ওঃ, শিয়োর বলে সতীনাথ দরজার দিকে এগোলেন।
মণিনাথ দাদাকে অনুসরণ করে বেরিয়ে যাওয়ার আগে টেবিলের কয়েনগুলোর দিকে কয়েকবার দেখলেন।
ওঁরা চলে যেতেই রঘুপতি দরজাটা বন্ধ করে দিল ভেতর থেকে। তারপর বলল, গুপ্তাসাব, এবার বলুন, কী বুঝলেন?
একটা ব্যাপার আমি বোধহয় সম্ভ করতে পেরেছি, রঘুপতি।
কোন ব্যাপার?
তোমার ক্লোজড রুম প্রবলেম। বন্ধ ঘর থেকে খুনি কীভাবে পালাল সেটা আমি বোধহয় ধরতে পরেছি।
রঘুপতি প্রত্যাশা-ভরা চোখ নিয়ে তাকিয়ে রইল প্রাক্তন স্যারের দিকে।
জানলায় কাছে গিয়ে সিগারেটের শেষ হয়ে আসা টুকরোটা বাইরে ফেলে দিলেন এসিজি। তারপর ঘাড়ের কাছে নেমে আসা সাদা চুলের গোছায় বারকয়েক টান মেরে বললেন, চলো, রঘুপতি। এবারে যাওয়া যাক। তবে যাওয়ার আগে চাচা চৌধুরীর সঙ্গে একবার কথা বলে যাব–খুব জরুরি কথা।
রঘুপতি বেশ অবাক হলেও কিছু বলল না।
ঘরটা শেষবারের মতো দেখে নিয়ে অশোকচন্দ্র গুপ্ত বেরিয়ে এলেন বাইরে। ওঁকে অনুসরণ করে জয়দেব সরকার ও রঘুপতি যাদব।
রঘুপতি, এই রেয়ার কয়েনের ব্যাপারটা মাথায় রেখে তুমি একটু নতুন অ্যাঙ্গেল থেকে তদন্ত শুরু করো। আর আমি তোমাকে বাড়তি কিছু ইনফরমেশান দেব। মনে হয়, এ-থেকে তুমি দিনসাতেকের মধ্যেই মার্ডারারকে খাঁচায় পুরতে পারবে। প্রাক্তন ছাত্রের গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে এসিজি জিগ্যেস করলেন, কী, খুশি তো?
কথা বলতে-বলতে ওঁরা মোজেইক করা চাতালে বেরিয়ে এসেছিলেন। সতীনাথ আর মণিনাথ কোথা থেকে যেন ওঁদের দেখতে পেয়ে ব্যস্ত পায়ে কাছে চলে এলেন।
রঘুপতি সতীনাথের দিকে তাকিয়ে বলল, আপনাদের কো-অপারেশানের জন্যে ধন্যবাদ।
সতীনাথ সৌজন্য দেখিয়ে কী একটা বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু এসিজির কথায় সেটা আর বলে উঠতে পারলেন না।
আপনার ছেলেকে একবার পাঠিয়ে দেবেন, কয়েকটা কথা বলব–
তার মানে! বাবার মার্ডারের ব্যাপারে ওইটুকু বাচ্চার কী বলার আছে। বেশ বিরক্ত হয়ে ভুরু কুঁচকে জানতে চাইলেন সতীনাথ।
মণিনাথ অবাক হয়ে এসিজির মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
চাচা চৌধুরী আর সাবুর গল্প করব। সে আপনি বুঝবেন না। হেসে বললেন এসিজি। তারপর রঘুপতিকে চোখের ইশারা করলেন। যার মানে, কুন্তলকে ডেকে নিয়ে এসো।
রঘুপতি বাড়ির ভেতর দিকে রওনা হতেই সতীনাথ আহত গলায় বললেন, থাক, আমিই পাঠিয়ে দিচ্ছি।
সতীনাথ চলে যাওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই কুন্তল চলে এল লাফাতে লাফাতে। এখন ওর মাথায় পাগড়ি নেই, কোমরের বেল্টও উধাও।
আমাকে ডেকেছ?
হ্যাঁ, তোমার দাদুর মার্ডারের ব্যাপারে একটু চাচা চৌধুরীর সাহায্য চাই। চলো, বাগানে চলো।
ভ্যাবাচ্যাকা মণিনাথকে চাতালে দাঁড় করিয়ে রেখে এসিজি কুন্তলকে নিয়ে বাগানের গাছপালার মধ্যে চলে এলেন। ওঁকে অনুসরণ করে সঙ্গী হলেন জয়দেব সরকার আর রঘুপতি যাদব।
নানান গাছের ফাঁক দিয়ে বলরাম চৌধুরীর ঘরের জানলা দুটো দেখা যাচ্ছিল। সেদিকে আঙুল তুলে এসিজি কুন্তলকে জিগ্যেস করলেন, বলো তো, চাচা চৌধুরী, লাস্ট সোমবার দুপুরে তুমি কি কাউকে ওই জানলার কাছে ঘোরাঘুরি করতে দেখেছ?
দাঁড়াও, ভেবে বলছি– বাচ্চা ছেলেটা আঙুলে কর গুনতে লাগল আর ধীরে ধীরে বিড়বিড় করে বলতে লাগল, শুক্র, বৃহস্পতি, বুধ…।
কুন্তলবাবু, চাচা চৌধুরীর বুদ্ধি কম্পিউটারের মতো প্রখর। চাচা চৌধুরী একবার যা দ্যাখে তা কখনও ভোলে না– অশোকচন্দ্র কুন্তলকে উৎসাহ দিতে চাইলেন।
মনে পড়েছে! মনে পড়েছে! কুন্তল আচমকা লাফিয়ে উঠে বলল, গানকাকু ওই ডানদিকের জানলায় গ্রিলের কাছে দাঁড়িয়ে কী যেন করছিল।
গানকাকু!
হ্যাঁ। কাকুমণিকে যে গান শেখায়।
এসিজি চকাৎ শব্দে একটা চুমু খেলেন কুন্তলের গালে। তারপর বললেন, থ্যাঙ্ক য়ু, চাচা চৌধুরী। তুমি আমার চেয়েও বড় হুনুর।
হুনুর মানে! অবাক চোখে বৃদ্ধের দিকে তাকাল কুন্তল।
এটা ফারসি শব্দ–বাংলায় ঢুকে পড়েছে। এর মানে হল, খুব বুদ্ধিমান–এককথায় গোয়েন্দা বলতে পারো। আজ আমরা চলি। পরে একদিন এসে তোমার সঙ্গে খুব গল্প করব।
চৌধুরি ভিলার বাইরে এসে রঘুপতি এসিজিকে জিগ্যেস করল, ব্যাপারটা কী হল, গুপ্তাসাব?
এসিজি নতুন একটা সিগারেট ধরিয়ে বললেন, ড্যাম সিম্পল, রঘুপতি। গানের মাস্টারমশাই অশোক জানা-ই হচ্ছে কালপ্রিট–তোমার রেয়ার বার্ড। তবে সেরকম কোনও প্রমাণ তো নেই। তুমি ওকে খাঁচায় পুরে ছত্রিশ রকম পুলিশি দাওয়াইয়ের সাঁইতিরিশটি ডোজ অ্যাপ্লাই করলেই বোধহয় কনফেশান পেয়ে যাবে।
কিন্তু জানলার কাছে উনি কী করছিলেন? জয়দেব সরকার জানতে চাইলেন।
ওঁরা কথা বলতে বলতে গাড়িতে উঠে পড়লেন।
চলন্ত গাড়ির জানলা দিয়ে সিগারেটের ছাই ঝেড়ে এসিজি বললেন, রঘুপতি, রামভক্ত হনুমানের গন্ধমাদন পর্বত বয়ে নিয়ে আসার গল্পটা তোমার মনে আছে তো! বিশল্যকরণী চিনতে না পেরে গোটা পর্বতটাই বয়ে নিয়ে এসেছিল পবন-নন্দন। সিগারেটে পরপর দুটো লম্বা টান দিয়ে তারপর ও এও অনেকটা সেইরকম। জানলার গ্রিলটা কাটতে বা ভাঙতে না পেরে অশোক জানা হনুমানের মতো গোটা গ্রিলটাই খুলে নিয়েছিল জানলার ফ্রেম থেকে। এই কাজের জন্যে খানিকটা নারকোল তেল আর একটা ভারী স্ক্রু-ড্রাইভারই যথেষ্ট। আমার ধারণা, ও আগে থেকেই গ্রিলের বেশ কয়েকটা স্ক্রু খুলে রেখেছিল। ঘটনার দিন শেষ একটা কি দুটো ভ্রু খুলে গ্রিল সরিয়ে ও বলরামবাবুর ঘরে ঢোকে। তারপর নিজের কুকর্ম আড়াল করতে জানলার ঘষা কাচের পাল্লা ভেজিয়ে দেয়। কাজ সেরে বেরিয়ে এসে যখন ও গ্রিলটা আবার জায়গামতো বসিয়ে স্ক্র এঁটে দিচ্ছিল, তখনই বোধহয় কুন্তল ওকে দেখতে পায়। ব্যস, এই হল তোমার ক্লোজ্বড রুম প্রবলেম।
