না– কারণ, পাঁচদিন আগে উনি কিডন্যাপ্ত হয়েছেন।
কিডন্যাপড হয়েছেন!
হ্যাঁ। গত সোমবার ভোররাতে একটা শব্দে আমার ঘুম ভেঙে যায়। আমার ঘর দোতলায়। আর বাবা একতলার বড় একটা ঘরে থাকতেন। আমি সিঁড়ির কাছে আসামাত্রই দেখতে পাই কয়েকটা কালো ছায়া কিছু একটা পাঁজাকোলা করে নিয়ে যাচ্ছে। আমি চিৎকার করে উঠতেই তাদের মধ্যে একজন আমার দিকে রিভলভার তুলে শাসায়। বলে, চেঁচালে কি পুলিশে খবর দিলে আপনার বাবাকে খতম করে দেব। পরে আপনাকে ফোন করব। যান, ঘরে চলে যান। গিয়ে চুপটি করে শুয়ে থাকুন। সকালে কেউ জিগ্যেস করলে বলবেন জিতেনবাবু কোম্পানির কাজে ট্যুরে গেছেন। যা-যা বললাম মনে থাকে যেন!
আমি ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে শুরু করেছিলাম। সেই অবস্থাতেই কোনওরকমে ঘরে ফিরে গেছি।
বাড়ির সবাই খবরটা জেনেছে? ইন্দ্রজিৎ চেয়ার ছেড়ে উঠে পায়চারি শুরু করল। শেষ হয়ে যাওয়া সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে ফেলে দিল।
হ্যাঁ–সকালে সুরেন আর নবনীতা জেনেছে। আর পরানদাও জেনেছে।
পরানদা কে?
বাবার আমলের কাজের লোক। বয়েসে বাবার চেয়েও অনেক বড়। আমাদের কোলেপিঠে করে মানুষ করেছে।
কিডন্যাপারদের কোনও ফোন এসেছিল? টাকাপয়সা কিছু চেয়েছে?
হ্যাঁ, সোমবার সকালে ওরা ফোন করেছিল। পুলিশে কিছু জানাতে বারণ করেছে। তবে টাকাপয়সা এখনও কিছু চায়নি–বলেছে, পরে জানাবে। তারপর থেকে আর কোনও ফোন আসেনি।
ইন্দ্রজিৎ কপালে ভাঁজ ফেলে চিন্তা করছিল। মহেন্দ্র সেন আশা-ভরা চোখে ওর দিকে তাকিয়ে ছিলেন। হঠাৎই খেয়াল হওয়াতে হাতের নিভে-যাওয়া সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে রেখে দিলেন। তারপর বললেন, মিস্টার চৌধুরী, আপনি আজ বিকেলে আমাদের বাড়িতে একবার আসুন। স্পটটা একবার দেখে নিন। তা ছাড়া আমার কতকগুলো পারসোনাল কথাও বলার আছে। আমাকে লেখা বাবার একটা চিঠিও আপনাকে দেখাব। আর তার ওপর রয়েছে অনিমেষ সরকারের সমস্যা। বাবার ছোটবেলার বন্ধু–উনি গত পরশু আমাদের সল্টলেকের বাড়িতে এসে উঠেছেন। বাবা নেই, অথচ…সে এক বিরাট সমস্যা।
তার মানে! আবার কীসের সমস্যা?
ব্যাপারগুলো এখানে ঠিক ডিসকাস করা যাবে না। আপনি প্লিজ আমাদের বাড়িতে আসুন– তখন সব খুলে বলব।
আমি একা নয়–আমরা তিনজনে আজ বিকেল চারটেয় সময় আপনার বাড়িতে যাব।
তাই এসেছে ইন্দ্রজিৎ সঙ্গে জিনি আর দশরথ।
কলিংবেল বাজাতেই দরজা খুলল একজন বয়স্ক কাজের লোক। বোধহয় পরান–ভাবল ইন্দ্রজিৎ।
জমকালো ড্রইং কাম-ডাইনিং স্পেসে ওদের আপ্যায়ন করে বসাল পরান।
প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই এসে হাজির হলেন মহেন্দ্র। হেসে বললেন, আপনারা এসেছেন–ভীষণ খুশি হয়েছি।
ইন্দ্রজিৎ খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে ঘরটা দেখছিল। এরকম ঘর হিন্দি ছবিতেই দেখা যায়। আসবারপত্রও ঘরের সঙ্গে মানানসই। দুরে, ঘরের শেষ প্রান্ত থেকে, সুন্দর বাঁক নেওয়া সিঁড়ি উঠে গেছে দোতলায় দিকে।
আপনারা বসুন–আগে একটু চায়ের ব্যবস্থা করি। মহেন্দ্র সৌজন্য করে বললেন।
না, মিস্টার সেন। আগে বরং একটু কাজ সেরে নিই। ইন্দ্রজিৎ গা-ডুবে যাওয়া সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালঃ চলুন, আপনার বাবার ঘরটা আগে দেখি।
জিনিকে চোখের ইশারা করে পা বাড়াল ইন্দ্রজিৎ। জিনি ওর শর্টহ্যান্ড খাতা আর পেনসিল নিয়ে ইন্দ্রজিতের ছায়া হয়ে গেল।
মহেন্দ্র ইন্দ্রজিৎদের পথ দেখিয়ে দক্ষিণদিকে নিয়ে গেলেন। সেখানেই জিতেন্দ্রনাথের শোওয়ার ঘর। ঘরের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে একটি মেয়ে একজন পুরুষের সঙ্গে চাপা গলায় একান্তে কিছু কথাবার্তা বলছিল। ইন্দ্রজিৎদের দেখে চট করে নিজেদের মধ্যে দূরত্ব বাড়িয়ে ফেলল।
মহেন্দ্র সেন আলাপ করিয়ে দিলেন।
আমার ছোটভাই, সুরেন–আর বোন, নবনীতা। ইনি ডিটেকটিভ ইন্দ্রজিৎ চৌধুরী। বাবার কিডন্যাপিং-এর ব্যাপারে ওঁর হেলপ চেয়েছি। তোদের তো আগেই বলেছিলাম…।
নবনীতা হঠাৎই খিলখিল করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে ওর উদ্ধত শরীরে নানারকম ভাঙচুর হতে লাগল।
অনেকক্ষণ পর হাসি থামিয়ে বেশ কষ্ট করে ও বলল, বড়দা, তোমার এই গুঁড়ি গুডি ইমেজটা এবার ছাড়া তো! ভেতরে-ভেতরে তো আমাদেরই মতো তেষ্টায় মরে যাচ্ছ। অথচ মুখে একটা বেড়াল-তপস্বীগোছের ভাব ফুটিয়ে রেখেছ। নাঃ, সিনেমা লাইনটাই তোমার আসল লাইন ছিল। কেন যে ফর নাথিং একটার-পর-একটা নতুন-নতুন বিজনেস ট্রাই করে যাচ্ছ কে জানে!
নীতা! ইন্দ্রজিৎবাবু আমাদের গেস্ট। ওঁর সামনে তুমি কিন্তু লিমিট ছাড়িয়ে যাচ্ছ! বাবা এখন কীরকম কষ্টের মধ্যে কী অবস্থায় আছে কিছুই জানি না। যে করে থোক বাবাকে ফিরিয়ে আনা আমাদের কর্তব্য।
কর্তব্য! আবার একদফা কাচের-চুড়ি-ভাঙা হাসি। সে-হাসির মধ্যে শঙ্খচূড়ের বিষ ছিল। তারপর হাসি থামতেই ও জানি বড়দা, আসল কথাটা বলতে তোমার ভদ্রতায় আটকাচ্ছে। ও. কে., আমি বলে দিচ্ছি– ইন্দ্রজিতের দিকে ঘুরল নবনীতা : ওয়েল মিস্টার শার্লক হোমস, আসল ঘটনা হল বাবাকে আমাদের খুব তাড়াতাড়ি ফিরিয়ে আনা দরকার। নইলে টাকার তেষ্টায় আমরা মরে যাব–তিনজনেই বড়দা, ছোড়দা, এবং আমি। বাবা ছাড়া আমাদের টাকার জোগান দেবে কে! কী ছোড়দা, কিছু ভুল বলছি? সুরেন্দ্রর দিকে তাকিয়ে নবনীতা জানতে চাইল। তারপর আবার ইন্দ্রজিৎকে লক্ষ্য করে ও পুলিশের ওপরে আমাদের কনফিডেন্স নেই–তাই প্রাইভেট ডিটেকটিভ। এবার দেখুন চেষ্টা করে, বাবাকে ফিরিয়ে আনতে পারেন কি না! তবে করার চটপট করুন– নইলে যা ড্রাই অবস্থা! মরুভূমির চেয়েও খারাপ…।
