কেন রে? রবি ঝগড়া করেছে?
না। ও কখখনও ঝগড়া করে না। মোনালিসা গম্ভীরভাবে বলল।
ও, তা হলে বুঝি আড়ি করে দিয়েছে তোর সঙ্গে?
না, ও কখখনও আড়ি করে না।
বাবা এবারে হেসে ফেললেন, বললেন, তা হলে ভালোই তো । মন খারাপের কী হল?
মোনালিসা বাবার দিকে তাকাল। বলল, আমি শানু, বাবাই, তোতা ওদের সঙ্গে খেলব, বাপি। রবির সঙ্গে খেলতে আমার বিচ্ছিরি লাগে।
এমন সময় মা এসে পড়েছিলেন বারান্দায়। শুনতে পেয়েছেন মেয়ের শেষ কথাটা। আর ভীষণ অবাক হয়ে গেছেন। রবির সঙ্গে খেলতে ভালো লাগছে না!
মা আর বাবা অবাক হয়ে মেয়েকে দেখছিলেন। গায়ে ফুটফুটে লাল ফ্রক, মাথার চুলে জোড়া বিনুনি, তাতে লাল ফিতের ফুল। শুধু ফরসা মুখটা হাসিখুশি হলেই বেশ মানাত।
সন্ধে এখনও নামেনি। নীচের গলিতে বাচ্চা-বাচ্চা ছেলেমেয়েরা ছুটোছুটি করে কুমিরডাঙা খেলছে। পশ্চিমের আকাশ লালে লাল। আর তার সঙ্গে আরও নানান রং। কয়েকটা পাখি উড়ে যাচ্ছে। সবই ভালো, শুধু মোনালিসার মুখে হাসি নেই।
মা এবার বললেন, রবি তো কখনও তোর সঙ্গে ঝগড়া করে না, আড়ি করে না! তা হলে ওর সঙ্গে খেলতে তোর বিচ্ছিরি লাগছে কেন!
মোনালিসা আর থাকতে পারল না। একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়ল মায়ের কোলে। মাকে জড়িয়ে ধরে মায়ের শাড়িতে মুখ গুঁজে দিল। চাপা গলায় বলল, রবি ঝগড়া করে না, আড়ি করে না। তাই কখনও ভাবও করে না আমার সঙ্গে। তুমিই বলো মা, আড়ি না হলে ভাব হবে কেমন করে? আর ঝগড়া না হলে আড়ি হবে কেমন করে? আমি শানু, বাবাইদের সঙ্গে খেলব কাল থেকে।
মা হাত বুলিয়ে দিলেন মেয়ের মাথায়। তারপর তাকালেন বাবার দিকে। বাবা হেসে বললেন, ও ঠিকই বলেছে, বুঝলে। আড়ি না হলে কি কেউ বুঝতে পারে ভাব করতে কী দারুণ ভালো লাগে!
মা বললেন, তুমি রবিকে কালই দোকানে ফেরত দিয়ে এসো। ভাব করতে জানে না এমন বন্ধু আমাদের দরকার নেই।
সত্যিই তো, যে বন্ধু ভাব করতে জানে না সে আবার বন্ধু কীসের!
যখন কিছুই মনে পড়ছে না
তখন আপনি কী করবেন?
অফিস থেকে ফেরার সময় যদি আপনার একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়, আর আপনি সব ভুলে যান, কিছুই যদি আপনার মনে না পড়ে, তখন আপনি কী করবেন বলুন তো!
আমি নিজে কোনও পথ খুঁজে পাচ্ছি না বলে দিশেহারা হয়ে আপনাকে জিগ্যেস করছি।
রোজকার মতো অফিস থেকে ফিরছিলাম। একটু আনমনা ছিলাম বলে ঠিকঠাক বাসে উঠতে পারিনি। টিকিট কাটার সময় কন্ডাক্টর ভাই বলল যে, বাসটা রাজাবাজার থেকে ডানদিকে ঘুরে যাবে। অথচ আমার সোজা রাস্তা ধরে কোথায় একটা যেন যাওয়ার কথা। তাই বাসটা রাজাবাজার স্টপেজে এসে ডানদিকে ঘুরে থামতেই নেমে পড়েছি।
প্রায় সাতটা বাজে। চার রাস্তার মোড়টা গাড়ি-ঘোড়া, অটো আর সাইকেল ভ্যানে জট পাকিয়ে আছে। তার সঙ্গে পিলপিল করছে ব্যস্ত মানুষের দল।
মোড়টা কোনাকুনি পার হয়ে উলটোদিকের বাস স্টপে যেতে হবে। সেখান থেকেই সোজাসুজি যাওয়ার বাস পাওয়া যাবে।
তো সেই চেষ্টাই করছিলাম। এদিক-সেদিক ছুটে চলা গাড়ির গতিপথ এড়িয়ে কায়দা করে রাস্তাটা পার হচ্ছিলাম। আর ঠিক তখনই অ্যাক্সিডেন্টটা হল।
একটা ট্যাক্সি আর একটা মিনিবাস তেরছাভাবে বাঁক নিচ্ছিল, আর তাদের ফাঁকফোকর দিয়ে তাড়া খাওয়া নেংটি ইঁদুরের মতো এঁকেবেঁকে ছুটে যাচ্ছিল দুটো অটো। আমি বোধহয় একসেকেন্ডের জন্যে অন্যমনস্ক হয়েছিলাম…ঠিক মনে নেই। একটা অটো আমাকে পাশ থেকে এসে ধাক্কা মারল। আমি ছিটকে গিয়ে বাড়ি খেলাম একটা বাসের গায়ে। মাথাটা কী একটা শক্ত জিনিসে ঠুকে গেল। তারপর পড়ে গেলাম রাস্তায়।
লোকজনের হইহই কানে এল। তার সঙ্গে গাড়ির নানারকম হর্নের শব্দ। ব্যস, তারপর আর কিছু মনে নেই।
একটু পরে চোখ মেলে যখন তাকালাম, তখন আমাকে ঘিরে অনেক ঝুঁকে পড়া মানুষের ভিড়। আমাকে চোখ খুলতে দেখেই চাপা চিৎকার উঠল, জ্ঞান ফিরেছে! জ্ঞান ফিরেছে!
দেখলাম আমি ফুটপাথে পড়ে আছি। চারপাশে গাড়ি-ঘোড়ার আওয়াজ। আমার মুখ-চোখ মাথা জলে ভেজা। গায়ে মাথায় ব্যথা। বাঁ-হাতের কনুইয়ের কাছটা জ্বালা করছিল। ওপর ওপর তাকিয়ে জামা-প্যান্টে কোনও রক্তের দাগ খুঁজে পেলাম না।
বেশ কয়েকটা হাত আমাকে ধরাধরি করে দাঁড় করাল। অনেকে একসঙ্গে জিগ্যেস করল, খুব লেগেছে?, হাঁটতে পারবেন তো? ফিট না লাগলে বলুন এন. আর.এস-এ নিয়ে যাই।
হাত-পা নেড়েচেড়ে দেখলাম, সেরকম কোনও অসুবিধে হচ্ছে না। মোটামুটি ঠিক আছি।
আশপাশ থেকে লোকজন তখনও মন্তব্য করছে, খুব লাকিলি বেঁচে গেছেন। আর একটু হলেই বাসের তলায় ঢুকে যেতেন–, ওরকম রিস্ক নিয়ে রাস্তা পার হন কেন? বাড়ি ফিরতে পারবেন তো? একটা ট্যাক্সি নিয়ে সোজা বাড়ি চলে যান।
হ্যাঁ, একটা ট্যাক্সি ধরতে হবে। বাড়ি ফিরতে হবে।
ঠিক তখনই খেয়াল করলাম, আমার সঙ্গে সবসময় যে-ফোলিও ব্যাগটা থাকে সেটা দেখতে পাচ্ছি না। ওটা খুঁজতে চারপাশে তাকালাম।
নোংরা ফুটপাথ, তার কোল ঘেঁষে আরও নোংরা নর্দমা। কিন্তু না, আমার ব্যাগটা কোথাও দেখতে পাচ্ছি না।
তখনই আরও খেয়াল করলাম, বাঁ-হাতের কবজিতে বাঁধা স্টিল ব্যান্ডের রিস্টওয়াচটাও নেই। কেউ ওটা খুলে নিয়েছে।
ততক্ষণে চারপাশের লোকজনের ভিড় ফিকে হয়ে গেছে। যে যার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে আবার।
