ইন্দ্রজিৎ বেশ খুঁটিয়ে নবনীতাকে দেখছিল। জিনিও। তবে ও বোধহয় নবনীতার সাজগোজ লক্ষ করছিল।
নবনীতার ফরসা সুন্দর চেহারা। টানা-টানা চোখ, শ্যাম্পু করা চুল। চোখের কোলে অল্পবিস্তর দ্রুত জীবনযাপনের ছাপ। পরনে দামি চুড়িদার। গলায় সোনার চেন, কানে সাদা পাথর বসানো দুল–বোধহয় হিরেই হবে। এইসব জাতের বড়লোকেরা কখনও নকল গয়না পরে না। শুধু নকল জীবনের পিছনে ছোটে।
ম্যাডাম, আপনার সঙ্গে আমি পরে ডিটেইলে কথা বলব। আগে জিতেনবাবুর ঘরটা একবার দেখে নিই।
ইন্দ্রজিতের কথার উত্তরে সুন্দর করে হাসল নবনীতা। বলল, আপনার সঙ্গে ডি-টে-ই লে কথা বলতে আমার বেশ ভালো লাগবে। ইউ লুক স্মার্ট। আপনাকে ডিটেকটিভ হিসেবে আমার বেশ পছন্দ হয়েছে। টা-টা…। হাত তুলে আঙুল নাড়ল নবনীতা : আমি দোতলায় আছি দরকার হলেই ডাকবেন। আই উড লাভ টু কাম।
মহেন্দ্র মুখ-চোখ লাল করে চুপচাপ দাঁড়িয়েছিলেন। নবনীতা চলে যাওয়ার পর চাপা গলায় শুধু বললেন, অসভ্য! মডেলিং-এর লাইনে আর কত ভদ্রতা শিখবে! অথচ ওকে নিয়ে মায়ের অনেক আশা ছিল…।
আপনাদের মা-কে দেখছি না। ইন্দ্রজিৎ বলল।
আমাদের মা নেই। প্রায় পনেরো বছর আগে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।
সুরেন্দ্র এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়েছিলেন। এখন একটু ফাঁক পেয়ে বললেন, আমাকে কি এখন থাকতে হবে, ইন্দ্রজিৎবাবু?
ইন্দ্রজিৎ অবাক হয়ে সুরেন্দ্রর দিকে তাকাল। কারণ, গলার স্বর বেশ মেয়েলি। হয়তো সেইজন্যই কম কথা বলেন।
না, আপনি এখন যেতে পারেন–আমি পরে ডেকে নেব।
সুরেন্দ্র চলে যেতেই মহেন্দ্রকে সঙ্গে করে ঘরের ভেতরে পা রাখল ইন্দ্রজিৎ।
ঘরে ঢুকে প্রথমেই যেটা চোখে পড়ে সেটা বিশাল মাপের একটা অয়েল পেইন্টিং। টকটকে লাল সিঁদুর পরা এক মাঝবয়েসি মহিলা। ছবিটা মালা-চন্দনে সাজানো।
আমার মা– । মহেন্দ্র বললেন।
ইন্দ্রজিৎ এবার ঘরটার দিকে মনোযোগ দিল।
বিলাসবহুলভাবে সাজানো প্রকাণ্ড ঘর। ভোমরার শব্দ করে এয়ারকুলার চলছে। দেওয়ালে বিদেশি কোয়ার্জ ঘড়ি। পশ্চিমের রোদ একটা কাচের জানলা দিয়ে ঢুকে পড়ে মার্বেল পাথরের মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। ঘরের বাঁ-দিক ঘেঁষে কারুকাজ করা মেহগনি কাঠের খাট–তাতে ধবধবে সাদা বিছানা।
সেদিকে আনমনাভাবে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আচমকা মহেন্দ্রর মুখোমুখি ঘুরে দাঁড়াল ইন্দ্রজিৎ : আপনার ছোটবোন যা বলে গেল, সে-কথা কি ঠিক? জিতেনবাবু না থাকায় আপনারা টাকার অভাবে কাহিল হয়ে পড়েছেন?
মহেন্দ্র ইতস্তত করতে লাগলেন।
ইন্দ্রজিৎ এয়ারকুলার অফ করে দিল। একটা জানলার পাল্লা সামান্য খুলে দিল। তারপর পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে একটা সিগারেট ধরাল। মহেন্দ্রকে অফার করল, কিন্তু তিনি আলতো করে বললেন, এখন না–পরে।
বলুন, নবনীতা কি ঠিক বলেছেন? আমার কাছে লুকোনোর চেষ্টা করবেন না। ঘরে এয়ারকুলারের ঠান্ডা থাকা সত্ত্বেও মহেন্দ্র পকেট থেকে রুমাল বের করে কাল্পনিক ঘাম মুছলেন। তারপর খানিকটা সময় নিয়ে মাথা নেড়ে বললেন, হ্যাঁ–ঠিকই বলেছে। বেশ কয়েক বছর আগে বাবা একটা এগ্রিমেন্টে করেছিলেন। তাতে আমরা মানে, আমি, সুরেন্দ্র আর নবনীতা মাসে-মাসে একটা ফিক্সড টাকা পাব। তার বাইরে টাকার দরকার পড়লে সেটা বাবার কাছে চাইতে হবে। সেই এগ্রিমেন্টে আমরা সই করেছিলাম না করে উপায় ছিল না।
মহেন্দ্র চুপ করে গেলেন। দুটো হাত সামনে জড়ো করে অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে রইলেন।
ইন্দ্রজিৎ ঘরটা খুঁটিয়ে দেখা শেষ করল। একটা জানলার কাছে গিয়ে বাইরের রাস্তাটা একবার দেখল। তারপর ঘুরে তাকাল মহেন্দ্রর দিকে আপনার বাবার ওপরে কারও রাগ ছিল?
মনে তো হয় না। তবে বিজনেসের ব্যাপারে কোনও জেলাসির ব্যাপার থাকলেও থাকতে পারে।
হুঁ। আসলে আমি কিডন্যাপিং-এর মোটিভটা বুঝতে চাইছি। কিডন্যাপাররা এখনও টাকা চায়নি বলে আমার কেমন সন্দেহ হচ্ছে। আচ্ছা, কিডন্যাপিং-এর সময় কি ধস্তাধস্তি হয়েছিল?
দোতলা থেকে আমি সেরকম কিছু টের পাইনি। তবে আপনাকে বলতে ভুলে গেছি– বাবার বিছানার চাদরে বেশ খানিকটা রক্তের দাগ ছিল।
রক্তের দাগ! ইন্দ্রজিতের শরীরটা চাবুকের মতো টান-টান হয়ে গেল। কোথায় সে চাদরটা? দেখি–
দাঁড়ান, নিয়ে আসছি। বলে মহেন্দ্র চলে গেলেন।
ইন্দ্রজিৎ সিগারেট খেতে-খেতে ভাবছিল। কোটিপতি জিতেন্দ্রনাথের তিন ছেলেমেয়ে। তিনজনেই বোধহয় বড়লোকি চালে আয়েস করতে শিখেছেন। কেউই বিয়ে-থা করেননি। অথচ সবাই খরচ করতে ভালোবাসেন। বাবা কিডন্যান্ড হয়েছেন বলে কারওরই তেমন দুশ্চিন্তা নেই। একমাত্র দুশ্চিন্তা খরচের টাকা পাওয়া-না-পাওয়া নিয়ে। নবনীতার কথাগুলো হয়তো রূঢ়, কিন্তু মনে হয় না ও একবর্ণও মিথ্যে বলেছে।
সিগারেটের শেষ-হয়ে-আসা টুকরোটা ইন্দ্রজিৎ জানলা দিয়ে ছুঁড়ে দিল বাইরে।
এমনসময় মহেন্দ্র চাদর নিয়ে ফিরে এলেন সঙ্গে দশরথ ও পরান।
দশরথ ইন্দ্রজিতের কাছে এসে চাপা গলায় বলল, স্যার, আমি একটু বাড়ির চারপাশটা ঘুরে দেখছিলাম–মানে, ইনভেস্টিগেট করছিলাম আর কি! আড়চোখে সন্দেহ এবং আশঙ্কার নজরে মহেন্দ্রকে কয়েকবার দেখল দশরথ, আপনি একা একটু পরানের সঙ্গে কথা বলুন। ওর কাছে প্রচুর মেটিরিয়াল আছে। ডক্টর পঞ্চানন ঘোষাল তার অপরাধ-বিজ্ঞান বইতে বলেছিলেন, ইনভেস্টিগেশানে বাড়ির কাজের লোকদের রোল খুব ভাইটাল। আমি আপনার হয়ে পরানকে একটু-আধটু কোশ্চেন করছিলাম….।
