তো যেদিন আমি গাড়ি শেখার জন্যে প্রথম স্টিয়ারিং-এ বসেছি–পাশে কিষাণ–গাড়ি স্টার্ট দিতে যাব–হঠাৎই কিষাণ হাত তুলে আমাকে থামতে ইশারা করল। আমি অবাক হয়ে ওর দিকে তাকাতেই ও বলল, একটা কথা বলি, ছোটবাবু। আমার গুরু প্রথমদিন একথাটা আমায় বলেছিল। আর আমার গুরুকে বলেছিল তার গুরু। কথাটা হল : স্টিয়ারিং-এ বসে সবসময় মনে রাখবেন, কলকাতা শহরে সবাই অন্ধ–শুধু আপনি দেখতে পান। তা হলে আপনার গাড়ি চালাতে সুবিধে হবে।
সুকল্যাণদা হেসে বললেন, দারুণ বলেছে! তবে ভাই যাই বলো, যতই বৃন্দাবন কি কিষাণের কাহিনি বলো, সুখদেও জিনিয়াস। ও যেখানে-যেখানে চাকরি করেছে সেখানকার সবাই ওকে রীতিমতো ভয় পায়–এবং শ্রদ্ধা করে।
তারপর সুকল্যাণদা সুখদেওর আরও কয়েকটা এপিসোড শোনালেন। কবে একবার গাড়ির পেছনের চাকা পাংচার হয়ে যাওয়ার পরেও সুখদেও গাড়িটা প্রায় এক কিলোমিটার টেনে গিয়েছিল। কোন এক ডেপুটি ম্যানেজারকে ঝড়ের বেগে মধ্যমগ্রাম পৌঁছে দেওয়ার পর দ্যাখে ভদ্রলোক সিটে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছেন। এইসব বিপজ্জনক কীর্তি আর কী!
আমরা আড্ডা দিচ্ছিলাম। লক্ষ করলাম, তারই ফাঁকে ফাঁকে সুকল্যাণদা দেওয়াল-ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছেন। কারণ, আটটা বাজলেই আমাদের রওনা হওয়ার কথা। এই গেস্টহাউস থেকে স্টেশন প্রায় একটি ঘণ্টার পথ। তারপর কলকাতার ট্রেন।
মিনিট-পনেরো সময় তখনও হাতে ছিল। সুকল্যাণদা কেয়ারটেকার ছেলেটিকে বলে আর এক রাউন্ড কফির ব্যবস্থা করলেন। বললেন, নে, সব মেন্টালি রেডি হয়ে নে। তোরা এসে তিনটে দিন আমার দারুণ জমিয়ে দিলি।
আমি জিগ্যেস করলাম, দাদা, এখন যে স্টেশনে রওনা হব, তো গাড়ি চালাবে কে?
সুকল্যাণদা বুঝলেন যে, সুখদেওর ভূত এখনও আমার মাথা থেকে যায়নি। তাই হেসে বললেন, কোনও চিন্তা করিস না, বাপ। তোদের জন্যে একজন দারুণ ড্রাইভার ফিট করেছি। একেবারে স্লো-মোশানে গাড়ি চালায়। দারুণ হাত। চেষ্টা করলেও ওকে দিয়ে কোনও অ্যাকসিডেন্ট করাতে পারবি না। নাম ব্রিজলাল।
রামগিরি নতুন একটা বিড়ি ধরিয়ে বলল, স্লো গাড়ি চললে আমার থোড়া বোরিং লাগে। লেকিন ঠিক আছে, আর সোকোলের সোয়ার্থে সহ্য করে নেবে।
আহা! কী দয়ালু! আর কী বাংলা!
আমি ওকে বাংলার জন্যে বাহবা দিলাম। ব্যাটা আওয়াজটা বুঝতেই পারল না–হেঁ-হেঁ করে হেসে কমপ্লিমেন্টটা নিল।
সুকল্যাণদা তাড়া দিলেন। আর সঙ্গে-সঙ্গে বাইরে থেকে গাড়ির প্যা-প্যা হর্ন শোনা গেল।
আমরা তৈরিই ছিলাম। যার-যার মালপত্র, গাঁটরি, পুঁটলি নিয়ে গেস্টহাউসের বাইরে এলাম।
বাব্বা! কী শীত! সেইসঙ্গে ব্যাপক কুয়াশা আর ঝিঁঝির ডাক।
একটা সাদা রঙের অ্যাম্বাসাডর নুড়ি-ঢালা চত্বরে দাঁড়িয়ে ছিল। তার ঘোলাটে হেডলাইট জ্বলছে। স্টিয়ারিং-এ যে কেউ একজন বসে আছে সেটুকু বোঝা যাচ্ছে।
আমরা তাড়াতাড়ি পায়ে শীত ডিঙিয়ে গাড়িতে গিয়ে উঠলাম। রামগিরি সামনে বসল। আর পেছনে একটা জানলার ধারে সুকল্যাণদা, ওঁর পাশে আমি, তারপর তেজেন।
শীত ঠেকাতে আমরা তিনজন সোয়েটার, কোট, মাফলার, চাদর জড়িয়ে বেশ মোটাসোটা হয়ে গেছি। দেখলাম, ড্রাইভার ব্রিজলালও মোটামুটি মাফলার কম্বলের স্তূপ। মাথায় মাংকি ক্যাপটা এতটাই কপালে নামানো যে, একটা ভাল্লুক-ভাল্লুক ভাব এসে গেছে।
সুকল্যাণদা রোগা চেহারার মানুষ। তা ছাড়া এখানে কয়েক বছর থেকে মোটামুটি মানিয়ে নিয়েছেন। তাই ওঁর গায়ে শীতের আয়োজন আমাদের চেয়ে অনেক হালকা।
শীতের জন্যে গাড়ির কাচ-টাচ সব তোলা ছিল। সুকল্যাণদাকে বললাম, এই একঘণ্টা সিগারেট ছাড়া আপনার তো অসুবিধে হবে।
তাতে সুকল্যাণদা হেসে বললেন, না রে, নো-ট্রাম্প, নো প্রবলেম। এখন সবই কমবেশি মানিয়ে নিয়েছি।
গাড়ি স্টার্ট দিয়েছিল। চাকার নীচে নুড়ির খড়মড়-খড়মড় শব্দ হচ্ছিল। তারপর গেস্টহাউসের কম্পাউন্ড পেরিয়ে যেতেই মসৃণ পিচের রাস্তা।
আমরা নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলাম। হঠাৎই সুকল্যাণদা গাড়ির মধ্যে একটা বোমা ফাটাল। বললেন, তোদের আগে বলিনি সুখদের সঙ্গে আমার হীরাপুরে দেখা হয়েছিল।
সে কী! আঁতকে উঠলাম আমি।
হ্যাঁ রে। দেখি ছেঁড়া জামাকাপড়, মুখে খোঁচা-খোঁচা দাড়ি। আমাকে দেখেই স্যার, কেমোন আছেন? বলে সেলাম ঠুকল। সুকল্যাণদা কয়েকবার কাশলেন। তারপর ও আমি ওকে বললাম, কীরে, তোর এ অবস্থা কেন? তাতে ও বলল…।
জোরে বেপরোয়া গাড়ি চালানোর দোষে সুখদেও নাকি কোথাও টিকতে পারেনি। শেষ যে কোম্পানিটায় চাকরি করত তার এক এক্সিকিউটিভ নাকি একদিন গাড়িতে বসে ভুল করে বলে ফেলেছিলেন, এই রে, ফাইলটা বোধহয় বাড়িতে ফেলে এসেছি। ব্যস, আর যায় কোথায়! সঙ্গে-সঙ্গে গাড়ি ঘুরিয়ে সুখদের রাজধানী এক্সপ্রেস শুরু হয়ে গেছে। সুখদেও যখন সাড়ে সাত মিনিটে আট কিলোমিটার পথ পেরিয়ে তার বাড়িতে পৌঁছোয় ততক্ষণে ভদ্রলোকের বেশ বড় রকমের একটা স্ট্রোক হয়ে গেছে। আর তারপরই সুখদেওর চাকরি নট। সুতরাং ও তল্পিতল্পা নিয়ে দেশে চলে এসেছে। ওর দেশ মোতিহারি। কদিন হল দেশ থেকে এখানে হীরাপুরে এক চাচার কাছে নোকরির সন্ধানে এসেছে।
আমাকে দেখে সুখদেও তো মহা খুশি। ওর সেলাম আর থামতেই চায় না। তো ওকে দেখে আমার কেমন যেন মায়া হল। ফলে নিয়ে নিলাম।
