থানায় যাব? তারপর? ওরা আমাকে কীভাবে সাহায্য করবে? আমার কথা হয়তো বিশ্বাস করবে না। আর যদি বিশ্বাস করে তা হলে হয়তো কোনও মেন্টাল হসপিটাল কি পাগলখানায় আমাকে চালান করে দেবে।
আমাকে ইতস্তত করতে দেখে পুলিশটি বোধহয় আমার সমস্যা বুঝতে পারল। একটু সহানুভূতির গলায় বলল, আপনি এক কাজ করুন। কোথাও একটু বসে চুপচাপ বিশ্রাম নিন। দেখবেন, হয়তো ঘণ্টাখানেক কি ঘণ্টাদুয়েকের মধ্যে সব মনে পড়ে যাবে।
এরপর আর কিছু করার নেই। লজ্জা আর সঙ্কোচে পুলিশটিকে আমি বলতে পারলাম না যে, আমার খিদে পাচ্ছে এবং আমার পকেটে একটি পয়সাও নেই।
আমার ফুটপাথে ফিরে এলাম। কোথাও চুপচাপ বসে একটু অপেক্ষাই না হয় করি। কে বলতে পারে, যেমন হুট করে আমার মেমারি লস হয়েছে হয়তো তেমন হুট করেই আবার সব স্মৃতি ফিরে আসবে।
কিন্তু এল না। পুরো একঘণ্টা পঁয়তাল্লিশ মিনিট আমি একটা বন্ধ দোকানের সিঁড়ির ধাপে বসে কাটিয়ে দিলাম, কিন্তু কোনও স্মৃতিই ফিরে এল না। শুধু একটা কচি ছেলের গলায় বার তিনেক বাপি ডাকটা মনে-মনে শুনতে পেলাম। আর একটা দশ-বারো বছরের মেয়ের গলায় বাপি ডাকটা মনের মধ্যে বারকয়েক ধাক্কা মারল।
আমার কি তা হলে ছেলে-মেয়ে আছে? বাড়িতে বউও আছে? ওরা নিশ্চয়ই দুশ্চিন্তা নিয়ে আমার বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় হাঁ করে বসে আছে। আরও ঘণ্টা দুই কি তিন দেখে তারপর পুলিশ হাসপাতাল করব। তারপর আরও এক-দু-দিন কেটে যাওয়ার পর পুলিশ হয়তো আমার খোঁজ পাবে। কিন্তু কী অবস্থায় পাবে কে জানে!
পথচারী লোকদের দাদা, কটা বাজে? জিগ্যেস করে আমি সময়ের খবর রাখছিলাম। পৌনে দু-ঘণ্টা কেটে যেতেই ব্যাপারটা অসহ্য হয়ে উঠল। ধৈর্যের বাঁধ-ভেঙে তো গেলই, উপরন্তু খিদের চাপটা বেপরোয়া চেহারা নিল।
পেটে অসহ্য কষ্ট। গলা শুকিয়ে যাচ্ছে বারবার। খাবারের দোকান-টোকান বা রাস্তায়-হেঁটে চলা লোকজনকে কিছু খেতে দেখলেই প্রাণটা হ্যাংলার মতো দশহাত জিভ বের করে দোলাচ্ছে, হু-হু করছে।
বেশ কয়েকবার সিঁড়ির ধাপ ছেড়ে উঠে গিয়ে টিউবওয়েল থেকে আঁজলা ভরে জল খেয়ে এলাম। কিন্তু জল তো জল! সে কি আর পেটে থাকে!
নাঃ, যদি আমার বউ ছেলে-মেয়ে থাকে, যদি তারা পুলিশে খবর দেয়, তা হলে আগামীকাল পুলিশ নির্ঘাত আমার ডেডবডি খুঁজে পাবে। খিদের যে এত জ্বালা আমি আগে কখনও বুঝিনি।
শেষ পর্যন্ত আর থাকতে না পেরে আবার ওই ট্রাফিক পুলিশটার কাছে গেলাম।
আমাকে দেখেই সে চিনতে পারল। বলল, কী ব্যাপার? এখনও বাড়ি যাননি?
আমি কাতর গলায় বললাম, কী করে যাব! আমার যে কিছুই মনে পড়ছে ন। বিশ্বাস করুন।
নির্বিকার মুখে সে বলল, আমার তো কিছুই করার নেই–আপনি বরং থানায় যান…।
থানায়? আবার সেই গোরু রচনা!
আর কিছু ভাবার আগেই অসহ্য খিদেয় আমার পেট মুচড়ে উঠল। আর থাকতে পারলাম না। ডানহাতটা পুলিশটার দিকে বাড়িয়ে একেবারে রাস্তার ভিখিরি হয়ে গেলাম : স্যার, আমাকে দশটা টাকা দেবেন? তখন থেকে না খেয়ে আছি। আর সইতে পারছি না…।
পুলিশটার চোখ ছোট হয়ে গেল। সবজান্তার ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল দুবার। তারপর গম্ভীর গলায় বলল, হুঁ, বুঝেছি। গালে কয়েকবার আঙুল ঘষল লোকটা। ওর ডানহাতটা প্যান্টের পকেটে ঢুকে গেল। যখন হাতটা বেরিয়ে এল তখন আঙুলে ধরা পঞ্চাশ পয়সার একটা কয়েন : এটা রাখো। ডিউটির সময় আমাদের কাছে টাকাপয়সা থাকে না, জানোই তো!
আপনি থেকে তুমি-তে নেমে এসেছে পুলিশটা। এখন ওর চোখে আমি পাতি ভিখিরি।
আমি পঞ্চাশ পয়সার কয়েনটা নিলাম। অপমানে কান থেকে যেন আগুনের হলকা বেরোচ্ছিল।
আমার মনে হচ্ছিল, এই কাজগুলো আমি নয়, আমার মতো দেখতে অন্য একটা লোক করছে। সেই লোকটা একটা সাধারণ ট্রাফিক কনস্টেবলকে স্যার বলছে, তার কাছে ভিক্ষে চাইছে, পঞ্চাশ পয়সা ভিক্ষে হাত পেতে নিচ্ছে, তারপর লজ্জা আর গ্লানিতে মাথা ঝুঁকিয়ে চলে যাচ্ছে ফুটপাথের কোণের একটা ছোট্ট স্টেশনারি দোকানে, পঞ্চাশ পয়সায় দুটো সাধারণ বিস্কুট কিনে রাক্ষসের মতো কপকপ করে কামড়াচ্ছে, চিবোচ্ছে, এবং গিলছে।
আমার চোখে জল এসে গেল। সেই অবস্থাতেই রাস্তার ধারে বসানো কল থেকে পেট ভরে জল খেলাম। আঃ, কিছুক্ষণের জন্যে শান্তি।
কিন্তু তারপর? কোথায় যাব? কী করব? জানি না, মাথায় কিছু খেলছে না।
আধঘণ্টা যেতে না যেতেই পেটের মধ্যে আবার খিদের মোচড় শুরু হল। এবার তার চরিত্র আরও ভয়ংকর, পাগলের মতো ক্ষিপ্ত আর হিংস্র।
আমি ট্র্যাফিক পুলিশটার চোখ এড়াতে অন্যদিকে হাঁটা দিলাম।
রাত ক্রমশ বাড়ছিল। আমি যেদিকে হাঁটতে শুরু করেছি সেদিকটা বেশ নির্জন আর অন্ধকার। রাস্তায় তেমন দোকানপাট নেই। লাইটপোস্টের বাতিগুলো মলিন–টিমটিম করে জ্বলছে।
আর একইসঙ্গে আমার মাথার ভেতরে খিদের আগুন লকলক করে জ্বলছে।
ঢং ঢং করে ট্রামের ঘন্টি কানে এল। বাঁ-দিকে একটা ট্রাম ডিপো। সেখান থেকে একটা ট্রাম বেরোচ্ছে।
একটা লোক ট্রামটার সামনে দিয়ে চট করে লাইন পেরিয়ে আমার কাছাকাছি চলে এল। আমাকে পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার সময় আমি আর নিজেকে সামলে রাখতে পারলাম না।
দাদা, প্লিজ, একটা কথা শুনবেন?
কী? লোকটা থমকে দাঁড়িয়ে জড়ানো গলায় উত্তর দিল। টের পেলাম ওর মুখ থেকে মদের গন্ধ বেরোচ্ছে। আর জামাকাপড় বেশ ময়লা এবং মামুলি। দেখে অভাবী বলেই মনে হচ্ছে।
