আমাকে দশটা টাকা দেবেন? আমার…আমার ভীষণ খিদে পেয়েছে।
দশ টাকা! এক টাকা দু-টাকায় হবে না! লোকটা চোখ কপালে তুলে কথাগুলো বলল। তারপর আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখল ও চেহারা দেখে তো বেশ বড়লোক টরলোক মনে হচ্ছে! হঠাৎ ভিক্ষের লাইন ধরলে কেন, ওস্তাদ?
আমি আমার অদ্ভুত দুর্ঘটনার কথা বললাম। বললাম যে, আমি সবকিছু ভুলে গেছি, আমার সর্বস্ব খোয়া গেছে, আর অসহ্য খিদেয় আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি।
ভুরু কপালে তুলল লোকটা। শব্দ করে একটা সেঁকুর তুলল। মদের গন্ধের ঝাপটা ছিটকে এল আমার নাকে। গা গুলিয়ে উঠল।
লোকটা জড়ানা উচ্চারণে বলল, স্টোরিলাইনটা দারুণ কেঁদেছ, ওস্তাদ। মাশাআল্লা! ফিলিম লাইনে গেলে তোমার তরক্কি ঠেকায় কোন শালা! কিন্তু গুরু, আমার পকেট তো ফাঁকা। একেবারে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড। সরি, গুরু…।
কথাগুলো বলতে-বলতে লোকটা হাঁটা দিল। একবার পেছন ফিরে তাকিয়ে আমাকে হাত নেড়ে টা-টা করল।
আমি ডানহাতের চেটোটা মুখের ভেতরে পুরে দিয়ে হালকা কামড় বসালাম। ব্যথা লাগছে।
আচ্ছা, এই ব্যথাটা যদি কষ্ট করে সহ্য করতে পারি তা হলে নিজের একটা আঙুলের ডগা কি চিবিয়ে খেয়ে ফেলা যায়?
নাঃ, এটা ভাবা সহজ, কিন্তু কাজে করা কঠিন।
আমি পাগলের দৃষ্টিতে এপাশ-ওপাশ তাকালাম। একটু দূরেই চোখে পড়ল আবর্জনার স্তূপ। ওর মধ্যে ঘাঁটাঘাঁটি করলে কি কোনও এঁটো খাবারের টুকরো পাওয়া যাবে?
ব্যাপারটা ভাবতেই গা ঘিনঘিন করে উঠল। আমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে! এই আবর্জনা থেকে খাবার খুঁটে খাব আমি? আমি!
হাঁটতে-হাঁটতে আরও খানিকটা পথ পেরিয়ে গেছি। হঠাৎই চোখে পড়ল একটা রাস্তা বাঁ দিকে ঢুকে গেছে। নির্জন ফাঁকা রাস্তা। এখানে-সেখানে লাইটপোস্টের আলো ছিটকে পড়েছে। রাস্তার মাঝে দুটো নেড়ি কুকুর কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে।
কিন্তু দুরে দুটো ছায়াকে দেখা যাচ্ছে না? এদিকেই এগিয়ে আসছে!
আমি বাঁ-দিকের রাস্তাটায় ঢুকে পড়ে ফুটপাথে দেওয়াল ঘেঁষে দাঁড়ালাম। দম বন্ধ করে অপেক্ষা করতে লাগলাম। ওরা আমার দিকেই এগিয়ে আসছে।
আমার ভয়ংকর খিদে আমাকে দিয়ে নানান বাজে চিন্তা করাচ্ছিল। আর সেই চিন্তাগুলোর সঙ্গে লড়াই চালাচ্ছিল আমার বিবেক। আমাকে বারবার বোঝাচ্ছিল, আমি একজন ভদ্রলোক, এই শহরের একজন আইন-মেনে-চলা নাগরিক, আমার হয়তো বউ আছে, ছেলে-মেয়েও আছে–শুধু দোষের মধ্যে আমার স্মৃতি মুছে গেছে। কিন্তু তা হলেও আমি একজন ভদ্রলোক–এবং ভদ্রলোকই থাকতে চাই।
বেশ বুঝতে পারছিলাম, লড়াইয়ে বিবেক ক্রমশ কাবু হয়ে পড়ছিল। আর নিঃশব্দ চিৎকারে বাঁচাও! বাঁচাও! বলছিল বারবার।
ওরা খুব কাছে এসে পড়তেই আমি ফুটপাথ থেকে নেমে ওদের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।
একটা ছেলে আর একটা মেয়ে। বয়েস আটাশ থেকে তিরিশের মধ্যে। বোধহয় প্রেমিক প্রেমিকা।
ছেলেটার চোখে চশমা, লম্বা, রোগা, তবে মেয়েটা যৌবনময়। পরনে ছাপা চুড়িদার।
আমাকে আচমকা মুখোমুখি আবিষ্কার করে ছেলেটা ভয় পেয়ে গেল। চশমার কাচের পেছনে ওর চোখ বড়-বড় হল।
মেয়েটা ছেলেটার গায়ে লেপটে গিয়ে ওর হাতের ডানা আঁকড়ে ধরল।
আমি ওদের আশ্বস্ত করার জন্যে বললাম, প্লিজ, ভয় পাবেন না। আমাকে কিছু টাকা দিতে পারেন? দশ-বিশ টাকা হলেও চলবে…।
আমার চোখে ওরা কী দেখল কে জানে! মেয়েটা হাউমাউ করে চিল-চিৎকার শুরু করল। আর ছেলেটা পাগলের মতো ছুট লাগাল বড় রাস্তার দিকে।
আমি কী করব ভেবে না পেয়ে তাড়াতাড়ি পা চালালাম। এই রাস্তাটা কোনদিকে গেছে কে জানে!
পেছন থেকে মেয়েটার চিৎকার শুনতে পেলাম, ওই যে, পালিয়ে যাচ্ছে! ভদ্রভাষায় টাকা ছিনতাই করতে এসেছে।
পেছন ফিরে দেখি কুঁজো হয়ে দাঁড়ানো একটা মোটা মতন লোক মেয়েটার কাছে দাঁড়িয়ে ওর কথা শুনছে।
আমি ভয় পেলাম। আর দেরি না করে ছুট লাগালাম।
অচেনা রাস্তায় ছোটাছুটি করে এ-গলি সে-গলি করে একটা নির্জন রাস্তায় এসে ফুটপাথে বসে পড়লাম। ফোঁস-ফোঁস করে নিশ্বাস পড়ছে, বুকটা হাপরের মতো ওঠা-নামা করছে। আর পেট? পেট হিংস্র বাঘের মতো মাথা ঝাঁকাচ্ছে আর ঘাঁও! ঘাঁও! করে গর্জন করছে।
আমার কান্না পেয়ে গেল। এখন আমি কী করি! কী করলে আমি দু-মুঠো খেতে পাব?
কাঁদতে কাঁদতেই এপাশ-ওপাশ তাকালাম।
রাত হয়তো এগারোটা পেরিয়ে গেছে। রাস্তায় হাতে গোনা লোক। আমি ওদের দিকে ঈর্ষাতুর চোখে চেয়ে আছি। ওদের পকেটে পয়সা আছে। ইচ্ছে করলেই ওরা কিছু কিনে খেতে পারে। আমার অসহায় অবস্থার কথা ওরা কেউ ভাবছে না।
একসময় চোখের জল মুছে উঠে দাঁড়ালাম। পেটের হিংস্র বাঘটা এখন সারা শরীরে চারিয়ে যাচ্ছিল। খিদের যন্ত্রণা যে এত মারাত্মক হতে পারে তা আমি কোনওদিন কল্পনা করিনি। অসহ্য যন্ত্রণা। পেটটা যেন কেউ কষে নিংড়ে দিচ্ছে। ওঃ!
বিশ্বাস করুন, এ যন্ত্রণা আপনিও সহ্য করতে পারতেন না।
কী করব? জল খাব পেট পুরে? পাতি জল?
কিন্তু তারপরও এখনও সারাটা রাত আমার সামনে পড়ে রয়েছে। সারাটা রাত! ওই হিংস্র বাঘটা তো একটু পরেই আবার ফিরে আসবে।
আপনি এরকম সাংঘাতিক অবস্থায় পড়লে কী করতেন বলুন তো!
হঠাৎই ফুটপাথটার দিকে চোখ গেল আমার। ফুটপাথটা নতুন করে সারানো হচ্ছে। বালির ওপরে বসানো হচ্ছে কংক্রিটের ছোট-ছোট স্ল্যাব। একপাশে কয়েকশো স্ল্যাব থাক দিয়ে সাজানো রয়েছে। আগামীকাল ওগুলো কাজে লাগানো হবে।
