণশক্তি দিয়েই সে যাবতীয় রহস্য উদঘাটন করে ফেলবে।
দোতলায় নিজের ঘরে ইন্দ্রজিৎকে বসিয়ে মহেন্দ্র একটা ডেস্কের কাছে গেলেন। একটা ভাঁজ করা চিঠি বের করে ইন্দ্রজিতের হাতে এসে দিলেন।
আমাদের লেখা বাবার শেষ চিঠি। হাতের লেখাটা বাবার–আমরা চেক করে দেখেছি।
ইন্দ্রজিৎ চিঠিটা খুলে দেখল।
কাগজের দু-পিঠে কালো কালি দিয়ে লেখা। বেশ বড় চিঠি।
চিঠিটা পড়ে আমাদের মনে হয়েছে, বাবা যেন জানতেন উনি আর বেশিদিন নেই। এটাকে কি আপনি সিক্সথ সেন্স বলবেন?
আপনার কি ধারণা জিতেনবাবু আর বেঁচে নেই?
সেরকমই তো মনে হচ্ছে। কিডন্যাপাররা যখন আর কোনও সাড়া-শব্দ করছে না…।
ইন্দ্রজিৎ হাসল : যে-হাঁস সোনার ডিম পাড়ে তাকে কখনও কেউ খতম করে! হয়তো অন্য কোনও কারণে কিডন্যাপাররা চুপচাপ রয়েছে। তারপর…সময় এলে..আপনাদের ফোন করবে।
ইন্দ্রজিৎ এবার চিঠিটা পড়তে শুরু করল। এয়ারকুলারের ঠান্ডা বাতাসে ওর বেশ শীত শীত করছিল। মহেন্দ্রকে ওটা কমিয়ে দেওয়া জন্য অনুরোধ করল।
চিঠিতে তিন ছেলেমেয়েকেই সম্বোধন করেছেন জিতেন্দ্রনাথ। তারপর লিখেছেন :
পনেরো বছর আগে তোমাদের মা সীমন্তিনী যখন চলে যায় তখন আমি তাঁকে কথা দিয়েছিলাম, তোমাদের মানুষের মতো মানুষ করব। কিন্তু ব্যবসার চাপ, অন্ধ স্নেহ, আর তোমাদের লোভ আমার প্রতিজ্ঞা ছত্রখান করে দিয়েছে। এখন একা, গোপনে, তোমাদের মায়ের ছবির কাছে চোখের জল ফেলা ছাড়া আমার আর কোনও গতি নেই। ভুল আমারই–আমিই তোমাদের ঠিকমতো শাসন করতে পারিনি। আর শাসন করার পক্ষে এখন হয়তো অনেক দেরি হয়ে গেছে।
পিতা হিসেবে আমি ব্যর্থ হয়েছি। তোমাদের মানসিক অত্যাচারে আমি ক্লান্ত। আমার সামনে আর কোনও পথ খোলা নেই। তাই যে-একমাত্র পথ খোলা আছে। সেই পথেই আমি যাব। না, না–ভুলেও ভেবো না আমি সুইসাইড করার কথা ভাবছি। আমার সেই একটি মাত্র পথ হল একটা নিষ্ঠুর গোপন কথা তোমাদের সামনে তুলে ধরা। এ কথা জানাতে আমার খুবই কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু এখন আর ফেরার কোনও পথ নেই। তোমরাই এই কাজে আমাকে বাধ্য করেছ।
আমার যত ধন-সম্পত্তি, গাড়ি-বাড়ি, ফ্যাক্টরি–কোনও কিছুরই মালিকানা আমার একার নয়। আমি শতকরা মাত্র কুড়িভাগের মালিক–বাকি আশিভাগের মালিক আমার ছোটবেলার বন্ধু অনিমেষ সরকার। ওরা আরামবাগের বনেদি বড়লোক। আমার সঙ্গে ওর নিয়মিত টেলিফোনে যোগাযোগ আছে। অনিমেষ যে কোনও মুহূর্তে এসে দলিলমাফিক ওর অংশ বুঝে নিলে আমার–এবং তোমাদের অবস্থা হবে পথের ভিখারির মতো। কিন্তু অনিমেষ আমাকে ভীষণ ভালোবাসে। ছোটবেলায় আমরা ছিলাম হরিহর-আত্মা। তাই কখনও ও এইসব সম্পত্তিতে ওর অংশ আছে বলে ভাবেনি। ধর্ম-কর্ম পুজো-আচ্চা নিয়েই এখন ও জীবন কাটায়। আর আমি সুখে আছি জানলেই ও সুখী।
সম্প্রতি অনিমেষকে আমি আমার মানসিক দুরবস্থার কথা জানিয়েছি। ও তাতে ভীষণ ক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছে। লোভকে ও ঘৃণা করে। লোভীদের আর বেশি। আমি ওকে চিঠি দিয়ে বলেছি, এখানে এসে ওর সমস্ত সম্পত্তি বুঝে নিয়ে ও যেন আমাকে মুক্তি দেয়। ও উত্তরে আসবে বলে জানিয়েছে। যে-কোনও দিন ও এসে হাজির হতে পারে। ওকে অমান্য বা অসম্মান করার সাহস আমার নেই– আশা করি তোমরাও তা করবে না। অবশ্য ও খুব কড়া ধাতের সাত্ত্বিক মানুষ। অভব্যতা দেখলে ও সঙ্গে-সঙ্গে শাস্তি দিতে পারে। তা ছাড়া এই বাড়ি-গাড়ি, ব্যবসা–সবকিছুরই তো ও আশিভাগের মালিক। ভাবছি, আমার কুড়ি ভাগও ওকে লিখে দিয়ে আমি মুক্তি নেব। তোমরা হয়তো মামলা করতে চাইবে…করে দেখো, অনিমেষ তার কেমন জবাব দেয়। ও কখনও অন্যায়ের কাছে কাবু হতে শেখেনি। ওকে সব দিয়ে দিলে আমি হয়তো পথের ভিখিরি হব, কিন্তু তাতে আমার আপত্তি নেই। তার বদলে অন্তত সুখ-শাস্তি তো ফিরে পাব! তাই এখন আমি অনিমেষের আসার অপেক্ষায় দিন গুনছি।
