সুতরাং, বুঝতেই পারছেন মি লর্ডস্, আপনাদের রায় আমাদের সবার পক্ষে কত জরুরি। সেই জন্যেই তো উৎকর্ণ হয়ে আমরা লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি জনতা–আপনাদের সিদ্ধান্ত শোনার অপেক্ষা করছি। আদালতের ঘড়ির টিকটিক শব্দ শুনছি, আর অপেক্ষা করছি…। আপনারা বলুন…।
মায়াযৌবন
বছর বিশ-বাইশের যুবকটিকে দেখিয়ে বৃদ্ধ মানুষটি বললেন, ওর আসল নাম প্রতাপ, কিন্তু আমি ওর নাম রেখেছি মৃত্যুঞ্জয়।
আমি অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম, কেন?
হাসলেন বৃদ্ধ–মজা পাওয়ার হাসি। তারপর মাথার একরাশ সাদা চুলে আয়েস করে হাত চালিয়ে এপাশ-ওপাশ মাথা নাড়লেন। খসখসে গলায় বললেন, কারণ, আমি চাই, জরাকে ও জয় করুক। ও কখনও আমার মতো বৃদ্ধ হবে না। ওর চামড়ায় কখনও ভাঁজ পড়বে না। ওর চুলে কখনও পাক ধরবে না। ওর শরীর কখনও আমার মতো অকেজো-অথর্ব হয়ে পড়বে না। আর ওর মনে কখনও বার্ধক্যের ভীমরতি বাসা বাঁধবে না।
আমি অবাক হয়ে চেয়ে রইলাম বৃদ্ধ মানুষটির দিকে। জরাগ্রস্ত এই মানুষটি জরাকে জয় করতে চান! ওঁর মাথার কোনও গোলমাল হয়নি তো!
বৃদ্ধের নাম প্রলয়নাথ আচার্য। বয়েস প্রায় সত্তর-বাহাত্তর। বয়েসের তুলনায় স্বাস্থ্য মন্দ নয়। শক্তপোক্ত লম্বা কাঠামো। চোখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমা। চশমার পাওয়ার বোধহয় খুব বেশি। কারণ, কাচের দিকে তাকালে সাদা-সাদা রিঙের মতো দাগ দেখা যায়।
প্রলয়নাথের মুখের চামড়ায় অসংখ্য ভাঁজ। একইরকম ভাঁজ হাতের পিঠেও। বোঝা যায়, জরা বেশ ভালোরকমই থাবা বসিয়েছে।
প্রথম পরিচয়ের পর থেকেই মানুষটার বিচিত্র নাম আমাকে অবাক করেছিল। তারপর ওঁর কথাবার্তা যতই শুনছি, ততই যেন অবাক হচ্ছি।
একটা মাঝারি মাপের ঘরে আমরা দুজনে বসেছিলাম। ঘরের সবকটা জানলাই বন্ধ। কারণ, তার ওপিঠেই হাড়কাঁপানো শীত। কিন্তু তবুও আমার শীত করছিল। ফুলহাতা সোয়েটার, মাফলার, ঠিকমতো কাজ করছিল বলে মনে হচ্ছিল না।
আমাদের সামনে কারুকাজ করা শৌখিন চায়ের টেবিল। টেবিলে চায়ের কাপ। কাপে লম্বা চুমুক দিয়ে প্রলয়নাথ বললেন : জেরাটোলজির নাম শুনেছেন? জরাবিজ্ঞান? মৃত্যুঞ্জয়ের ব্যাপারটা সাকসেসফুল হলে, জরাবিজ্ঞানের ইতিহাসে একটা মাইলস্টোন তৈরি হবে।
প্রলয়নাথের ঘোলাটে চোখে আলোর ঝিলিক দেখা গেল। ঠোঁটে একবার জিভ বুলিয়ে নিলেন তিনি। তারপর আমার চোখে তাকিয়ে জিগ্যেস করলেন, ব্যাপারটা দারুণ হবে, না?
আমি এই বৃদ্ধের মনে আঘাত দিতে চাই না। তা ছাড়া আজ কয়েকদিন হল উনি জোর করে আমাকে নিয়ে আসছেন ওঁর বাড়িতে। চা-বিস্কুট-জলখাবার খাওয়াচ্ছেন। গল্প-সল্প করছেন। এই আতিথেয়তার প্রতিদান কি ওঁর স্বপ্ন-চুরমার করে দেওয়া বাস্তবের রূঢ় আঘাত!
সুতরাং মিনমিন করে জানালাম, ব্যাপারটা সত্যিই দারুণ হবে।
প্রলয়নাথের ব্যাপার কিন্তু তখনও পাথরের মূর্তির মতো ঘরের চৌকাঠে দাঁড়িয়ে। মাথায় ঝাঁকড়া চুল, পুরু গোঁফ, ফরসা রং রোদে পুড়ে তামাটে, নিষ্পাপ সরল মুখে প্রাণবন্ত দুটি চোখ যেন কথা বলছে।
প্রতাপের মুখ দেখে মনে হচ্ছিল আমাদের কথাবার্তা ও ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারছে না। শুধু প্রলয়নাথ ডেকেছেন বলে ও বাড়ির অন্দর থেকে যান্ত্রিকভাবে এসে হাজির হয়েছে।
প্রলয়নাথ ওকে ডেকেছিলেন পরতাপ বলে। সেই সম্বোধন আর ওর হাবভাব মিলিয়ে আমার সন্দেহ হয়েছিল, প্রতাপ বোধহয় স্থানীয় লোক-রাজপুত। এখন বৃদ্ধের কথায় বোঝা গেল সন্দেহটা সত্যি ।
মোহনবাবু– খসখসে গলায় আমার নাম উচ্চারণ করলেন প্রলয়নাথ। শব্দ করে চায়ের কাপে চুমুক দিলেন। তারপর ও পাপ-মানে, প্রতাপ–আমার কাছে আছে আজ প্রায় আট বছর। সেদিনের সেই ছোট্ট ছেলেটি থেকে আজ ও জোয়ান মরদ হয়ে উঠেছে। তাই আমি ঠিক করেছি, ওকেই দেব চিরযৌবন রিওয়ার্ড হিসেবে।
চা খেতে-খেতে আমার অস্বস্তি হচ্ছিল। একটা পাগলাঘণ্টি বেজে উঠল মাথার ভেতরে। বেশ বুঝতে পারছিলাম, প্রলয়নাথের বাড়িতে আমার রোজকার সান্ধ্য চায়ের আমন্ত্রণের পাট এবার বোধহয় ফুরোল। তিনি কাকে রিওয়ার্ড দেবেন-না-দেবেন সেটা তার মর্জির ব্যাপার। না, প্রতাপ অথবা মৃত্যুঞ্জয় ভারতরত্ন উপাধি পেলেও আমার মতো ছাপোষা মানুষের কোনও আপত্তি নেই। আর থাকলেই বা পাত্তা দিচ্ছে কে! কিন্তু রোজ যদি চা-জলখাবারের বিনিময়ে জরাবিজ্ঞানের ছদ্মবেশে চিরযৌবন লাভের গল্পগাথা শুনতে হয় তা হলে বড় সমস্যা। কারণ, হাসি পেলেও গম্ভীর প্রাজ্ঞ প্রলয়নাথের সামনে আমি হাসতে পারব না।
চিরযৌবন লাভের আকাঙ্ক্ষা কি আজকের! মনে পড়ে গেল যযাতির কথা। তারপর সাজগোজ, রূপচর্চা, শরীরের যত্ন, মাথার চুল ধরে রাখা, সবকিছুরই আড়ালে রয়েছে চিরকাল যৌবন ধরে রাখার সাধ। মানছি, আমার তেত্রিশ বছর বয়েসটাকে ধরে রাখতে পারলে মন্দ হত না। কিন্তু সাধ আর সাধ্য কি এক ব্যাপার!
এ কদিন প্রলয়নাথ কখনও জরাবিজ্ঞানের প্রসঙ্গ তোলেননি। শুধু আমার সম্পর্কে কৌতূহল দেখিয়ে নানান খোঁজখবর করেছেন। বাড়িতে কে কে আছেন? বিয়ে করেছি কি না? কলকাতা ছেড়ে রাজস্থানের এই শিল্পনগরীতে চাকরি নিয়ে চলে এসেছি কেন? সে কি বাবা-মায়ের ওপরে রাগ করে?
সত্যি কথা বলতে কি, এই বৃদ্ধ মিশুকে মানুষটি ওঁর আন্তরিক ব্যবহারে কয়েকদিনের মধ্যেই আমাকে একেবারে আপন করে নিয়েছেন। কিন্তু আজ এই জরাবিজ্ঞানের প্রসঙ্গ আলটপকা শুরু করে তিনি আমাকে বেশ একটা ধাক্কাই দিয়েছেন।
