নিয়ে নিলেন মানে! রামগিরি সামনে থেকে অবাক মন্তব্য ছুঁড়ে দিল পেছনে।
সুকল্যাণদা হাসলেন, বললেন, পুরোনো চেনা লোক…তাই ওকে আমার গাড়ির পাইলট করে নিলাম।
আমি তখন বললাম, এই যে তখন বললেন, যারা গাড়ি জোরে চালায় তাদের আপনি ভীষণ ভয় পান!
হ্যাঁ, ভয় পাই..মানে, পেতাম। কারণ, সুখদেও এখন পালটে গেছে–নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে। বললে পরে কথা শোনে।
কথা আর গল্পে মত্ত ছিলাম বলে খেয়াল করিনি গাড়িটা কখন যেন স্পিড নিয়েছে। জানলার কাচ দিয়ে বাইরের আঁধারে যে-বাতিগুলো দেখা যাচ্ছিল সেগুলো সা-সাঁ করে পেছনে ছুটে যাচ্ছে। গাড়ির ভেতরটা হঠাৎই যেন বেশ ঠান্ডা হয়ে গেছে।
তেজেন ভারী গলায় মন্তব্য করল, এ যে গুরুদেবের শান্তিনিকেতনের মতো ঠান্ডা পড়ে গেল রে।
সুকল্যাণদা হাসতে গিয়ে খকখক করে কাশতে শুরু করলেন। একেবারে ঠান্ডা লাগা কাশি।
আমি জানলার কাচগুলো খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাম। কোথাও ফাঁক-টাক নেই তো!
গাড়ির স্পিড আরও বেড়ে গিয়েছিল। আমি ভয় পেয়ে সুকল্যাণদাকে বললাম, এ কী ব্যাপার দাদা! ব্রিজলাল যে স্লো মোশানে গাড়ি চালায় বললেন!
আগে তো তাই চালাত! পেছন থেকে একটা হেভি ট্রাক ওকে ধাক্কা মারার পর…।
আমি চমকে ব্রিজলালের দিকে তাকালাম। ওর মুখটা ঠাহর করার চেষ্টা করতে লাগলাম।
আমাদের গাড়ি তখন উড়ছে। বাইরের সব আলো অন্ধকারে হলদে রেখা এঁকে চলেছে। আর গাড়ির ভেতরটা আরও ঠান্ডা হয়ে গেছে। স্পিড বাড়ার সঙ্গে-সঙ্গে ঠান্ডাটাও যেন বাড়ছে।
আমি চেঁচিয়ে উঠলাম, ব্রিজলাল!
আমার দিকে যে ফিরে তাকাল সে সুখদেও।
অবাক হয়ে বললাম, এ কী! সুখদেও, তুমি!
আমার মাথা গুলিয়ে যাচ্ছিল। রামগিরি ভয় পেয়ে হায় রাম! বলে চেঁচিয়ে উঠল।
সঙ্গে-সঙ্গে সুখদেও সেলাম ঠুকে বলে উঠল, রাম নাম সত্য হ্যায়।
আমার পাশে তেজেন ভয়ে কাঠ হয়ে আমাকে আঁকড়ে ধরে গুরুদেব! গুরুদেব! করছিল।
সুকল্যাণদা আমার উরুতে আলতো চাপড় মেরে হেসে বললেন, ভয় পাস না, নো-ট্রাম্প। ব্রিজলালও যা সুখদেও-ও তাই। মরার পরে রামে-রহিমে কি আর তফাত থাকে রে! ব্রিজলাল মারা গেল ট্রাক চাপা পড়ে, আর সুখদেও..আমাকে নিয়ে বেদম স্পিডে গাড়ি চালাচ্ছিল…ব্রিজ থেকে আমরা সোজা ছিটকে গেলাম বরাকরের জলে। সব শেষ। তারপর থেকে সুখদেও আমার সবকথা শোনে, আর কেউ জোরে গাড়ি চালালেও আমার আর ভয়-টয় কিছু করে না। মরার পরে আবার ভয় কীসের বল! শুধু ওই বরাকরের জলে থেকে-থেকে ঠান্ডা লেগে এই বিচ্ছিরি কাশিটা হয়েছে।
আমরা তিনজন তখন পাথর। নড়াচড়ার কোনও ক্ষমতা নেই।
সুকল্যাণদা কাশলেন আবার। তারপর হেসে বললেন, শোন, ওই অ্যাকসিডেন্টে মারা যাওয়ার পর থেকে শুধু তেনারাই পালা করে আমার গাড়ি চালায়। ব্রিজলাল, সুখদেও, পরাশর, নরেশ…ওরা সবাই।
কথা শেষ করে হো-হো করে হেসে উঠেছিলেন সুকল্যাণদা। কিন্তু সে-হাসির সবটা আমার শোনা হয়নি। কারণ, বোধহয় ওই হাসির মাঝখানেই সেন্সলেস হয়ে পড়েছিলাম।
রক্তের দাগ ছিল (নভেলেট)
নিজের টেবিলে বসে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে শার্লক হোমস অমনিবাস পড়ছিল দশরথ সামন্ত। সারাটা জীবন ধরে সে ছিল তদন্ত-পাগল কনস্টেবল। বছরপাঁচেক হল রিটায়ার করেছে। রিটায়ার করার সময়েও সে প্রায় কনস্টেবলই ছিল। কারণ, প্রোমোশন সে নেয়নি–নিলে সরাসরি তদন্তের জায়গা থেকে তাকে হয়তো সরে যেতে হত।
চাকরি থেকে রিটায়ার করার পর হঠাৎই একটা ডিটেকটিভ এজেন্সির বিজ্ঞাপন দশরথের চোখে পড়ে। প্রাইভেট আই ডট কম নামের ডিটেকটিভ এজেন্সি একজন বয়স্ক অ্যাসিস্ট্যান্ট চাইছে। তদন্তের অভিজ্ঞতা থাকলে ভালো হয়।
একমুহূর্তও দেরি না করে দশরথ সেখানে অ্যাপ্লাই করেছিল এবং ইন্টারভিউর ডাক পেয়েছিল।
ইন্টারভিউ নিয়েছিল এজেন্সির মালিক ইন্দ্রজিৎ চৌধুরী। বছর তিরিশ-বত্রিশের টগবগে যুবক। লম্বা ফরসা চেহারা। মুখে কোথায় যেন একটা বেপরোয়া ভাব লুকিয়ে রয়েছে।
ইন্টারভিউর সময় দশরথ কাষ্ঠ ইন্দ্রজিৎকে হেসে বলেছিল, সময় মতো প্রোমোশন নিলে আমি স্যার পুলিশ কমিশনার হয়ে রিটায়ার করতে পারতাম কিন্তু করিনি। কারণ, ওই যে বললাম, ডায়রেক্ট তদন্তের প্রতি দুর্দান্ত টান। ঠিক যেন সন্তানের প্রতি মায়ের টান! তদন্ত–মানে, ইনভেস্টিগেশন ছাড়া আমি একটা মোমেন্টও থাকতে পারি না। তদন্ত আমার ধ্যান-জ্ঞান-প্রাণ।
ইন্দ্রজিৎ বেঁটেখাটো বৃদ্ধ মানুষটাকে দেখছিল। কাঁচাপাকা চুল, তোবড়ানো গাল, কালো চওড়া ফ্রেমের চশমা, কপালের বাঁ-দিকে একটা ছোট আঁচিল। বয়েসের ভারে চোখের রং খানিকটা ঘোলাটে হয়ে এলেও তা থেকে চনমনে ভাব উধাও হয়ে যায়নি। তা ছাড়া মাইনে খুব কম শুনেও মানুষটির উৎসাহে বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি।
আমাকে অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিটেকটিভের পোস্টে নিলে আপনি আর-একটা ব্যাপারে মোস্ট বেনিফিটেড হবেন, স্যার। প্রচুর রহস্য-রোমাঞ্চ-গোয়েন্দা কাহিনি আমি গুলে খেয়েছি। আর গত পঞ্চাশ বছর ধরে শার্লক হোমস আমার গুরু, আমার দেবতা। আমার এই এক্সট্রাকারিকুলার অ্যাক্টিভিটি আপনার তদন্তের কাজে হেভি হেল্প করবে, স্যার। যেমন ধরুন, দীনেন্দ্রকুমার রায়, পাঁচকড়ি দে থেকে শুরু করে আজকের তপোজ্যোতি বৰ্মন, হরিহর ধর পর্যন্ত সবার লেখাই আমার নখদর্পণে। যখনই দরকার তখনই আমার কাছ থেকে রেডি রেফারেন্স পেয়ে যাবেন। পাঁচকড়ি দে-র নীলবসনা সুন্দরী কি আপনি পড়েছেন, স্যার? সেখানে…।
