আমার মাথার বাঁ-দিকটা দপদপ করছিল। ভেজা চুল থেকে জল গড়িয়ে পড়ছিল। আমার জ্ঞান ফেরাতে কেউ হয়তো মাথায় মুখে জল ঢেলেছিল।
কিন্তু কতক্ষণ আমি অজ্ঞান হয়ে ছিলাম? বড়জোর পাঁচ মিনিট কি দশ মিনিট। তার মধ্যেই আমার ব্যাগটা হাতিয়ে নিয়ে কেউ চম্পট দিয়েছে!
তখনই মনে হল, বাড়িতে একটা ফোন করা দরকার।
কিন্তু কাকে? বাড়িতে কে কে আছে আমার?
আশ্চর্য! কিছু তো মনে পড়ছে না!
পাগলের মতো স্মৃতি হাতড়াতে লাগলাম। আমি কি বিয়ে করেছি? আমার কি ছেলেমেয়ে আছে? আমি কে? আমার নাম কী?
আমি হতবুদ্ধি হয়ে ফুটপাথে দাঁড়িয়ে রইলাম। কিছুই মনে পড়ছে না।
অস্থির মন ফুটন্ত দুধের মতো ছটফট করছিল। অসংখ্য প্রশ্ন কিন্তু কোনও উত্তর নেই।
নাঃ, কাউকে না কাউকে একটা ফোন করা দরকার। নিশ্চয়ই মোবাইল ফোনে আমার চেনা মানুষজনের অনেক ফোন নাম্বার আছে। দেখি তো!
পকেটে হাত ঢুকিয়ে মোবাইল ফোনটা বের করতে গেলাম।
নেই।
মোবাইল ফোন নেই। ওয়ালেট নেই। এমনকী রুমালটা পর্যন্ত নেই।
সামান্য কয়েক মিনিট অজ্ঞান হয়ে ছিলাম, আর সেই ফাঁকেই সবকটা জিনিসের হাত পা গজিয়ে গেছে! কেউ ওদের চক্ষুদান করেছে।
আমি এখন কী করি!
না, ভয় পেলে চলবে না। মাথা ঠান্ডা করে একটু ভাবতে হবে।
নোংরা ফুটপাথ ধরে আমি পা ফেলতে লাগলাম। একটা ফাঁকা জায়গা খুঁজতে লাগলাম।
ফুটপাথের ওপরে একটা ভাতের হোটেল, তার একপাশে তোলা উনুন জ্বলছে। তারপরই দুটো টেলারিং-এর দোকান, একটা পিচবোর্ডের বাক্স তৈরির কারখানা, একটা ওষুধের দোকান।
ওষুধের দোকানের পাশে একটা কোনাচে ফাঁকা জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালাম। বড়-বড় কয়েকটা শ্বাস নিলাম। মনে-মনে এক-দুই-তিন গুনে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করতে লাগলাম। তারপর খুব খুঁটিয়ে ভাবতে শুরু করলমে।
আমার নাম মনে পড়ছে না। আমি কে তা জানি না। আমি কোথায় যাচ্ছিলাম সেটা মনে করতে পারছি না। আমি অফিস থেকে রওনা হয়েছি সেটা মনে আছে, কিন্তু অফিসটার নাম কী, সেটা কোথায় কিছু মনে নেই।
তা হলে বিজ্ঞানের ভাষায় যেটাকে অ্যামনেজিয়া বলে এটা তাই? বাসে মাথাটা ঠুকে গিয়ে কি এই কাণ্ডটা হয়েছে?
আমার কাছে কোনও টাকাপয়সা নেই, কোনও কাগজপত্র বা আইডেনটিটি প্রুফ নেই। আমি জামা-প্যান্ট পরা একজন ভদ্রলোক–এখন শুধু এইটুকুই আমার পরিচয়।
রাস্তায় প্রচুর লোকের চলাচল। তাদের দেখে আমার হিংসে হচ্ছিল। ওরা জানে নিজেদের পরিচয়। আর..আর ওদের পকেটে কম-বেশি পয়সা আছে।
মাথাটা দপদপ করছিল। আর তার সঙ্গে খিদেও পাচ্ছিল।
শেষ কখন খেয়েছি আমি? নিশ্চয়ই দুটো কি আড়াইটের সময় অফিসে টিফিন-ঠিফিন যা হোক খেয়েছি।
কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে ভাবার পর মনে হল পুলিশের কাছেই যাই। আমার অদ্ভুত দুরবস্থার কথাটা খুলে বলি। আমার জায়গায় আপনি হলেও হয়তো ঠিক একই কাজ করতেন–পুলিশকে গিয়েই আপনার এই বিচিত্র সমস্যায় কথা বলতেন।
ওই তো, একজন ট্রাফিক পুলিশ চৌরাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে ট্র্যাফিক কন্ট্রোল করছে। মনে পড়ল, ফুটপাথে শোওয়া অবস্থায় যখন আমার জ্ঞান ফিরে এসেছিল তখন আমি একজন ট্রাফিক পুলিশকে ভিড়ের মধ্যে দেখেছিলাম। দুজন একই লোক কি না কে জানে!
দোনামনা পা ফেলে আমি পুলিশটির দিকে এগিয়ে গেলাম।
কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই পুলিশটি আড়চোখে আমার দিকে একবার তাকাল শুধু। তারপর হাত নেড়ে গাড়ি চলাচল ম্যানেজ করতে লাগল।
পুলিশটিকে দেখতে বেশ লম্বা-চওড়া। ভুড়ি নেই। গায়ের রং কালো, কিন্তু নাক-মুখ-চোখ সুন্দর–যেন পাথরে খোদাই করা ভাস্কর্য।
আ-আমি…আমি ভীষণ প্রবলেমে পড়েছি…।
পুলিশটি তেরছাভাবে আমাকে একবার দেখল ও কেন? কী প্রবলেম?
প্রশ্ন দুটো করেই আবার হাত নেড়ে ছুটন্ত গাড়ির তদারকিতে মন দিল।
আ-আমি..সবকিছু ভুলে গেছি…।
পুলিশ এবার চমকে উঠল । অ্যাঁ! কী বললেন?
আমার কিছুই মনে পড়ছে না। সবকিছু হঠাৎ ভুলে গেছি।
আমার মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকাল। বেশ কয়েক সেকেন্ড ধরে আমাকে খুঁটিয়ে দেখল।
সব ভুলে গেছেন মানে? আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে আবার ট্র্যাফিক ম্যানেজ করার কাজে ঢুকে গেল। আমাকে ভুলে গেল কি না কে জানে!
আমি ওর আরও কাছে এগিয়ে গেলাম। বেশ কাতর গলায় বললাম, প্লিজ, আমার কথাটা একবার শুনুন। প্লিজ।
আবার আমার দিকে তাকাল। আচমকা একটা হাই তুলল।
দেখুন, আধঘণ্টা মতন আগে একটা বাসের সঙ্গে আমার ধাক্কা লেগেছে। ওই যে–ওই জায়গাটায় জায়গাটা আঙুল তুলে বোঝাতে চেষ্টা করলাম ও মাথায় সামান্য চোট পেয়েছি। কিন্তু তারপর থেকে আমার আর কিছু মনে পড়ছে না। আমি কে, কোথায় আমার বাড়ি, আমার বাড়িতে কে-কে আছে কিচ্ছু না। বিশ্বাস করুন, আমি সব ভুলে গেছি।
চোখে অবিশ্বাস নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল পুলিশটি। তার সঙ্গে খানিকটা বিস্ময় মেশানো ছিল–যেন কোনও আজব প্রাণী দেখছে। একইসঙ্গে আমার ধুলো-ময়লা লাগা ব্র্যান্ডেড শার্ট-প্যান্ট জরিপ করল।
আমি তাতে আরও মরিয়া হয়ে পুলিশ-ভদ্রলোককে বোঝাতে চেষ্টা করলাম : প্লিজ, আমাকে একটু হেল্প করুন। আমি এখন কী করব বুঝতে পারছি না…।
সব বুঝতে পারছি। কিন্তু আমি তো এখন ডিউটিতে…পুলিশটি ভদ্র গলায় বলল, আপনি বরং থানায় গিয়ে কথা বলুন…।
