দশরথের পাঁচালি শুনতে-শুনতে ইন্দ্রজিতের মাথা ঘুরতে শুরু করেছিল। ও কোনওরকমে বৃদ্ধ মানুষটিকে থামিয়ে বিদায় দিয়েছে। এবং পরে ঠান্ডা মাথায় অনেক বিচার-বিবেচনা করে তাকেই অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার দিয়েছে।
প্রাইভেট আই ডট কম-এর অফিস ম্যাডান স্ট্রিটে দুটি মাঝারি মাপের ঘর নিয়ে আধুনিকভাবে সাজানো।
বাইরের ঘরটা রিসেপশন গোছের। একপাশে বড় টেবিলে পার্সোনাল কম্পিউটার নিয়ে বসে আছে জিনি রায়। ও একইসঙ্গে রিসেপশনিস্ট, টাইপিস্ট এবং ইন্দ্রজিতের সেক্রেটারি। বয়েস বাইশ চব্বিশ হবে। ফরসা রোগা চেহারা। মুখের তুলনায় চোখ দুটো বেশ বড় মাপের। ঠোঁটে গাঢ় চকোলেট রঙের লিপস্টিক। চোখের পাতার ওপরে হালকা রঙের আস্তর। আর পারফিউমের সুগন্ধ ওকে চাদরের মতো জড়িয়ে রয়েছে।
ভগবান জিনিকে রূপ দিয়েছেন–তবে বুদ্ধির বিনিময়ে। কিন্তু তাতে জিনির কোনওরকম দুঃখ আছে বলে মনে হয় না। ও সবসময় নিজের সাজগোজ নিয়েই ব্যস্ত। অফিস ছুটির পর ওকে দিয়ে একটি মিনিটও ওভারটাইম করানো যায় না। হাবভাব দেখে মনে হয়, বিশাল বড়লোকের মেয়ে চাকরি করছে নেহাতই সময় কাটানোর জন্য। কিন্তু আসলে তা নয়।
জিনির মুখোমুখি চেয়ার-টেবিল নিয়ে বসে আছে দশরথ। শার্লক হোমস অমনিবাস পড়তে পড়তে ওর বারবার হাই উঠছিল। বিনা কাজে এভাবে বসে থাকা যায়! সক্রিয় তদন্তের কোনও সুযোগ নেই। শুধু বিশ্রাম। মাইনেটাই কি সব!
দশরথ বই বন্ধ করে একটা ড্রয়ারে ঢুকিয়ে রাখল। তারপর ল্যামিনেট করে বাঁধানো একটা ফটো দ্বিতীয় ড্রয়ার থেকে বের করল। ফটোটা টেবিলে সুন্দরভাবে দাঁড় করাল।
দশরথের দেবতা শার্লক হোমসের ছবি।
দশরথ ধূপকাঠি-দেশলাই বের করল ড্রয়ার থেকে। তারপর ধূপ জ্বেলে শার্লক হোমসকে আরতি করল বারকয়েক। কষ্ট করে একটা হাই চেপে বলল আপনমনেই, হে শার্লক হোমস, যে করে তোক একটা কেস এনে কোম্পানিটার বউনি করিয়ে দাও, বাবা।
জিনি একটা ছোট আয়না নিয়ে নিজের মেকাপ ঠিক করায় ব্যস্ত ছিল। একবার আড়চোখে দশরথকে দেখল। তারপর একটা হুঃ শব্দ করে নিজের কাজে মন দিল।
দশরথের আরতি শেষ হতে-না-হতেই ভেতরের ঘরের কাচের দরজা খুলে গেল। বাইরের ঘরে এসে দাঁড়াল ইন্দ্রজিৎ। ডানহাতের আঙুলের ফাঁকে সিগারেট। কপালে ভাঁজ।
জিনির দিকে একপলক তাকিয়ে দশরথের টেবিলের দিকে এগিয়ে এল ইন্দ্রজিৎ, বলল, দশরথদা, আজকের দিনটা গেলে চোদ্দোদিন হবে। চোদ্দোদিন হল অফিস খুলেছি, একটা কেসের খবর নেই। শুধু শো-কেস হয়ে বসে আছি! বাবা প্রথমেই বলেছিল, আমার পয়সা নষ্ট কর ক্ষতি নেই। তবে তোর ওই ডিটেকটিভ এজেন্সি খুলে নষ্ট করিস না। এখন বোঝো ঠ্যালা–।
দশরথ সান্ত্বনা দিয়ে বলল, চিন্তা করবেন না, স্যার। আজ গুরুকে মন-প্রাণ দিয়ে হেভি ডেকেছি। আজ একটা-না-একটা কেস আসবেই। ঘরের ডিজিটাল ক্লকের দিকে একবার তাকিয়েঃ এখনও তো বারোটা বাজেনি।
না, বারোটা বেজে গেছে আমার কোম্পানির। বিরক্তভাবে সিগারেটে টান দিল ইন্দ্রজিৎঃ কী করে তোমাদের মাইনে দেব কে জানে!
জিনি এতক্ষণ সাজগোজ নিয়ে ব্যস্ত ছিল, ওদের কথাবার্তায় বিন্দুমাত্রও ভ্রূক্ষেপ করেনি। কিন্তু ইন্দ্রজিতের শেষ কথাটা কানে যেতেই চট করে ফিরে তাকাল ওর দিকে। করুণ অথচ আদুরে গলায় বলল, মাইনে হবে না! কী বলছেন, স্যার!
ইন্দ্রজিৎ তখন স্বপ্ন-দেখার চোখে ঘরের একটা কাচের জানলার দিকে তাকিয়ে ছিল। আপিন মনেই বিড়বিড় করে বলল, আমাদের কোম্পানি দাঁড়াবেই। দরকার শুধু একটা কেস। জাস্ট একটা কেস।
দশরথ শার্লক হোমসের ফটোর সামনে হাতজোড় করে বলল, প্লিজ, জাস্ট ওয়ান কেস।
ইন্দ্রজিৎ সেদিকে আড়চোখে তাকিয়ে বিষঃ হেসে বলল, তোমার গুরুর বাড়ির ঠিকানাটা কী ছিল মনে আছে, দশরথদা?
মনে নেই আবার! দাঁত দেখিয়ে একগাল হাসল দশরথ ও ২২১বি, বেকার স্ট্রিট।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইন্দ্রজিৎ বলল, ঠিক বলেছ। আমরা একেবারে বেকার হয়ে গেলাম। বেকার– স্ট্রিট বেগার।
দশরথ জ্বলন্ত ধূপকাঠিটা পাশেই একটা জানলার তাকে ধূপদানিতে বসিয়ে দিয়েছিল। ইন্দ্রজিতের শেষ কথাটা শুনেই হাত বাড়িয়ে ধূপদানিটা নিল। আর-একদফা ঘুরিয়ে দিল শার্লক হোমসের ফটোর সামনে। তারপর চোখে-মুখে তীব্র ভক্তি প্রকাশ করে কাঁচুমাচুভাবে বলল, প্রভু, একটা কেস–জাস্ট একটা। তা হলেই…।
ভেতরের ঘরে টেলিফোন বেজে উঠল।
ইন্দ্রজিৎ প্রায় ছুটে গিয়ে টেলিফোন ধরল।
হ্যালো।
হ্যালো, প্রাইভেট আই ডট কম? ভারী গলায় কেউ জানতে চাইল।
ইয়েস।
আমার নাম মহেন্দ্র সেন। সল্টলেকে থাকি। কাগজে আপনাদের অ্যাড দেখেছি। তাই একটা জরুরি ব্যাপারে ফোন করছি। ফ্যামিলির ব্যাপারে একটু আলোচনা ছিল। সেটা আপনাদের অফিসে গিয়ে বলতে চাই। বুঝতেই পারছেন, সিক্রেসিটা খুব ইমপরট্যান্ট।
অবশ্যই, অবশ্যই! আপনি এখনই আমাদের অফিসে চলে আসুন। ঠিকানাটা জানেন তো? পাঁচ নম্বর ম্যাডান স্ট্রিট। দোতলায় সিঁড়ি দিয়ে উঠে ডানদিকে। আমরা আপনার জন্যে ওয়েট করছি।
আপনি কে কথা বলছেন জানতে পারি কি?
আমি এই কোম্পানির চিফ ডিটেকটিভ ইন্দ্রজিৎ চৌধুরী।
মহেন্দ্র সেন ও.কে. বলে লাইন কেটে দিলেন।
ইন্দ্রজিতের বুকের ভেতরে ঢিপঢিপ শব্দ হচ্ছিল। হাতের নিভে যাওয়া সিগারেটটা ও টেবিলে রাখা অ্যাশট্রেতে ফেলে দিল। দু-হাত মুঠো করে কঁকিয়ে উল্লাসের ভঙ্গি করল–ব্যাটসম্যানকে বোল্ড আউট করার পর বোলাররা যেমন করে। তারপর প্রায় নাচতে নাচতে চলে এল বাইরের ঘরে। উত্তেজিতভাবে বলল, জিনি, দশরথদা–চটপট সবকিছু সাজিয়ে-গুছিয়ে নাও। এক্ষুনি আমাদের প্রথম ক্লায়েন্ট আসছেন! কথা শুনে মনে হল লাখপতি কি কোটিপতি হবে। আনন্দে হাতে হাত ঘষল ইন্দ্রজিৎ : আমাদের কোম্পানির প্রথম কেস।
