গাড়িতে বসে সে কথাটাই বোধহয় দুজনে আলোচনা করছিলাম। হঠাৎই গাড়িটা এক হ্যাঁচকা মেরে গা ঝাড়া দিয়ে বনবন করে ছুটতে শুরু করল।
সে ছোটা কাকে বলে!
পরপর গাড়ি ওভারটেক করে, বাস-ট্রামের ফাঁকফোকর দিয়ে গলে, সাইকেল ভ্যান আর অটোকে কিস করে সুখদেও যেন বুলেটের বেগে পক্ষীরাজ ঘোড়া ছুটিয়ে দিয়েছিল।
পেছনের সিটে লেপটে শুয়ে সুকল্যাণদা সুখদেও! সুখদেও! বলে মিহি চিৎকার করছিলেন। কিন্তু ওইটুকুই! তার পরে তিনি সুখদেওকে ঠিক কী যে বলতে চাইছিলেন সেটা আমি জানি না। কারণ, ওঁর মুখ দিয়ে আর কোনও কথা বেরোচ্ছিল না।
আমার অবস্থাও তখন হয়েছিল সুকল্যাণদার মতোই। পেছনের সিটে কাত হয়ে পড়ে গিয়ে হাসপাতালের ইমার্জেন্সির পেশেন্টের মতো ইষ্টনাম জপছি। চোখ-কান খোলা, কিন্তু বডিটা ডেডবডির মতন।
অন্যান্য বাস-গাড়ির ড্রাইভারদের মুখ খিচুনি দেখে বুঝতে পারছিলাম ওরা প্রাণভরে সুখদেওকে গালিগালাজ করছে, ওর পিণ্ডি চটকাচ্ছে।
কিন্তু সুখদেও যেন হিমালয়ের সন্ন্যাসী। হাজার গালাগালের ঊর্ধ্বে। ওর আর কোনও দিকে ধেয়ান নেই মনে শুধু একটিই চিন্তা ও আমাদের যেন লেট না হয়।
না, সেবার ইডেনে আমাদের লেট হয়নি।
দুটো গাড়ির হেডলাইট, একটা অটোর ব্যাকলাইট, আর আমাদের গাড়ির ডানদিকের হেডলাইট ভেঙে সুখদেও আমাদের পৌঁছে দিল ইডেনে। গাড়িটা জায়গামতো পার্ক করে দু-হাতে তালি দিয়ে হাত ঝাড়ল, বলল, লিন, স্যার, একদম টাইমে পৌঁছে দিয়েছি। শচীনের ব্যাট একেবারে স্টার্টিং থেকে দেখতে পাবেন।
আর শচীনের ব্যাট! আমি আর সুকল্যাণদা তখন সরষে ফুল দেখছি। সমস্ত গাঁটের খিল খুলে যাওয়া হাত-পাগুলোকে কোনওরকমে জড়ো করে গাড়ি থেকে নেমেছি। সুকল্যাণদা ভয় পাওয়া চোখে সুখদেওর পাকানো গোঁফের দিকে তাকিয়ে সরু গলায় বললেন, তুমি গাড়ি নিয়ে চলে যাও– আমরা ট্যাক্সি নিয়ে ফিরব।
সুখদেও অবাক হলেও কোনও কথা না বলে সেলাম ঠুকে চলে গিয়েছিল।
আমার মুখে সুখদেওর কাহিনি শুনে তেজেন তো হেসেই কাহিল! রামগিরি বিড়িতে দু তিনটে টান দিয়ে বলল, ও কি আর অ্যায়সেই গাড়ি তেজ চালিয়েসে! তোমাদের লেট হয়ে যাচ্ছে শুনতে পেয়ে তোমাদের ভালোর জন্যে একটু স্পিড় দিয়েছে।
একটু স্পিড! রামগিরি তো ও কথা বলবেই। দেশোয়ালি ভাই যে! তা ছাড়া রামগিরি সাহসী ছেলে। আমাদের মতো হাইস্পিডে গাড়ি চড়তে ভয় পায় না। ওর বাবা মিলিটারিতে ছিলেন।
সুকল্যাণদা বললেন, ওঃ, সুখদেওকে নিয়ে আমার যা প্রবলেম গেছে! অফিসের কোনও মিটিং-এ রওনা হওয়ার সময় ভুলেও কখনও বলতাম না যে, দেরি হয়ে যাবে। কারণ, ও একবার শুনতে পেলেই সর্বনাশ। বরং বানিয়ে বানিয়ে বলতাম : ওঃ, আজ বড্ড তাড়াতাড়ি রওনা হলাম। অত আগে মিটিং-এ পৌঁছে কী করব!
সে কথা শুনে সুখদেও গুনগুন করে গান ভাঁজত আর আরামে গাড়ি চালাত। আর মাঝে মাঝে পেছন ফিরে আমাকে বলত, স্যার, আপকো লেট তো নহি হোগা? আমি বলতাম, না রে, বাবা, না। তুই আরামে চালা…।
সুখদেওর চেহারাটা মনে পড়ে গেল আমার।
বেশ রোগা, তামাটে রং, ইয়া গোঁফ, মুখটা লম্বাটে। খইনি খেয়ে সামনের দাঁতে ছোপ পড়ে গেছে। মাথায় কদমছাঁট চুল। তার ভেতর থেকে উঁকি মারছে মিডিয়াম টিকি।
তবে সুখদেও যত জোরেই গাড়ি চালাক, ওর হাসিটা ছিল ভীষণ সরল, সুন্দর। ও কথায় কথায় সবাইকে সেলাম ঠুকত, আর গাড়ির প্রতিটি সওয়ারিকেই স্যার অথবা ম্যাডাম বলত।
সুখদেওর কাহিনি শুনে তেজেন গম্ভীরভাবে গলাখাঁকারি দিল। তারপর গুরুগম্ভীর গলায় বলল, যাই বলুন, সুকল্যাণদা–ড্রাইভিং মোটেই সহজ নয়।
তেজেনের কথা বলার ঢঙে একটা রবীন্দ্রসঙ্গীত গোছের ভাব আছে। ও যে আড়ালে আবডালে সঙ্গীত সাধনা করে সেটা আমরা জানি। আর রবীন্দ্রনাথকে সবসময় ও গুরুদেব বলে।
তেজেন বলল, আমি একসময় ড্রাইভিং শিখতাম…শোভন জানে। তখন ভেবেছিলাম, ট্যাক্সি ম্যাক্সি চালাব–পরে সেটা আর হয়নি। যাই হোক, শিখতাম যার কাছে, তার নাম ছিল বৃন্দাবন। খুব শান্ত টাইপের, ধার্মিক মানুষ, টকটকে ফরসা গায়ের রং। তো গাড়িতে ওকে পাশে বসিয়ে ভোরবেলা ভি. আই. পি. রোডে গিয়ে প্র্যাকটিস করছি…প্রথম দিন। রাস্তা ফাঁকা ছিল বলে হেভি স্পিডে গাড়ি চালাচ্ছি…জানলা দিয়ে হু-হু করে হাওয়া ঢুকছে। হঠাৎই পাশ থেকে বৃন্দাবন খুব শান্ত গলায় বলে উঠল : ভাইয়া, ওতনাহি জোরসে গাড়ি চালাবেন যেটা রুকতে পারবেন। ব্যস, ভুস করে গাড়ির স্পিড কমিয়ে দিলাম। তারপর থেকে জোরে কখনও গাড়ি চালালেই আমার বৃন্দাবনের কথাটা মনে পড়ে যায়। সুতরাং, যত জোরেই গাড়ি চালাও, থামাতে জানা চাই…।
রামগিরি মাথা নেড়ে তেজেনকে সায় দিল ও তেজেন কারেক্ট কথা বলেছে, সুকল্যাণদা। যত স্পিডেই চালাও রুকতে জানা চাই। আমাদের লাইফও তাই যত স্পিডেই চালাও থামতে জানা চাই।
সর্বনাশ করেছে। সুযোগ পেলেই রামগিরির একটু-আধটু দর্শন-বাতিক আছে–যদিও ও পড়াশোনা করেছে কেমিস্ট্রি নিয়ে। এই আড্ডার মাঝে জ্ঞানের বুলি আর ভাল্লাগে না।
তাই রামগিরির দর্শনকে ঠেকা দিতে তড়িঘড়ি বলে উঠলাম, সুকল্যাণদা, গাড়ি চালানো শেখানোর সময় আমাকেও একজন ড্রাইভার দারুণ একটা কথা বলেছিল। তখন বাবা বেঁচে ছিল। আমাদের একটা কালো রঙের ফিয়াট ছিল। কিষাণ সেই গাড়িটা চালাত। বাবাকে ও জান দিয়ে ভালোবাসত।
