আমার জায়গায় আপনি থাকলে যা করতেন আমি ঠিক তাই করলাম। ঝুঁকে পড়ে একটা কংক্রিটের স্ল্যাব হাতে তুলে নিলাম। শক্ত মুঠোয় ওটা আঁকড়ে ধরে একটা লাইটপোস্টের পাশে শরীরটা আড়াল করে দাঁড়ালাম। বারদুয়েক হাত দুলিয়ে স্ল্যাবটার ওজন পরখ করলাম। যথেষ্ট ভারী।
তারপর অপেক্ষা করতে লাগলাম।
একটু পরেই টের পেলাম, খিদের বাঘটা আবার দাপাদাপি করছে। চাপা তর্জন-গর্জন শুরু করে দিয়েছে।
এই রাস্তাটা নির্জন হলেও কেউ না কেউ এ-পথে হেঁটে আসবে। হয় এখনই, নইলে কিছুক্ষণ পর।
লোকটা কাছাকাছি এলেই লাইটপোস্টের আড়ালে ঘাপটি মেরে থাকা এই ভুখা মানুষটা আচমকা সেই লোকটার সামনে গিয়ে দাঁড়াবে। তারপর সমস্ত নীতিকথা ভুলে কংক্রিটের স্ল্যাবটা উঁচিয়ে ধরবে শূন্যে। এবং প্রবল গতিশক্তিতে সেটা আছড়ে দেবে সেই পথচারীর মাথায়। নিরীহ মানুষটা হয় অজ্ঞান হয়ে যাবে, নয়তো মরেই যাবে। তারপর তার পকেট হাতড়ে…।
ওই তো, দূরে একটা লোক হেঁটে আসছে–একা!
ঠিক কতটা জোরে মাথায় মারলে ওই লোকটা অজ্ঞান হতে পারে আমি জানি না। লোকটা হয়তো মরেও যেতে পারে। কারণ, কংক্রিটের এই স্ল্যাবটা অস্ত্র হিসেবে মারাত্মক। আর এরকম অস্ত্র ব্যবহার করার কোনওরকম অভিজ্ঞতা আমার নেই।
বেশ বুঝতে পারছি, ঈশ্বর চাইছেন, এই সময় একটা মারাত্মক দুর্ঘটনা এই রাস্তায় ঘটে যাক। কিন্তু তাই বলে একটা সম্পূর্ণ অচেনা নিরীহ লোক এভাবে প্রাণ দেবে?
আমার মনে দোলাচল শুরু হল। আমি কি ঠিক করছি?
একবার মনে হল, ঠিক করছি। এটা একজন ভুখা মানুষের লড়াই। কিন্তু তারপরই মনে হল, না, এটা ঠিক নয়–এটা পাপ।
আপনি হলে কী করতেন বলুন তো?
তাড়াতাড়ি বলুন। লোকটা কাছে এসে গেছে।
আমি কংক্রিটের স্ল্যাবটা মরিয়া ঢঙে আঁকড়ে ধরলাম। তারপর…।
যারা গাড়ি জোরে চালায়
তাদের আমি ভীষণ ভয় পাই। সুকল্যাণদা হাত মুঠো করে সিগারেটটা পাকড়ে ছিলেন।
কথাটা বলেই শোঁ-শোঁ শব্দে দুটো ভীম টান দিলেন। তারপর ঘরের সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে ফুরফুর করে ধোঁয়া বের করলেন অনেকক্ষণ ধরে। ছোট করে বারতিনেক কেশে নিয়ে আমাদের তিনজনের দিকে চোখ নাচিয়ে তাকালেন। যার অর্থ হল : তোরা কি ভয় পাস?
হ্যাঁ, আমি ভয় পাই। তাতে কেউ আমাকে কাপুরুষ ভাবলেও কোনও ক্ষতি নেই। যারা গাড়ি জোরে চালায় তাদের আমি সত্যিই ভীষণ ভয় পাই। ওই সুকল্যাণদার মতোই।
হাড় কাঁপানো শীতে চাদর মুড়ি দিয়ে আমাদের আড্ডাটা দারুণ জমে উঠেছিল। চা কফি আর ফিঙ্গার চিত্স খেতে-খেতে হাজার কথার ফুলঝুরি ছোটাচ্ছিলাম আমরা। মনেই হচ্ছিল না, কলকাতা থেকে বহুদূরে হীরাপুরের গেস্টহাউসে বসে আছি।
কথায় আছে, পৃথিবীর যে-কোনও শহরে তিনটে বাঙালি কোনওরকমে একজোট হলেই সেটাকে কলকাতা বানিয়ে দেয়। এখানেও যেন তাই। কিন্তু আজ আমাদের আড্ডার শেষ দিন। আর ঘণ্টাখানেক পরেই রওনা হতে হবে কলকাতার ট্রেন ধরার জন্যে।
সুকল্যাণদার অফিস হীরাপুরে। ওঁদের কোম্পানি খনির কীসব যন্ত্রপাতি যেন তৈরি করে। বেশ বাঘা কোম্পানি। সুকল্যাণদাকে অনেক টাকার অফার দিয়ে কলকাতার এক ঘ্যাম কোম্পানি থেকে ছিনিয়ে এনেছে। আর আমাদের তাস খেলার টিমটার বারোটা বেজে গেছে। কারণ, আমরা চারজন ছিলাম যাকে বলে তাসতুতো ভাই।
এবারে শীতের শুরুতে সুকল্যাণদা আমাদের তিন মক্কেলকে নেমন্তন্ন করেছিলেন। ফোন করে তিনজনকেই বলেছিলেন, বুঝলে ভাই, কবে আছি কবে নেই তার কোনও ঠিক নেই। একটু খোঁজও তো নাও না, দাদা কেমন আছে! এখানে চলে এসো। দিব্যি আড্ডা দেবে, চিকেন কোর্মা কি মাটন কষা খাবে–আর চারজনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্রিজ খেলব। আসা চাই কিন্তু! তোমাদের ভীষণ দেখতে ইচ্ছে করছে।
তো আমরা তিনজনেই গিয়ে হাজির হয়েছি রামগিরি, তেজেন আর আমি।
আমরা তিন মক্কেল উত্তর কলকাতার কাছাকাছি থাকি। একই ব্যাচে মর্নিং কলেজে পড়েছি। পরে ছোটখাটো চাকরিবাকরিতে ঢুকলেও তাসের আড্ডায় হাজিরা দেওয়াটা বন্ধ করিনি। সেখানে সুকল্যাণদা ছিলেন আমাদের মধ্যমণি।
কথায় কথায় কী করে যেন আড্ডায় মোড় ঘুরে গিয়েছিল গাড়ি আর ড্রাইভারের দিকে। তখনই সুকল্যাণদা ওপরের মন্তব্যটি করেছেন। এখন তারই জের ধরে আমার দিকে আঙুল তুলে বললেন, নো-ট্রাম্প, তোর সুখদেওকে মনে আছে? সেই যে, আমরা একবার ইডেনে ওয়ান ডে দেখতে গিয়েছিলাম…।
ওরে ব্বাবা! মনে নেই আবার!
আমার নাম শোভন। কিন্তু ব্রিজ খেলতে বসলেই সবসময় আমার নো-ট্রাম্প কল করার ঝোঁক চাপে। তাই সুকল্যাণদা আমার নাম দিয়েছেন নো-ট্রাম্প।
আমার কথায় রামগিরি আর তেজেন অবাক হয়ে জিগ্যেস করল, কী ব্যাপার? কী ব্যাপার?
রামগিরি অবশ্য ব্যাপার বলতে পারে না বলে বেপার। অথচ ওর ধারণা কলকাতায় বহুদিন কাটিয়ে ও বাংলায় একদম চোস্ত হয়ে গেছে।
সিনেমার মতো সুখদেওর ঘটনাটা মনে পড়ে গেল। মনের কোন কোণে লুকিয়ে ছিল কে জানে! চট করে ভেসে উঠল।
সুকল্যাণদা সবসময় অফিসের গাড়ি পেতেন। সেই গাড়ি চালাত সুখদেও। বছর তিনেক আগে আমি আর সুকল্যাণদা ইডেনে ইন্ডিয়া-অস্ট্রেলিয়ার ওয়ান ডে দেখতে গিয়েছিলাম। তৈরি হয়ে বেরোতে একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল বলে আমরা বেশ চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম। যদি ইন্ডিয়া টসে জিতে ব্যাট নেয় তা হলে শচীনের ব্যাট শুরু থেকে দেখা যাবে না।
