ইলিশ মাছ হরিহরবাবু চোখে দেখেছেন। এক-আধবার নেমন্তন্ন বাড়ির দৌলতে চেখেও দেখেছেন। মাংসও তাই। এরকম আরও অনেক খাবারও তাই। সুতরাং নিজের লেজ গিলতে-গিলতে সাপটা যখন ঘাড়ের কাছে পৌঁছে গেছে, তখনই মরিয়া হরিহর তলাপাত্র জীবনযাত্রায় একটা মোচড় দিলেন। তার বউ চমকে গেল, রুমু ভয় পেল, আর কেষ্ট বাবাকে আরও ভালোবাসতে শিখল, শ্রদ্ধা বেড়ে গেল আরও। কারণ নিতান্ত দুঃসাহসী না হলে কেউ এরকম ঝুঁকি নিতে পারে!
না, হুজুরগণ, চুরি-চামারি, খুন বা ডাকাতির পথে পা বাড়াননি হরিহর তলাপাত্র। উনি শুধু মাসের প্রথম পাঁচটা দিন বড়লোক হয়ে গেলেন। বাড়িতে আসতে লাগল চর্ব-চোষ্য-লেহ্য পেয়। কিন্তু ছনম্বর দিন থেকেই ডাল রুটি কাঁচালঙ্কা। কখনও ধার, আবার প্রাণান্ত করে ধার শোধ। বউ আর মেয়ে তাকে অনেক বুঝিয়েছিল, বারণ করেছিল; বলেছিল, এসব পাগলামি কোরো না। কিন্তু হরিহর তলাপাত্র তখন মরিয়া। তিনি হেসে বউকে বলেছিলেন, এমনিতেই তো বেঁচে মরে আছি। সারাটা জীবন এইভাবেই কাটাতে হবে। তা হলে কি কোনদিনও তোমার বা ছেলেমেয়ের মুখে দুটো ভালো খাবার তুলে দিতে পারব? তার চেয়ে এখন মন্দ কী! কষ্ট তো এমনিতেই আছে, থাকবেও। বরং পাঁচটা দিন সুখের স্বাদ নিতে পারলাম, মানুষের মতো বাঁচলাম। বাকি পঁচিশটা দিন তো আবার সেই ছারপোকার জীবন–আগে যেটা তিরিশ দিন ছিল। দু-আঙুলের চাপের মাঝে থেকেও শরীরটা যতদূর সম্ভব চ্যাপটা করে পাতলা করে জীবিত থাকা। মরেও বেঁচে থাকা।
ব্যস, এইভাবে চলতে লাগল। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। প্রথম পাঁচদিন ফুর্তিতে থেকে ভালো-মন্দ খাওয়া, জামাকাপড় কেচে ইস্তিরি করে পরা, তারপর আবার ছারপোকার জীবনে অধঃপতন। মাঝে মাঝে দুর্বল কেষ্ট চলাফেরা করতে গিয়ে পড়ে যায়। হাত-পা ভাঙে, হাড়-মাংস দেখা যায়, কিন্তু রক্ত পড়ে না। বউয়ের চোখ ব্যথা হলে রেডিমেড সেলাই দু-একদিন বন্ধ থাকে। রুমুও ফাইফরমাস খাটে। ওর বিয়ের বয়েস পা টিপেটিপে পেরিয়ে যায়। মায়ের হা-হুঁতাশ সত্ত্বেও কোনও ছেলে-বন্ধু জোটাতে পারেনি রুমু। পারবেই বা কেমন করে! ওর ওই রূপ নিয়ে খারাপ মেয়ে হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করাও বেশ শক্ত। সুতরাং সংসারটা নতুন ছকে গড়িয়ে চলতে লাগল। এবং হরিহরবাবুর অজান্তেই নিজের লেজ গেলা সাপটা একটা থেকে দুটো হয়ে দাঁড়াল। দুটো সাপ একে অপরের লেজ গিলতে শুরু করল। জন্ম নিল নতুন এক বিষচক্র।
জোড়া সাপের বৃত্ত আকারে ক্রমেই ছোট হয়ে আসতে লাগল। একটা ফাঁসির দড়ি যেন এঁটে বসতে লাগল হরিহর তলাপাত্রের শীর্ণ গলায়। কারণ, তিনি অসম্ভবকে সম্ভব করতে চেয়েছিলেন। মানুষের মতো বাঁচার স্বাদ কাকে বলে তা বুঝতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু, মি লির্ডস্, আরশোলা কখনও পাখি হয় না, ছারপোকা কখনও মানুষ হতে পারে না। সুতরাং সংসারের চাকায় আবার কাচকোঁচ শব্দ শুরু হল। টাল খেয়ে গেল গাড়িটা। গতি কমে গেল, টলমল করতে লাগল। সাপ দুটোর মাথা পরস্পরের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেল। আর তখনই…।
তখনই বিষ খেলেন হরিহর তলাপাত্র। ছারপোকা মারার বিষ। মরার বিষ। এক শিশি বিষ গিলে ফেললেন ঢকঢক করে। সেদিনটা ছিল মাসের ছতারিখ। ভোরবেলা বাথরুম থেকে তার গোঙানি শোনা গিয়েছিল। বউয়ের চিৎকার, রুমুর চিৎকার, কেষ্টর চিৎকার পাড়ার লোকদের ডেকে এনেছিল। তারাই দরজা ভেঙে উদ্ধার করে হরিহর তলাপাত্রকে।
না, চিকিৎসায় বিশেষ সুবিধে হয়নি। গত তিনদিন ধরেই অসাড় হয়ে পড়ে আছেন হরিহরবাবু। প্রাণটা যে আছে তা শুধু কোনওরকমে টের পাওয়া যায়। তা-ও কখনও কখনও নাড়ির স্পন্দন উবে যায়, বুকের ধুকপুকুনি ডুবে যায়। একেই কি বলে জীবন্ত অবস্থা? তাই যদি হয়, মি লর্ডস্, তা হলে নিঃসন্দেহে বলা যায় হরিহর তলাপাত্রের জীবনযাত্রায় কোনও পরিবর্তন আসেনি। আগেও তিনি বেঁচে মরে ছিলেন, কিংবা মরে বেঁচে ছিলেন–আর এখনও তাই। এইরকম একটা মানুষকে কী-ই বা শাস্তি দেবেন আপনারা? এই মানুষটার বেলায় আত্মহত্যার জঘন্য অপচেষ্টার একমাত্র কঠিন শাস্তি হতে পারে মানুষটাকে বাঁচিয়ে তোলা। তারপর তাকে আগের জীবনধারার ছকে দাবার খুঁটির মতো সঠিক জায়গায় বসিয়ে দেওয়া। তখন সাপ দুটো আবার পরস্পরের শরীর গিলে খেতে শুরু করবে। বিষচক্রের বৃত্ত ক্রমশ ছোট হবে মাপে। আবার শুরু হবে পাঁচদিন আর পঁচিশ দিনের লুকোচুরি খেলা। সে যে সহ্য করা যায় না, মি লর্ডস্। আমাদের জীবনটা যে খুব কষ্টের। ভীষণ কষ্টের।
তাই আমার একান্ত অনুরোধ, হরিহর তলাপাত্রকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হোক সপরিবারে। কারণ তার আত্মহত্যার চেষ্টার কিছু না কিছু দায়ভাগ পরিবারের প্রত্যেকেরই রয়েছে। তা ছাড়া, ওই মানুষটাকে একা দণ্ড দেওয়ার অর্থও তো সেই একই। পরিবারের বাকিগুলোর মৃত্যুদণ্ড তিলে তিলে মৃত্যু। তাই আমার একান্ত প্রার্থনা, হুজুরগণ, হরিহর তলাপাত্রকে সপরিবারে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হোক। মৃত্যুদণ্ড! একটুও বেশি নয়, একটুও কম নয়। তাতেই আমি সবচেয়ে বেশি শান্তি পাব। আর আদালতে দর্শক হিসেবে যারা হাজির রয়েছে তারাও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বাঁচবে।
কী বলছেন? একথা কেন বলছি? হুহ! সেটুকুও যদি আপনারা বুঝতেন! মি লর্ডস, আমাকে বা আদালতে হাজির দর্শকদের দেখে আপনারা কি কিছুই আন্দাজ করতে পারছেন না? দেখতে পাচ্ছেন না, কী উদগ্রীব আগ্রহে আমরা আপনাদের সিদ্ধান্ত শোনার জন্যে অপেক্ষা করছি? তার কারণ, আমাদের প্রত্যেকেরই জীবন নিজের লেজ গেলা সাপের মতো। আমাদের জীবনের প্রত্যেকটা দিনই হুবহু একরকম। একই মাপের রেডিমেড জীবনযাত্রা আমাদের। আমরা প্রত্যেকেই অ্যানিমিয়ার রুগি নিয়ে, বিয়ের বয়েস পেরোনো মেয়ে নিয়ে, চাল-ডাল-নুন-তেলের দামের সঙ্গে প্রতিদিনই লড়াই করি। আমরা মরে বেঁচে আছি। কিংবা বেঁচে মরে আছি। আমাদের প্রত্যেকেরই চোয়াল ভাঙা, শক্ত। আমাদের কপালে অসংখ্য ভাঁজ। চামড়া শুকনো, খসখসে। তবে হ্যাঁ, নামগুলো শুধু আলাদা। অবশ্য এক হলেও বিশেষ কোনও ক্ষতি ছিল না। তা ছাড়া, এই দেখুন, আমাদের প্রত্যেকেরই পকেটে রয়েছে এক শিশি করে ছারপোকা মারার বিষ। মরার বিষ।
