না, সব আশা-আকাঙ্ক্ষা খসে যায়নি আমাদের। তা-ই যদি বলি তা হলে সবিতাই বা কোম্পানি থেকে কোয়ার্টার পাবে কেন, আর পলাই বা নামকরা টিউটোরিয়াল হোমে চাকরি পাবে কেন! কোয়ার্টার পাওয়ার পর সবিতা চিঠি লিখেছিল, বাবা, সবই দয়াময়ের ইচ্ছে। মার চিকিৎসার যেন কোনওরকম ব্যাঘাত না হয়…। দয়াময়? দয়াময় জালান? নিমৰ্চাদের কেউ হয় নাকি? সে কথা বউকে বলতেই ও হেসেছে। আশ্চর্য, ওর হাসিতে এখনও ঘা হয়নি! হেসে ও বলেছে, তোমার আর কবে বুদ্ধি হবে? দয়াময় বলতে একজনই আছেন। সত্যি বলছি, সেই একজন কে আমি বুঝতে পারিনি। আসলে আধপেটা খেয়ে দিনে তিনশো ঠোঙা তৈরি করলে কারই বা বুদ্ধি ঠিক থাকে, বলুন? আমি চালসে পড়া চোখে ধার করা চশমা লাগিয়ে একমনে ঠোঙা ভঁজি আর আনমনে পাঁজরার হাড়গুলো গুনি, যেন তা থেকেই জানতে পারা যাবে আপনার আসতে আর কত দেরি। নাকি আমার যেতে?
আজকালকার ছেলেমেয়েরা অকৃতজ্ঞ হয় তাতে কোনও সন্দেহ নেই। সিন্টু চিঠি দেয় না। রিন্টুও না। সবিতার চিঠি কমে এসেছে। আর পলাও থাকার জায়গা পেয়েছে টিউটোরিয়ালে। ঘরটা যেন এখন সত্যি শ্মশান। বিছানায় শোওয়া একটা আধমরা দেহ। আর সেই দেহকে আগলে আমি বসে আছি। ঘরে রয়ে গেছে ছেলেমেয়েগুলোর স্মৃতির কঙ্কাল।
হ্যাঁ, একটা সেকেন্ড হ্যান্ড চশমা। রিন্টু। সুন্দর হাতের লেখায় ভরা দুটো খাতা। সিন্টু। একটা পুরোনো হারমোনিয়াম–তাতে এখন আর খুশির সুর বাজে না। সবিতা। পাউডার, স্নো, সেন্ট, কাচপোকার টিপ, নেলপালিশ, লিপস্টিক। পলা। আমার স্মৃতি আমি নিজে। আর বউয়ের স্মৃতি ওই অক্ষয় মিষ্টি হাসি! কিন্তু শেষমেশ তাও গেল।
সবিতার চিঠি একদিন বন্ধ হল। চিঠির সঙ্গে টাকা আসত। তাও বন্ধ হল। নিমাদের ঋণ কি শোধ হয়ে গেছে তা হলে? পলার সাহায্য আসত কখনও সখনও। একসময় তাও ডুমুরের ফুল। এখন শুধু আমি, ঠোঙা, আর বউ। তিনজনে মিলে ধরে রেখেছি তেপায়া টেবিলটাকে। বউয়ের মুখে চব্বিশ ঘণ্টাই শুধু আপনার কথা। আপনার গুণাবলী সাতকাহন করে শোনায় আমাকে। বলে, আপনি কত ভালো। কত ক্ষমতা আপনার। কত মহান আপনি। আমি শুনি, ঠোঙা বানাই, রান্না করি, ঠোঙা বানাই, রান্না করি, ঠোঙা বানাই, শুনি, রান্না করি, ঠোঙা বানাই…।
আপনার কি একঘেয়ে লাগছে? কী বলব বলুন। একঘেয়ে জীবনের গল্প সবসময় একঘেয়েই হয়। তবে খুব বেশি দিন একঘেয়েমিতে কাটেনি আমার। আপনার খোঁজ করে করে বউটা শেষে চলে গেল। না, নিয়তির ওপরে তো কারও হাত নেই! আপনারও নেই। আমারও নেই। ফলে এখন শুধু আমি আর ঠোঙা রয়ে গেলাম।
গত একটা মাস খুব কষ্টে কাটিয়েছি, মহামান্য। পরের জন্যে কষ্ট করলে কষ্টকে কষ্ট বলে মনে হয় না। কিন্তু নিজের জন্যে কষ্ট করলে সে-কষ্ট লক্ষগুণ হয়ে বুকের মধ্যে চেপে বসে। একটা মাস আমি একা এই একশো চুয়াল্লিশ বর্গফুট রাজ্যের ওপর দোর্দণ্ডপ্রতাপে রাজত্ব করেছি। কিন্তু আর সইছে না। যে রাজ্যে প্রজা নেই সে রাজ্যের রাজার কষ্ট আপনি বুঝবেন না, মহানুভব। কী বলছেন? কষ্টের মধ্যেই মোক্ষ? হয়তো তাই। আর আমিও তো তাই চেয়েছিলাম, কিন্তু পেলাম কই?
অনুমতি না নিয়ে কেশে ফেললাম। মাফ চাইছি, মহাত্মন। আসলে শরীরের ওপরে সমস্ত নিয়ন্ত্রণই আমি হারিয়ে ফেলেছি। আমার এই শীর্ণ হাত, আমার এই জীর্ণ দুটি পা আজ ভাবতে অবাক লাগে যে, এগুলো আমারই শরীরের প্রত্যঙ্গ। ইচ্ছেমতো এগুলো আমি নাড়াচাড়া করতে পারি। কী বলছেন? পায়ের এই ক্ষতটা কীসের? বিশেষ কিছু নয়, কাচে সামান্য কেটে গেছে। আপনার কাছে লুকিয়ে তো লাভ নেই, আপনি সর্বজ্ঞ। হ্যাঁ, যে কথা বলছিলাম, এতদিন প্রতীক্ষার পর যখন এলেন, তখন অধমের একটা প্রার্থনা আপনাকে পূরণ করতেই হবে। আপনার তো অদেয় কিছুই নেই! আমার এই…কী বলছেন? ঘরে এত কাচের গুঁড়ো কোত্থেকে এল? কিছুই না, বাঁধানো ফটোর কাচটা আচমকা ভেঙে গেছে। এতদিন ঠিকই ছিল! বউটা ভীষণ যত্ন-আত্তি করত ফটোটার। ফুল ধূপ-ধুনো কিছুই বাদ দিত না। মরবার আগেও অসহায় চোখে চেয়ে ছিল এই পরমাত্মা ছবিটার দিকে। আপনি তো সবই জানেন! কি? ফটোটা ফ্রেম ভেঙে কাত হয়ে পড়ে আছে কেন? কে জানে। আমার তো কদিন ধরে বিশেষ জ্ঞানগম্যিই নেই। আধপেটা ভগ্নাংশ হয়ে কবেই সিকিপেটায় ঠেকেছে। সিকির ভগ্নাংশ, তার আবার ভগ্নাংশ, এইরকম বহু ভগ্নাংশ হতে-হতে এখন আমার পেটের ঠিক কত অংশ ভরতি তার কোনও স্পষ্ট হিসেব আমার কাছে নেই, প্রভু। আর সেইজন্যেই তো আপনার কাছে একটাই প্রার্থনা! জানিনা, ফটোর কাচ ভেদ করে ধূপ-ধুনো ফুলের গন্ধ আপনার খুঁতহীন নাকে পৌঁছেছিল কি না। জানি না, আমার বউয়ের নিত্যদিনের আকুল পুজোপিট আপনার সর্বৰ্শব্দগ্রাহী কানে পৌঁছেছিল কি না। নিশ্চয়ই পৌঁছেছে। নইলে দেরিতে হলেও আপনি এলেন কী করে? কী বলছেন? আমার কাচে কাটা পা আর এই ফটোর গুঁড়ো হয়ে যাওয়া কাচের মধ্যে…না,, প্রভু! আমার জ্ঞান ছিল না, সংযম ছিল না, নিয়ন্ত্রণ ছিল না, শ্রদ্ধা ছিল না, ভক্তি ছিল, সম্ভ্রম ছিল না–এ কী! আপনি চলে যাচ্ছেন, মহামান্য?
দয়া করুন, দেবাদিদেব! করুণা করুন, দয়াময়। অত্যন্ত সহজ একটি প্রার্থনা পূরণ করলেই আপনি আমার চেতনায় সমস্ত বোধ ফিরিয়ে আনতে পারেন সম্ভ্রম, ভক্তি, শ্রদ্ধা, নিয়ন্ত্রণ, সংযম, জ্ঞান, সব, সব!
