একটু থেমে এসিজি রঘুপতিকে জিগ্যেস করলেন কী, এবার খুশি তো? এবার পারবে তো জাল গোটাতে?
রঘুপতি চওড়া হেসে বলল, স্যার, ভাগ্যিস আপনি শার্লক হোমসের মতো পাইপ টানতে পারেন না, আর এরকুল পোয়ারোর মতো মোমের পালিশ দেওয়া গোঁফ আপনার নেই!
কেন, তা হলে কী হত? কপালে ভাঁজ ফেলে জানতে চাইলেন ডক্টর অশোকচন্দ্র গুপ্ত।
তা হলে আপনি গল্পের বইয়ের পাতায় ঢুকে যেতেন। বলরাম চৌধুরীর মার্ডার কেস আর সভ হত না।
ওঁরা তিনজনেই একসঙ্গে হেসে উঠলেন জোর গলায়।
মুশকিল আসান
সত্যি, এতদিন কোথায় ছিলেন বলুন তো? গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, কত ঋতু, কত মাস, কত বছর কেটে গেল তবু আপনার দেখা নেই। অথচ আপনার খোঁজখবর নেহাত কম করিনি। বহু ডাকাডাকিও করেছি সবাই মিলে। সবাই বলতে, এই তিন কুড়ি ঠেকা বুড়ো আমি, আমার বউ, আর ছেলেটা, মেয়েটা। না, ছোট ছেলে আর ছোট মেয়ে এসবের মধ্যে নেই। ওরা আবার লোকের কাছে কারণে-অকারণে হাত পাতা পছন্দ করে নামানে, করত না। হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন, ওরা এখন বাড়িতে নেই। কোথায় গেছে? সেটা অকপটে বলে দেওয়াটা কি ঠিক হবে? আপনি এত দিন পর দয়া করে এসেছেন, এসময়ে এরকম একটা খবর শুনিয়ে আপনাকে বিব্রত করাটা কি উচিত হবে আমার? অবশ্য বিপদ-আপদের কথা তো আপনাকেই শোনানো উচিত। এগুলো শোনাই তো আপনার কাজ। তা ছাড়া এখন আমার তো আর দ্বিতীয় কেউ নেই, যে এসব ফালতু কথা সময় খরচ করে কান পেতে শুনবে!
জানেন, আপনাকে দেখে সবচেয়ে যে খুশি হত সে আমার বউ। কিন্তু বেচারি এমনই অভাগিনী, কপালে এ-সুখ সইল না। গত মাসেই চলে গেল। তবে মানতেই হবে, ওই রোগা আধপেটা রুগ্ন শরীরে বহুদিন টিকে ছিল। ও আপনাকে যা ভক্তি-মান্য করত সে আর কী বলব! মাঝে-মাঝে আমারই তো বিরক্তি ধরে যেত। মনে হত, বড় বাড়াবাড়ি হচ্ছে। দয়া করে অপরাধ নেবেন না। যা সত্যি তাই বললাম। আসলে অভাবের সংসারে মেজাজটা সবার তিরিক্ষি হয়েই থাকে। তার ওপর রাজ্যের অসুখ-বিসুখ। বউটা কোত্থেকে যে আলসার বাধিয়েছিল জানি না। বাড়তে বাড়তে সেটা এমন হল যে, ডাক্তার-বদ্যিতেও আর ভারসা পাই না। বড় ছেলেটা মা-কে নিয়ে এ হাসপাতাল ও-হাসপাতাল ঢের দৌড়ঝাঁপ করল। মাঝে-মাঝে একটু ভালো হয়, আবার পড়তির দিকে। তারপর শুধুই বিছানায় শোয়াহা, এই বিছানাটায়। তারপর শুধুই বিছানায় পড়ে থাকে, আর আপনাকে ডাকে, খোঁজ করে। ভাবে আপনিই একমাত্র ওর কঠিন অসুখ সারিয়ে দিতে পারেন। বড় ছেলে সিন্টুরও আপনার ওপরে ছিল অগাধ ভরসা। সে-বেচারা মা-কেও ভালোবাসত খুব। তাই যদুর সম্ভব পয়সাও খরচ করল মায়ের রোগের পেছনে। কত খরচই বা করবে! মাড়োয়ারির গদিতে কেরানিগিরি করত যে! তবে ছেলেটার বোধ-বুদ্ধি ছিল, হাতের লেখাটাও ছিল মুক্তোর মতো। বোকার মতো ভাবত, ভালো হাতের লেখা থেকেই নাকি চাকরিতে ওর উন্নতি হবে। বি. এ. পাশ যে করেছিল, তার ওপর ভরসা করত না। বলত, বাবা, বি. এ. পাস ছেলেমেয়ে তো গণ্ডায়গায় পাওয়া যায়, কিন্তু আমার মতো সুন্দর হাতের লেখা কজনের আছে বলো? এই বলে দিলুম তোমায়, ওই হাতের লেখা থেকেই আমার হাত খুলে যাবে। শুনলেন তো, কী সব ছেলেমানুষি কথা!
না, ছেলের হাত তো খুলল না, তবে আমার বউটার পেট খুলল ডাক্তাররা। ছুরি-কাঁচি দিয়ে নানান কাটাছেঁড়া করল। তারপর পেটটাকে আবার সেলাই করে দিল। বউটা কদিন কাতরাল, কদিন অজ্ঞান হয়ে রইল। শরীরটা রোগ থেকে আরও রোগা হয়ে অবশেষে হল কাকলাসের মতো। কী বলছেন? অপারেশানের টাকা কোথায় পেলাম? সিন্টুই সব জোগাড় করেছিল। শুনতে অবাক লাগলেও ওর ওই মাড়োয়ারি মালিকই সব টাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। তবে ধার হিসেবে। বলেছিল, পরে আস্তে-আস্তে শোধ করে দিলেই হবে। কিন্তু এত কাণ্ড করে লাভ কিছু হল না। অপারেশানের পর কখন যে সেপটিক হয়ে গেছে তা ডাক্তাররাও বুঝতে পারেনি, আমাদের কথা তো বাদই দিলাম! সে-দিনগুলো যে কীভাবে কেটেছে কী বলব! সিন্টু অফিসে ওভারটাইম করে, যাতে ধারটা জলদি শোধ হয়। বড় মেয়েটা ফাংশানে গান-টান করত। হুঁ, ঠিকই ধরেছেন, অল্পবিস্তর টাকা পয়সাও পেত তার জন্য। ফলে একটু রাত করে ফিরত। ছোট মেয়েটা ইস্কুল ফাইনাল পাশ করার পর আর পড়েনি–মানে পড়াতে পারিনি। ও বাড়ি-বাড়ি ঘুরে টিউশনি করে। যা পায় তার কিছু আমাকে দেয়, বাকিটা নিজের সাজগোজে খরচা করে। বলে, ঠিকমতো না সাজলে নাকি টিউশনি পাওয়া যায় না। কী জানি, আমি তো এসব বুঝি না, সেকেলে মানুষ। হয়তো আপনি বুঝবেন, আপনার অজানা তো কিছুই নেই।
হ্যাঁ, যা বলছিলাম। সবাই তো বাইরে বাইরে। ছোট ছেলে রিন্টু দিনরাত বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায়। বাড়ির কাজ বলতে সকালবেলার দোকানপাটটুকু সেরে দেয়, আর হপ্তায়-হপ্তায় রেশনটা। হাতখরচের পয়সা কোথায় পায় জানি না, তবে যেভাবে হোক জোগাড় করে নেয়। ঘরে ছেলেটা ফেরে রাত করে। দুটো মুখে গুঁজে দিয়ে শুয়ে পড়ে। তার পরদিন আবার একই রুটিন। ফলে নিঃঝুম সন্ধেটা আমার যেন কাটতে চাইত না। তেলচিটে বিছানায় রুগ্ন বউটা শুয়ে কোঁকাচ্ছে। ঘরে কেরোসিনের কুপির টিমটিমে আলো, আর দম আটকানো কালো ধোঁয়া। আমি দরজার চৌকাঠে বসে এক মনে ঠোঙা তৈরি করতাম। চোখের জ্যোতি বেশ কিছুদিন হল কমে এসেছে। আগে একার হাতে দৈনিক পাঁচশো ঠোঙা তৈরি করতে পারতাম, কিন্তু নজর কমে যাওয়ার পর থেকে দু-আড়াইশো বড় জোর হয় কি হয় না। আমার ছোট ছেলেটা বাপের খুব খেয়াল রাখত বোধহয়। কারণ, একদিন হুট করে এসে বলে, বাবা, তোমার প্লাস না মাইনাস? আমি তো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছি। রিন্টু কি অঙ্ক জিগ্যেস করছে নাকি? আমার ওই হতভম্ব অবস্থা দেখে ও পকেট থেকে একটা চশমা বের করল। পুরোনো চশমা। ফ্রেমের উঁটির কাছটা ফেটে গেছে। সবুজ ছাতা পড়েছে ভেতরে। বললাম, কার চশমা এটা? রিন্টু বলল, সে জেনে কী হবে! তুমি চোখে দিয়েই দ্যাখো না। ওর কথা অমান্য করলাম না। চশমাটা চোখে দিলাম। রিন্টু জিগ্যেস করল, আগের চেয়ে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছ? সত্যিই, যা আগে ঝাপসা ঠেকত তা যেন কম ঝাপসা ঠেকতে লাগল। ওকে সে কথা বললাম। রিন্টু খুশি হয়ে হাত-পা ছুঁড়ে চলে গেল। কিন্তু পরদিনই শুনলাম, আমাদের পাড়ার ইস্কুল বাড়ির লাগোয়া মাঠে তারিণী মাস্টারকে গলাকাটা অবস্থায় পাওয়া গেছে। আর তার চোখের চশমাটা নাকি কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। কী বললেন? না, না, রিন্টুকে আমি কিছুই জিগ্যেস করিনি। জিগ্যেস করলেই হয়তো পালটা বলত, কোন অধিকারে তুমি আমাকে প্রশ্ন করছ? বাবা হলেই কি পৈতৃক সম্পত্তির মতো সব অধিকার বর্তে যায়? নাঃ, ওর প্রশ্নও বুঝি না, তার উত্তরও জানি না। শুধু জানি চশমাটা আমার দৈনিক ঠোঙার সংখ্যাকে তিনশোর কোঠায় নিয়ে গিয়েছিল।
