তা হলে তো সেই কয়েনের রেডিয়োঅ্যাকটিভিটি থাকবে! একটু ভয়ের গলায় বললেন এসিজি।
জয়দেব সরকার জোর দিয়ে বললেন, থাকবেই তো! তবে তার এফেক্ট কী হবে সেটা বলতে পারব না। বাজারের খবর হচ্ছে, এ-ধরনের পয়সা নাকি আতপ চাল টানে। মানে, চুম্বক যেমন লোহা টানে আর কী! তারপর কেউ-কেউ বলছে, তাতে নাকি আতপ চালের দানার রংও পালটে যায়। তবে একটা ধান ভেঙে সঙ্গে-সঙ্গে তার চালের দানাটা দিয়ে টেস্ট করতে হবে–এতে নাকি চালের দানাটায় কোনও ময়েশ্চার জমে না।
বলেন কী, মশাই! মণিনাথ তার হাই-পাওয়ার চশমা নাকের ডগায় ঠিক করে বসাতে বসাতে বললেন।
জয়দেব সরকার মণিনাথের দিকে তাকিয়ে বললেন, বললাম তো, এসব খবর আমার কানে এসেছে। গুজব না সত্যি বলতে পারব না। কারণ, এই চালের দানা টেনে নেওয়ার ব্যাপারটা আমি স্বচক্ষে দেখিনি।
সতীনাথের গম্ভীর মুখে অনেকগুলো ভাঁজ পড়ল। তিনি এসিজির দিকে তাকিয়ে বললেন, বাবাকে আমি বেশ কয়েকবার ধানের শিস নিয়ে ঘরে ঢুকতে দেখেছি।
বাবা কি চালের দানা নিয়ে কয়েন টেস্ট করছিলেন? মণিনাথ যেন আপনমনে নিজেকেই প্রশ্ন করলেন।
হতে পারে। রঘুপতি বলল, তবে ইয়ে সচ হ্যায়, গুপ্তাসাব, আমরা ঘরের মেঝেতে বেশ কয়েকটা চালের দানা দেখেছিলাম। ওগুলোকে আমরা তেমন কোনও ইম্পর্ট্যান্স দিইনি। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি কেসটা কী–।
বাবার কালেকশানে কি ওরকম রেয়ার কয়েন সত্যি-সত্যি আছে? সতীনাথ জয়দেব সরকারের কাছে জানতে চাইলেন।
আছে। ১৭১৭, ১৮৩৯, আর ১৮৪০ সালের তিনটে আধ আনা এখানে আছে– আঙুল দিয়ে টেবিলে রাখা কয়েনগুলোর দিকে দেখালেন জয়দেববাবু।
সত্যি? বিস্ময় মেশানো প্রশ্নে যেন ফেটে পড়লেন মণিনাথ আর সতীনাথ।
এসিজি বেশ অবাক হয়ে তাকালেন জয়দেব সরকারের দিকে। রঘুপতির চোয়ালের রেখা শক্ত হল, চোখ ছোট হয়ে এল।
কয়েক সেকেন্ড সবাইকেই উৎকণ্ঠায় রেখে তারপর হাসলেন জয়দেব সরকার ও সাল তারিখ ঠিক থাকলেও এই তিনটে পয়সাই নকল। তা না হলে এগুলোর এক-একটার দাম কম করেও কয়েক লক্ষ টাকা হত।
একথায় কয়েকটা বেলুন যেন চুপসে গেল ঘরের মধ্যে।
এরকম প্রচুর নকল কয়েন বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। অনেকে কিনে ঠকছেও। আবার কেউ কেউ কয়েন হাতে পেয়ে প্রচুর টাকা খরচ করে ল্যাবরেটরিতে টেস্ট করাচ্ছে। কথা বলতে-বলতে টেবিল থেকে আতসকাচটা তুলে নিয়ে পকেটে ঢোকালেন জয়দেব সরকার।
রঘুপতি যাদব সতীনাথ আর মণিনাথের দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করল, আপনারা কয়েনের ব্যাপারে কিছু জানেন না?
দুজনেই মাথা নাড়লেন।
এসিজি সিগারেট হাতে নিয়ে ঘরটা ঘুরে-ফিরে দেখছিলেন। কখনও দরজার কাছে, কখনও বিছানার পাশে, আর কখনও বা জানলায় গ্রিলের কাছে গিয়ে থমকে দাঁড়াচ্ছিলেন।
মিস্টার সরকার জয়দেববাবুকে লক্ষ্য করে বলল রঘুপতি, দেখুন তো, টেবিলের এইসব কাগজপত্রে কয়েনের ব্যাপারে আর কিছু পান কি না–।
একটুও ব্যস্ত না হয়ে জয়দেব সরকার টেবিলের কাছে এলেন। মাথা ঝুঁকিয়ে একটা-একটা করে কাগজ দেখতে লাগলেন।
সতীনাথ চৌধুরী রঘুপতি যাদবকে লক্ষ্য করে সামান্য রুক্ষস্বরে জানতে চাইলেন, কবের মধ্যে আপনি কেসটা সম্ভ করছেন, ইন্সপেক্টর যাদব?
রঘুপতি অশোকচন্দ্রকে দেখিয়ে বললেন, কোশিশ তো করছি। সেইজন্যেই আজ আমার স্যারকে নিয়ে এসেছি।
তাচ্ছিল্যের চোখে এসিজির দিকে দেখলেন সতীনাথ। তারপর ও বাবা আমাদের পার্টিকে বিরাট ডোনেশান দিতেন। আমার ওপর খুব চাপ আসছে।
মণিনাথ যেন দাদাকে সায় দিতেই বলে উঠলেন, সভ করতে না পারেন, অন্তত কাউকে অ্যারেস্ট তো করুন।
রঘুপতির বসন্তের দাগ-ধরা মুখে বিরক্তির ভাঁজ পড়ল। ও অভদ্র স্বরে জবাব দিল, অ্যারেস্ট তো ম্যায় আভি ইসি বক্ত কর সকতা । লেকিন সে আপনার হেলথের পক্ষে ভালো হবে না।
মণিনাথ স্পষ্ট শিউরে উঠে নিজের অজান্তেই এক পা পিছিয়ে গেলেন।
এই কাগজটা দেখুন– জয়দেব সরকার একটা কাগজ দেখিয়ে সকলের মনোযোগ চাইলেন, এটা একটা কয়েনের টেস্ট রিপোর্টের জেরক্স কপি।
রঘুপতি আর এসিজি কাগজটা দেখার জন্য জয়দেববাবুর খুব কাছে এসে ঝুঁকে পড়লেন।
ম্যাড্রাসের জুপিটার নামের কোনও এক কম্পিউটারাইজড এয়ার কন্ডিশন্ড ল্যাবরেটরিতে এই টেস্টটা করা হয়েছে। ১৬১৬ সালের কপার-ইরিডিয়াম হাফ আনা কয়েন। হাতে পাঞ্চ করে তৈরি। ভর ৮২ গ্রাম ৭০০ মিলিগ্রাম। আর কয়েনটা এক সেন্টিমিটার পুরু। রিপোর্টটা আর-একবার দেখে নিয়ে জয়দেব সরকার বললেন, এ ছাড়া রেডিয়োঅ্যাকটিভিটিও বেশ আছে দেখছি।
সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে এসিজি প্রশ্ন করলেন, এই জেনুইন কয়েনটা হাতে পেলে তার দাম মোটামুটিভাবে কত হতে পারে, মিস্টার সরকার? লাখ টাকা?
রিপোর্টটা টেবিলে রেখে দিয়ে একটু হেসে জয়দেববাবু বললেন, যে সত্যি-সত্যি অ্যান্টিক কয়েনের কদর বোঝে, তার কাছে এর দাম অনায়াসে কয়েক কোটি টাকা হতে পারে।
ঘরে যেন বাজ পড়ল। অনেকক্ষণ সবাই চুপ। শুধু কোয়ার্টজ ঘড়ির সেকেন্ডের কাটা নড়ার টিকটিক শব্দ।
ওই নোংরা চেহারার কয়েনগুলোর এত দাম! ভাবল রঘুপতি।
অশোকচন্দ্র স্পষ্ট স্বরে বললেন, রঘুপতি, এবার তুমি বোধহয় বলরামবাবুর মার্ডারের জেনুইন মোটিভের হদিস পেয়ে গেছ।
হঠাৎই সতীনাথ ও মণিনাথের দিকে ফিরে এসিজি বিনীতভাবে বললেন, আপনারা যদি একটু বাইরে অপেক্ষা করেন তা হলে ভালো হয়। আমরা একটু আলাদা কথা বলতে চাই।
