দশরথ একবার চোখ তুলে ঘরে সিলিং-এর দিকে তাকাল। একবার চোখ বুজল। বোধহয় কাউকে কৃতজ্ঞতা জানাল। তারপর শার্লক হোমসের ফটোটাকে প্রায় গড় হয়ে প্রণাম করার চেষ্টা করল।
জিনি নিজের টেবিলটা চটপটে হাতে গুছিয়ে নিল। কম্পিউটারের কী-বোর্ডে খটাখট করে কয়েকটা বোতাম টিপল। তারপর নিজের মেকাপ করতে শুরু করল।
দশরথ শার্লক হোমসের ফটোটা ড্রয়ারে ঢুকিয়ে ফেলল। টেবিলটা টিপটপ করে সাজিয়ে নিল। তারপর নিজের পোশাকটা ঠিকঠাক করে নিয়ে গুছিয়ে বসল।
ইন্দ্রজিৎ ঢুকে গেল ভেতরের ঘরে। নিজের গদিওয়ালা চেয়ারে বসে নতুন একটা সিগারেট ধরাল। তারপর ফিঙ্গারপ্রিন্ট-এর বিষয়ে লেখা একটা মোটা ইংরেজি বই নিয়ে পড়তে শুরু করল।
প্রাইভেট আই ডট কম-এর তিনজনেই প্রথম ক্লায়েন্টের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।
.
সল্টলেকে চার নম্বর ট্যাঙ্কের কাছে চোখ-ধাঁধানো বাড়ি বলতে একটাই–সেন কটেজ। স্যান্ড স্টোন আর গ্রানাইট দিয়ে আধুনিক ধাঁচে তৈরি তিনতলা বাড়ি। দরজা-জানলার মেহগনি কাঠ আর টিন্টেড গ্লাস।
ইন্দ্রজিতের রানি-রং মারুতি ভ্যান বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল ঠিক বিকেল চারটেয়। গাড়ি থেকে নামল ইন্দ্রজিৎ, জিনি আর দশরথ।
মারুতি গাড়ির জানলার কাছে নিজের ছায়া দেখছিল জিনি, মাথার চুল ঠিকঠাক করে নিচ্ছিল। হঠাৎই বাড়িটার দিকে চোখ পড়তে ও একেবার হতবাক হয়ে গেল। ওর ঠোঁট চিরে আবছাভাবে বেরিয়ে এল? ফ্যানটাস্টিক!
দশরথ হেসে বলল, এই অট্টালিকা যদি কটেজ হয়, স্যার, তা হলে হিমালয়কে আপনি উইয়ের ঢিবি বলতে পারেন।
ইন্দ্রজিৎ সামান্য মাথা নাড়ল। চোখ থেকে রে বান সানগ্লাসটা খুলে পকেটে রাখল। তারপর একটা সিগারেট ধরিয়ে বলল, দশরথদা, যা-যা বলেছি মনে আছে তো! তুমি চোখ-কান খোলা রাখবে, কোনও কিছু যেন নজর এড়িয়ে না যায়। ইন্দ্রজিৎ ঘুরে তাকাল জিনির দিকে জিনি, আমি যখন সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করব, তখন তুমি শর্টহ্যান্ডে নোট নিয়ে যাবে। কোনও কথা বাদ না যায়।
জিনি তখনও মুগ্ধ চোখে বাড়িটা দেখছিল। কেমন একটা ঘোরের মধ্যে ও বলল, এটা বাড়ি নয়–স্বপ্ন। এরকম একটা স্বপ্নের বাড়িতে এরকম অঘটন ঘটেছে এটা ভাবা যায় না।
জিনি একটু বেশিরকম স্বপ্ন দেখে-বৈভবের স্বপ্ন। এ-ধরনের স্বপ্ন দেখা বোধহয় ওর শখ।
দশরথ চটপটে গলায় বলল, চলুন স্যার, আমরা তদন্তে নেমে পড়ি। শুধু-শুধু সময় নষ্ট করে লাভ নেই।
পাথর বসানো পথ ধরে বাড়ির সদর দরজার দিকে এগোতে এগোতে ইন্দ্রজিতের কয়েক ঘণ্টা আগের কথা মনে পড়ছিল। যখন মহেন্দ্র সেন ওর ম্যাডান স্ট্রিটের অফিসে এসে হাজির হয়েছিলেন।
মহেন্দ্রকে দেখেই ইন্দ্রজিতের মনে হল, উনি লাখপতি নন–কোটিপতি।
মহেন্দ্রর চেহারা মোটাসোটা, পরনে ধবধবে পাঞ্জাবি আর সরু পাজামা। গা থেকে ভুরভুর করে আতরের গন্ধ বেরোচ্ছে। ডানহাতের আঙুলে মোটা-মোটা চারটে সোনার আংটি। তাতে যথাক্রমে হীরা, চুনি ও পান্না বসানো–চার নম্বর পাথরটা ইন্দ্রজিৎ চিনতে পারল না।
মহেন্দ্রর গলায় সোনার ডগ চেন। বাঁ-হাতের বাহুতে সোনার তাবিজ। তাতেও বড় মাপের তিনটে পাথর।
মহেন্দ্রর বয়েস খুব বেশি হলে পঁয়তাল্লিশ হবে। চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা–সোনারও হতে পারে। মাথায় শতকরা সত্তর ভাগই টাক। থলথলে মুখে ঘাম। দোতলায় সিঁড়ি বেয়ে উঠে হাঁফাচ্ছেন।
ইন্দ্রজিতের অফিসে ঢুকেই মহেন্দ্র জরিপ-নজরে সবকিছু মেপে নিচ্ছিলেন। বোধহয় বুঝতে চাইছিলেন প্রাইভেট আই ডট কম ওঁর সমস্যার সমাধান করতে পারবে কি না।
ইন্দ্রজিতের মুখোমুখি চেয়ারে বসে আরামের একটা সংক্ষিপ্ত শব্দ করলেন মহেন্দ্র। তারপর পকেট থেকে পাঁচশো পঞ্চান্নর প্যাকেট বের করলেন নিজে একটা নিলেন, ইন্দ্রজিৎকেও একটা দিলেন। সুরেলা শব্দ তোলা বিদেশি লাইটার দিয়ে দুজনের সিগারেট ধরালেন।
ইন্দ্রজিৎ ইন্টারকমে জিনিকে ডেকে নিল। জিনি শর্টহ্যান্ডের খাতা আর পেনসিল নিয়ে তৈরি হয়ে বসল। দশরথ তখন দরজার কাছে কান পেতে দাঁড়িয়ে। তদন্তের কৌতূহল ওকে সিটে বসতে দেয়নি।
মহেন্দ্র একটু সময় নিয়ে বলতে শুরু করলেন।
ইন্দ্ৰজিহ্বাবু, আমার বাবা জিতেন্দ্রনাথ বেশ বড়লোক। মানে, লাস্ট ফিনানশিয়াল ইয়ারে আমরা ইনকাম ট্যাক্স দিয়েছি বারো কোটি টাকা। আমাদের কোম্পানির নাম হয়তো আপনি শুনে থাকবেন–সেন কেমিক্যাল প্রোডাক্টস।
ইন্দ্রজিৎ মাথা নাড়ল–নামটা ও শুনেছে। শুধু ও কেন, পশ্চিমবঙ্গের সবাই হয়তো শুনে থাকবে। সেন কেমিক্যাল প্রোডাক্টস দারুণ নামজাদা কোম্পানি।
আপনাদের প্রবলেমটা কী হয়েছে একটু বলবেন?
হ্যাঁ বলছি। ব্যাকগ্রাউন্ডটা না-বললে প্রবলেমটার গুরুত্ব বোঝা যাবে না। একটু থেমে মহেন্দ্র সেন আবার বলতে শুরু করলেন, আমাদের ফ্যাক্টরি দুটো–গড়িয়ায় আর সোনারপুরে। বেশ বড় মাপের ফ্যাক্টরিই বলা যায়। বাবা-ই সবকিছু দেখেন–মানে, দেখতেন। তা ছাড়া লোকজন তো আছেই। আমরা খুব একটা সময় দিতে পারি না।
আমরা মানে!
ছোট করে দুবার কাশলেন মহেন্দ্র। তারপর বললেন, আমরা মানে আমি, আমার ছোটভাই সুরেন্দ্র, আর ছোটবোন নবনীতা। আমরা আমাদের কাজকর্ম, শখ-আহ্লাদ নিয়ে থাকি। সে যাকগে, যা বলছিলাম।
মহেন্দ্রকে বাধা দিল ইন্দ্রজিৎ? একটু আগে আপনি বললেন আপনার বাবা সবকিছু দেখেন– মানে, দেখতেন। দেখতেন বলছেন কেন? এখন কি আর উনি দেখেন না?
