অতএব, মনে-মনে শুধু ভাবলাম, ভাগ্যিস ট্রেন স্ট্রাইক হয়েছিল!
এখন হরিহর তলাপাত্রের মামলাটার আদ্যোপান্ত বিবরণ আমি আপনাদের সামনে পেশ করব। আপনারা তো জানেন, হরিহরবাবু আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর সেই চেষ্টা সফল হয়েছে কি না তা এখনও অবশ্য ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। কারণ কাঠগড়ার পাশে শোয়ানো অসাড় দেহটা দেহ না মৃতদেহ সেটা নিশ্চিতভাবে কোনও ডাক্তারের পক্ষেই বোধহয় বলা সম্ভব নয়। এখানে ডাক্তার আছেন? ভালো কথা। ও, আপনিই ডাক্তারবাবু? কী দেখলেন? বেঁচে আছে! আশ্চর্য! যাক, তা হলে মামলার শুনানি চলতে পারে।
হুজুরগণ, এই হরিহর তলাপাত্রের মতো মানুষগুলো সত্যিই আশ্চর্য! কারণ, অনেক রকম সঙ্কটকে ফাঁকি দিয়ে এরা দিব্যি বেঁচে থাকতে পারে। এরা জলে ডোবে না, আগুনে পোড়ে না, বন্যা অথবা খরা এদের শেষ করতে পারে না, দুর্ভিক্ষে কিছু হয় না, এমনকী দিনের পর দিন না খেয়েও এরা দিব্যি বেঁচে থাকতে পারে। আমাদের দেশের সবরকম অনশন ধর্মঘটের জন্য এরাই সবচেয়ে উপযুক্ত। সত্যি বলতে কি, এদের মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা বোধহয় ভগবানকেও ভাবিয়ে তোলে। অবশ্য জানি না, সত্যি-সত্যি তিনি এসব ভাবার অবসর পান কি না।
এখন কথা হল, এরকম সাংঘাতিক যার সহ্যক্ষমতা সেই লোক এরকম অবস্থায় পড়ল কেমন করে? আর পড়ল বলেই না আজ তার বিরুদ্ধে আত্মহত্যার জঘন্য চেষ্টার সরকারি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
মি লর্ডস, আত্মহত্যার আসল কারণটা জানতে গেলে আমাদের আর-একটা জিনিস আগে জেনে নিতে হবে। সেটা হল, হরিহর তলাপাত্রের জীবন, তাঁর জীবনযাত্রার ধাঁচ। যদি অনুমতি করেন, তাহলে খুব সংক্ষেপে সেটা আপনাদের শুনিয়ে দিতে পারি।
তলাপাত্রের শক্ত ভাঙা চোয়াল, কপালের ভাজ, আঙুলের গঠন আর খসখসে শুকনো চামড়া দেখে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন উনি একটা ছাপোষা চাকরি করতেন। বিয়ে? হ্যাঁ, বিয়েও করেছেন। ওই যে, এক কোণে সাদা শাড়ি পরে বসে রয়েছে ওঁর বিধবা না, মানে সধবা স্ত্রী। পাশেই বসে আছে ওঁদের অবিবাহিতা মেয়ে রুমু। আর কেষ্ট নামে একটি ছেলেও আছে, তবে সে আদালতে আসেনি, আসতে পারেনি। কারণ সবাই চলে এলে ঘর পাহারা দেবে কে? তা ছাড়া কেষ্ট অ্যানিমিয়ায় ভুগছে। মাসে-মাসে ওর শরীরে দু-তিন বোতল রক্ত দিতে হয়। হ্যাঁ, সরকারি হাসপাতাল থেকে বেশ সস্তায়ই রক্তের ব্যবস্থাটা হয়ে যায়।
তো যা বলছিলাম। হরিহর তলাপাত্র মোটামুটি মাইনে পেতেন। তাতে মাসের গোটা কুড়ি দিন কষ্টেসৃষ্টে কাটিয়ে দেওয়া যেত। অবশ্য এতে তার বউয়েরও কিছু অবদান ছিল। সেকেন্ডহ্যান্ড সেলাইকল ঘড়ঘড় করে চালিয়ে রেডিমেডের সেলাই করত সে। তাতে ওদের সংসারের জং-ধরা চাকায় কিছুটা তেল-মোবিল পড়ত আর কি। না, রুমু সেলাই-টেলাই করত না। ও পাড়ার লোকের ফাইফরমাশ খাটত। যেমন, কারও দোকানপাট করে দেওয়া, কারও বাচ্চাকে ইস্কুলে দিয়ে আসা নিয়ে আসা, কাউকে চাল গুঁড়ো করতে সাহায্য করা। স্বামী-স্ত্রী সিনেমায় গেলে তাদের ঘরদোর পাহারা দেওয়া, কিংবা একবেলার জন্যে কোনও বাড়িতে খাওয়ার নেমন্তন্ন পেলে দু-বেলার রান্নাটাই সেরে দিয়ে আসা। এসব উপকারের জন্যে খুশি হয়ে পাড়াপড়শিরা রুমুকে শাড়ি-ব্লাউজ, কখনও সিনেমা দেখার টাকা, কখনও বাড়তি খাবারদাবার দিত। না-না, রুমুকে কাজের লোক ভাববেন না। কথাটা খুব খারাপ শোনায়। বরং বলতে পারেন, ও পাড়ার সবাইকে ভালোবাসত, আর পড়শিরাও ভালোবাসত ওকে।
হ্যাঁ, তো সেলাইকল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তলাপাত্রবাবুর বউয়ের চোখে চশমা উঠল। রুমুর বয়েস বাড়তে লাগল। কেষ্টর শরীরের রক্ত কমতে লাগল। আর এদিকে হরিহর তলাপাত্র রোজ সকালে ওঠেন, বাজার করেন, দাড়ি কামান, অফিস যান, সেখানে দাবড়ানি খান, বাসে বাদুড়ঝোলা হয়ে বাড়ি ফেরেন, এক কাপ চা খান, ধারকরা খবরের কাগজ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েন, খাটে শুয়ে থাকা কেষ্টর মাথায় হাত বোলান, বউয়ের সঙ্গে কথাকাটাকাটি করেন, রাতের খাওয়া সারেন, কেষ্টর পাশে শুয়ে পড়েন, রুমু মায়ের সঙ্গে মেঝেতে চাদর পেতে শুয়ে পড়ে সেটা দেখেন, আলো নিভিয়ে মনে মনে তিনবার ইষ্টনাম জপ করে ঘুমিয়ে পড়েন। আবার পরদিন সকালে ওঠেন, বাজার করেন, দাড়ি কামান, অফিস যান, সেখানে…।
মোটমাট ধরে নিন, মি লর্ডস, সকালে ওঠেন এবং ঘুমিয়ে পড়েন, হরিহরবাবুর এই দুটো কাজের ওপরে কেউ যেন দুটো পৌনঃপুনিক ফুটকি বসিয়ে দিয়েছে। বউয়ের রেডিমেডের সেলাইয়ের মতো ওর যেন এক রেডিমেড জীবনযাত্রা। অর্থাৎ, রোজ সেই একই চক্র। বিষচক্র। কোনও সাপ যেন নিজের লেজ গিলে ফেলতে চাইছে।
ও, হ্যাঁ। মাসের দশ দিনের হিসেব এখনও আপনাদের দেওয়া হয়নি। ওই দশটা দিন চলত পাড়াপড়শির থেকে ধার করে। অবশ্য শুধু এইটুকু বললেই সবটা বলা হয় না। কারণ, গত বছর কয়েক ধরে হরিহর তলাপাত্রের এক অদ্ভুত উপলব্ধি হয়েছিল। তিনি দেখলেন, তার প্রত্যেকটা দিনই কাটছে নাভিশ্বাসের মধ্যে। টাকা রোজগার করছেন, সংসারের বোঝা ঠেলছেন, ওভারটাইম করে প্রতিবেশীদের ধার মেটাচ্ছেন, আর সারাটা মাস হাতে গড়া রুটি, আলু-পোস্তর চচ্চড়ি, ডাল আর লঙ্কাভাজা–অথবা ওইরকম কিছু দিয়ে পেট ভরাচ্ছেন।
