হে ঈশ্বর, করুণাসিন্ধু! শুনেছি আপনার ক্ষমতা ও শক্তি অপরিমেয়। বহু অত্যাচারী শক্তিশালীকে নিছক বাহুবলে দমন করেছেন আপনি। প্রভু, আমার বুকের সামান্য নীচে, তলপেটের কিছুটা ওপরে, অর্থাৎ নাভির আশেপাশে, একটা ভয়ংকর দৈত্য লুকিয়ে আছে। আমি কিছুতেই একে বাগে আনতে পারছি না। ওর দাপাদাপি আমাকে পাগল করে তুলেছে। দয়া করে একে সংহার করুন, প্রভু! আমার জোড় খুলে যাওয়া ঠোঙাটা আবার বেঁচে উঠুক। এ কী, দয়াময়, আপনি চলে যাচ্ছেন? কেন, মহামান্য, কী অপরাধ আমি করেছি? কী? ওই চূর্ণ-বিচূর্ণ ছবি, আমার কেটে যাওয়া পায়ের চেটো, আমার অবিশ্বাসী রুক্ষ দৃষ্টি আপনাকে সন্দিহান করে তুলেছে। কিন্তু বিশ্বাস করুন– তবু আপনি চলে যাচ্ছেন? একজন ভক্তের আর্তিকে উপেক্ষা করছেন আপনি? আপনার মনে কি করুণা নেই, করুণাময়? হয় আমাকে, নয় ওই দৈত্যকে সংহার করতেই হবে আপনাকে! প্রভু! মহাত্মন! করুণাসিন্ধু! দেবাদিদেব! এতবার অনুনয় করে বলছি তবু আপনি টলছেন না? শুনুন…।
…ওরে শালা, যাওয়ার আগে আমার পেটের এই দৈত্যটাকে ঘাড় মটকে নিকেশ করে দিয়ে যা।
মোনালিসার নতুন বন্ধু
আজ একজন নতুন বন্ধু মোনালিসার বাড়িতে এসেছে। এই নতুন বন্ধুটা খুব ভালো। কখনও ঝগড়া করে না, আড়ি করে না। এরকম একটা ভালোমানুষ নতুন বন্ধুই তো চেয়েছিল মোনালিসা। এরকম বন্ধু আর কারও নেই। শানু, তোতা, রুবি, বাবাই কারও নেই।
ছাদের কোণে বসে মোনালিসা ওর নতুন বন্ধুর সঙ্গে রান্নাবাটি খেলছিল আর নানান গল্প করছিল। তখন বিকেল শেষ হয়ে আসছে। ছাদের পাশেই উঁকি মারছে তিনটে তালগাছ। মোনালিসার রান্নাবাটি খেলা দেখছে। গাছের পাতার জাফরির ফাঁক দিয়ে সূর্যের লাল আলো দেখা যাচ্ছে। বিকেল শেষ হয়ে আসছে। তাই সূয্যিমামাও খেলাধুলোর পাট সেরে ঘরে ফিরে যাচ্ছে। তারপরই বইখাতা নিয়ে পড়তে বসবে হয়তো।
মোনালিসার নতুন বন্ধুর নাম রবি। কী ফুটফুটে দেখতে! কী ভালো-ভালো কথা বলে। আবার কান পেতে মনোযোগ দিয়ে মোনালিসার সব কথা শোনে। রবি খুব ভালো। কখনও ঝগড়া করে না। তাই ওকে নিয়েই পড়াশোনা করতে বসে মোনালিসা। মাকে বলেছে, রবির সঙ্গেই আমাকে খেতে দেবে। আর ও আমার কাছেই ঘুমোবে।
সত্যি, রবি আসার পর মা আর বাবা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। নইলে রোজই তো শুনতে হয় মেয়ের নালিশ ও বাপি, তোতা ওর বলটা আমাকে খেলতে দিচ্ছে না। ওকে বকে দাও না। অথবা কখনও এসে বলে, মা, মা, জানো বাবাইটা কী খারাপ ছেলে! আমি একটা কী চমৎকার রাখি ওকে দিয়েছি, আর বলে কিনা পচা রাখি! আমি ওর সঙ্গে আড়ি করে দিয়েছি।
মা আর কী বলবেন! বাবা আড়ালে মুখ টিপে হাসেন। সাত বছরের এইটুকু মেয়ের এত ঝগড়া এত নালিশ! মায়ের আর ভালো লাগে না। বাবাকে বলেন, কী করবে করো। দেখবে, তোমার মেয়ে বড় হয়ে ভীষণ ঝগড়ুটে হবে।
বাবা তাতে আরও হাসেন। হাসতে হাসতে চোখের চশমা খুলে যেতে চায়।
মা যখন পুঁচকে মেয়েটাকে বকুনি দিয়ে বলেন, কী রে, তুই সবার সঙ্গে রোজ-রোজ ঝগড়া করিস কেন রে!
মোনালিসা হাত-পা নেড়ে চোখ পাকিয়ে বলে, বা রে, আমি ঝগড়া করি নাকি! শানু, তোতা, ওরাই তো ঝগড়া করে। বারবার আড়ি করে, ঝগড়া করে।
মা গালফোলা মেয়েটাকে দেখেন। চোখ নামিয়ে মেঝের দিকে তাকিয়ে আছে। তখন অভিমানী মেয়েকে কাছে টেনে নিয়ে আদর করেন মা। চুমু দেন মাথায়। বলেন, তুই রোজ বিকেলে খেলতেও বেরোবি, আবার এসে নালিশও করবি। কী যে করি!
তখন মোনালিসা বলেছে, আমি আর খেলতে বেরোব না, বাড়িতে বসে একা-একা খেলব।
সত্যি তাই করল মেয়েটা। পরপর দুটো দিন একদম বেরোল না বাড়ি ছেড়ে। তাই দেখে মায়ের মুখ শুকিয়ে গেল। বাবাকে বললেন, কিছু একটা করো। মেয়েটা যে ঘরকুনো হয়ে গেল। বাড়িতে বসে একা-একা কখনও খেলতে পারে!
এই ব্যাপার? বাবা আবার হেসেছেন। তারপর বলেছেন, তা হলে দ্যাখো এবার কী করি!
ব্যস। পরদিন বাবা কোথা থেকে যেন কিনে এনেছেন রবিকে। বাচ্চাদের খেলার সাথি বাচ্চা রোবট। যন্ত্রের খেলনা, কিন্তু দেখতে অবিকল মানুষের মতন। মাথায় চকচকে কালো চুল। টকটক করে কথা বলে। বড়-বড় চোখে এদিকে-ওদিকে তাকায়। কী সুন্দর করে হাসে! নাম রবি।
এইভাবেই ওদের বাড়িতে এসেছে রবি। তারপর এক মিনিটের মধ্যে হয়ে গেছে মোনালিসার নতুন বন্ধু।
নতুন বন্ধুর সঙ্গে মোনালিসার কোনও ঝগড়া নেই, কোনও আড়ি নেই। কারণ রবি কখনও মোনালিসার সঙ্গে তর্ক করে না, ওর কাছ থেকে কোনও খেলনা কেড়ে নেয় না, ওর নামে নালিশও করে না। ওরা দুজনে ঘরে, কিংবা বারান্দায়, অথবা ছাদে খেলা করে। ছুটোছুটি করে, লুকোচুরি খেলে, এক্কা-দোক্কা বা ইকড়িমিকড়ি খেলে।
ওদের মিল দেখে বাবা-মা খুব খুশি। বাবা মাকে বলেন, দেখলে তো, কেমন ম্যাজিক দেখিয়ে দিলাম!
মা হেসে উত্তর দেন, সত্যি, এরকম মিল! না দেখলে বিশ্বাসই হত না কখনও।
এইভাবেই দিন যাচ্ছিল বেশ। হঠাৎ একদিন বাবা দেখলেন, মোনালিসা মুখ ভার করে দাঁড়িয়ে আছে বারান্দায়। আর রবি একটু দূরে বসে লুডোর ছক পেতে বন্ধুকে ডাকছে, কী হল মোনালিসা, খেলবে এসো।
বাবা চলে এলেন মেয়ের কাছে। জিগ্যেস করলেন, কী রে, কী হয়েছে?
মোনালিসা বাবার দিকে না তাকিয়েই বলল, রবির সঙ্গে আমার খেলতে ইচ্ছে করছে না, বাপি।
