সেই নিঃঝুম সন্ধেয় বসে ঠোঙা ভাঁজতে-ভঁজতে শুধু আপনার কথা মনে পড়ত। দম আটকানো কালো ধোঁয়ায় নেড়ি কুকুরের মতো হাঁ করে হাঁফাতাম। কখনও কখনও কাশ উঠত। বুকের ভেতর ঘড়ঘড় শব্দ হত। থুথু আর কফ দলা পাকিয়ে জিভের ওপরে ঘুরঘুর করত। মাঝে মাঝে বউয়ের কেঁকানি জোরালো হলে উঠে গিয়ে জল দিলাম, কি কফোঁটা ওষুধ ঢেলে দিলাম গলায়। তারপর আবার ঠোঙা। এইরকম একঘেয়েভাবে ঠোঙা বানাতে-বানাতে একসময় মনে হত আমি নিজেই কখন ঠোঙা হয়ে গেছি। আমি ঠোঙা, আমার বউ ঠোঙা, সিন্টু, রিন্টু, সবিতা, পলা সবাই এক-একটা ঠোঙা। খালি ঠোঙা। এমনকী তার আঠার জোড়ও খুলে আসছে একটু-একটু করে। আপনি হাসছেন? অথচ তখন যদি আপনি আসতেন, কাছে দাঁড়িয়ে এইরকম বরাভয় হাসি হাসতেন, কিংবা বলতেন, ভয় নেই, আমি আছি-দুঃখে সুখে পুণ্যে পাপে পতনে উত্থানে সবসময় পাশে আছি, তা হলে ওই তেলচিটে বিছানাটাও আজ আর হা-হা খালি থাকত না, সিন্টু আর সবিতাও হাজির থাকত আপনাকে সসম্মানে আপ্যায়ন করার জন্যে। সত্যি, এত দেরি করলেন কেন বলতে পারেন?
আজ আমার সঙ্গেও আপনার দেখা হত কি না কে জানে! আপনার হয়তো অবাক লাগছে, একটা হেঁপো বুড়ো কী করে ঘরদোর আগলে একা-একা যখের মতো দিন কাটাচ্ছে। জানেন, অবাক আমারও লাগে। কী করে যে টিকে আছি! হ্যাঁ, টিকে থাকার কিছুটা কেরামতি কিন্তু নিমাদ জালানের–সিন্টুর মাড়োয়ারি মালিক। কেন জানতে চাইছেন? আসলে মাড়োয়ারি হলে হবে কি, লোকটার মনটা ভারী নরম। আমার বড় ছেলেটা তো দিনরাত্তির ঘাড় গুঁজে কাজ করে ধার শোধ করে চলেছে। একদিন নিমাদ তাকে বললে, সিন্টুবাবু, উধার শোধ করতে আপনার তো ছসাল লেগে যাবে। সিন্টু চুপ। কারণ কথাটা মিথ্যে নয়। অবশেষে নিমচাঁদ প্রস্তাব দেয়, সিন্টুর দু-ভাই বোন যদি তার কাছে নোকরিতে লেগে যায় তা হলে ছসাল সময়টা দু-সালে নেমে আসবে। সিন্টু নিমাদের প্রস্তাব মেনে নিয়েছিল। কিন্তু রিন্টু রাজি হল না। ও তখন কদাচিৎ বাড়িতে থাকে। কোথায় যায় কী করে কেউ জানে না। অবশ্য আপনি নিশ্চয়ই জানতেন। ওকে তখন একটু-আধটু শাসন করে ঘরমুখো ফেরালেই পারতেন। আপনার কথা নিশ্চয়ই অমান্য করত না। কী বলছেন? নিয়তির ওপরে কারও হাত নেই? আপনারও নেই? হ্যাঁ, তা তো বটেই। নইলে আমিই বা এরকমভাবে বেঁচে রয়েছি কেন!
রিন্টু রাজি হয়নি, তবে বড় মেয়ে সবিতা রাজি হয়েছিল। ও চাকরি নিল নিমাদের অফিসে। আর রাতে ফাংশান। নিমাদের ধার বেশ তাড়াতাড়ি শোধ হতে লাগল। অথচ দেখি সিন্টু দিনের পর দিন কেমন মনমরা হয়ে যাচ্ছে। ওকে ডেকে যতই জানতে চাই, কী ব্যাপার, ও কোনও জবাব দেয় না। মাঝে-মাঝে শুধু বলে, হাতের লেখা ভালো হয়ে কোনও লাভ নেই, বুঝলে, বাবা। আমি তখন মুখের ভেতরে নল ঢুকিয়ে রবারের পাম্প টিপে গলায় ওষুধ দিচ্ছি। দুবার ওয়াক তুলে সামলে নিয়ে বললাম, কে বলেছে লাভ নেই। আমার বাবা সিন্টু আমাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে ছোট্ট করে বলল, কে আবার বলবে, নিমাদ বলেছে। আমি ওকে সান্ত্বনা দিতে গিয়েও পারলাম না। আমার বড় ছেলেটা খুব সোজা-সরল, নিরামিষ খায়। ওকে ঠকাতে কষ্ট হল।
বুঝলেন, এরপর থেকেই বড় ছেলেটা কেমন যেন ধার্মিক হয়ে যেতে লাগল। কণ্ঠি নিল। নামগান শুনতে যায়। বাড়িতে পাঁচালি নিয়ে বসে। ভাই-বোনগুলো আড়ালে হাসাহাসি করে। তবে ওর মা খুশি। ওকে উৎসাহ দিয়ে কাতর কণ্ঠে বলে, কোনও ভালো কাজ কখনও বিফলে যায় না রে! না, সিন্টুর ভালো কাজ বিফলে যায়নি। ও একদিন চলে গেল বাড়ি ছেড়ে। দু কলম লিখে জানিয়ে দিল, সংসারে পাপ আছে। এখানে হাতের লেখা ভালো হলেও কারও উন্নতি হয় না। তাই চলে গেলাম।
আপনি বিশ্বাস করবেন কি না জানি না, সেদিন খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম আমি। রোজগেরে ছেলে না বলেকয়ে উধাও হলে কোন বাপটা না ভয় পায়! কী বলছেন? সেরকম ভয়ের কিছু ছিল না? হ্যাঁ, মানে দু-মেয়ে রোজগার করছিল বটে, তবে হাজার হলেও মেয়ে তো! সবিতার কাজে নিমচাঁদ খুশি! ওর প্রমোশন হয় চাকরিতে। যদিও ওর হাতের লেখা ভালো নয়। সবিতা টাকা দিয়ে এই তে-পায়া সংসারটার একটা পায়া ধরে রেখেছে। আর পলা? একইসঙ্গে ওর সাজগোজ আর টিউশনি, দুই-ই বাড়ছে। মেয়েটা নিশ্চয়ই খুব ভালো পড়ায়। খুব খাটতেও পারে। জানেন, মাঝে মাঝে বেশ খারাপ লাগত। মেয়ের রোজগারে খাওয়া! কী বলছেন? আজ আর সে-যুগ নেই? ঠিকই বলেছেন। আজ শুধু ঠোঙা বানানোর যুগ, কিংবা ঠোঙা হয়ে যাওয়ার যুগ।
সিন্টু গেল। রিন্টুর যাতায়াত কমতে কমতে একেবারে শূন্যের কোঠায় এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। ব্যস, সে-ও গেল। কিন্তু আমার বউটা যাই-যাই করেও যায় না। তখনও আপনার খোঁজে মত্ত। ওর হাবভাব দেখে মনে হত এই আপনি এসে পড়লেন বলে। এই বুঝি সিন্টু-রিন্টুকে খুঁজে ফিরিয়ে নিয়ে এলেন! এই বোধহয় আমার বউয়ের পেটের দগদগে ঘা সেরে গেল! আর আমার মতো হেঁপো বুড়োকেও বুঝি ম্যাজিক দিয়ে জোয়ান করে দেবেন। কিন্তু না। কিছুই হল না। দু মেয়ে বাইরে গতর খাটায়। আর ঘরে আমার বউ কোঁকায়, আমি হাঁপ টানি। বউ আপনাকে ডাকে, আমি ঠোঙা বানাই। হঠাৎ-হঠাৎ মনে হয়, ও যেন আপনাকে ডাকছে আমার হয়ে ঠোঙা বানিয়ে দেওয়ার জন্যে। হতেও পারে। হয়তো আমাদের জীবনের জোড়গুলোয় আশা-আকাঙ্ক্ষার আঠা লাগিয়ে ঠোঙা তৈরি করাটাই আপনার নেশা। পরে আকাঙ্ক্ষা যখন খসে যায়, তখন ঠোঙাও খুলে গিয়ে দাঁত ছরকুটে চৌরাস্তার কাদায় ব্রে-আব্রু হয়ে পড়ে থাকে।
